বিশ্বকাপ এখন শেষ চারের মঞ্চে। এ মঞ্চে আজ রাতে প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই ফুটবল পরাশক্তি ফ্রান্স ও স্পেন। দুই দলের খেলার ধরন ভিন্ন। ফ্রান্সের শক্তির জায়গা গতি, শক্তি আর ক্ষিপ্র আক্রমণে প্রতিপক্ষকে মুহূর্তেই বিধ্বস্ত করার ক্ষমতা। আর স্পেন মানে বলের ওপর অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত ছন্দময় শৈল্পিক পাস। এই লড়াইয়ে যেমন থাকবে দুই দলের কৌশলের দ্বন্দ্ব, তেমনি থাকবে দুই প্রজন্মের দুই মহাতারকার আলাদা এক গল্পও। এদের একজন সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পে। অন্যজন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে অল্প বয়সেই বিস্ময়ে পরিণত হওয়া লামিন ইয়ামাল। এমবাপ্পে কি তার অভিজ্ঞতা ও দুরন্ত গতিতে ফ্রান্সকে নিয়ে যাবেন আরেকটি ফাইনালে? ছড়াবেন ফরাসী সৌরভ? নাকি ইয়ামাল তার জাদুকরী ছন্দে স্পেনকে পৌঁছে দেবেন স্বপ্নের ঠিকানায়?
তবে কোনো একজনকে নিয়ে বেশি ভাবতে নারাজ ফ্রান্স। তাদের লক্ষ্য শক্তিশালী স্পেনকে হারানো। তাই একজন বা দুজন ফুটবলার নয়, গোটা দলকে নিয়ে ভাবছে ফ্রান্স। এমনটাই জানিয়েছেন ফরাসি সেন্টার ব্যাক ইব্রাহিমা কোনাতে। ম্যাচের আগে কোনাতে জানিয়েছেন, স্পেনের মতো দলকে হারাতে হলে নিজেদের সেরা খেলাটা খেলতে হবে। তার জন্যই তৈরি হচ্ছেন তারা। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে কোনাতে বলেন, ‘কাউকে ভয় পেলে চলবে না। সামনে কঠিন লড়াই। তার জন্য তৈরি হচ্ছি। আশা করি শেষ হাসিটা আমরাই হাসব।’
এবারের বিশ্বকাপে মাত্র একটি গোল করলেও ইয়ামালের গতি ও ড্রিবল সমস্যায় ফেলেছে প্রতিপক্ষকে। বার বার প্রান্ত ধরে আক্রমণে উঠেছেন। কখনও ক্রস বাড়িয়েছেন। কখনও নিজে শট মেরেছেন। অপরদিকে বিশ্বকাপের গত দু’দশকে সবচেয়ে ধারাবাহিক দল ফ্রান্স। এর আগে ১৯৯৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সাতটি বিশ্বকাপের চারটিতে ফাইনাল খেলেছে তারা। দুইবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দুইবার রানার্স। ১৯৭৪ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে পাঁচ বিশ্বকাপের চারটিতে ফাইনাল খেলেছিল তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি। এ বার ফাইনালে উঠলে জার্মানির সেই দাপটকেও ছাপিয়ে যাবে ফ্রান্স।
চলতি বিশ্বকাপে দুরন্ত ছন্দে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। গোলের জন্য তার উপর ভরসা ফ্রান্সের। উসমান দেম্বেলও পাঁচ গোল করে ফেলেছেন। গোটা দলকেই ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। তবে সামনে স্পেন। ফলে লড়াই সহজ হবে না।
সেমি–ফাইনালে ফরাসিদের মুখোমুখি হওয়ার আগে, প্রতিপক্ষের গতিময় ফুটবল নিয়ে সতর্ক লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তাই বলে নিজেদের কৌশলে বদল আনার পক্ষে নন তিনি। স্বাভাবিক খেলাটা খেলেই অতীতের মতো এবারও ফ্রান্সকে হারাতে আত্মবিশ্বাসী স্পেন কোচ।
এবারের বিশ্বকাপে গতি দিয়ে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিচ্ছে ফ্রান্স। দাপুটে ফুটবলে শতভাগ জয় নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। শেষ বত্রিশ, শেষ ষোলো, শেষ আটে; নকআউটের কোনো ম্যাচে এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে খেলতে হয়নি তাদের। ফ্রান্সকে এবার মনে করা হচ্ছে শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার। তবে ফেভারিটদের তালিকায় আছে স্পেনও। ২০১০ আসরের চ্যাম্পিয়দের আসরের শুরুটা কিছুটা অপ্রত্যাশিত হলেও, সময়ের সঙ্গে ছন্দ খুঁজে পেতে শুরু করেছে তারা। নবাগত কেইপ ভার্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচ গোলশূন্য ড্র করে স্পেন। পরে সৌদি আরব ও উরুগুয়েকে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয় তারা। এখন পর্যন্ত কোনো নকআউট ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে খেলতে হয়নি তাদেরও।
ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আজ রাত ১টায় ডালাসে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসেদের মুখোমুখি হবে স্পেন। তিন বছরের মধ্যে ফরাসিদের বিপক্ষে স্প্যানিশদের এটি তৃতীয় লড়াই। সবশেষ দুটিতেই হেসেছিল দে লা ফুয়েন্তের দল। ২০২৪ সালে ইউরোর সেমি–ফাইনালে ও পরের বছর নেশন্স লিগের সেমি–ফাইনালে জয় পায় স্পেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে গত দুই ম্যাচের সাফল্য স্বাভাবিকভাবেই আত্মবিশ্বাস যোগাচ্ছে স্পেনকে। তবে বর্তমান ফরাসি দলকে একটু ভিন্ন চোখেই দেখছেন স্পেনের ইউরো জয়ী কোচ দে লা ফুয়েন্তে। তার ভাষায়, যেকোনো প্রতিযোগিতার এই পর্যায়ে, ফ্রান্স সবসময়ই শিরোপার প্রধান দাবিদারদের একটি। বিশ্বকাপের সেমি–ফাইনালে ওঠা অনেক কঠিন। সব প্রতিপক্ষই ভীষণ শক্তিশালী থাকে, দল হিসেবে আমরাও যথেষ্ট শক্তিশালী। ফাইনালের পথ এখন উন্মুক্ত।’
আসরে সবচেয়ে শক্তিশালী আক্রমণভাগের একটি ফ্রান্সের। গত ছয় ম্যাচে, প্রতিপক্ষের জালে ১৬ গোল করে দলটি দেখিয়েও দিয়েছে নিজেদের সামর্থ্য। স্পেনের আক্রমণভাগও দুর্বল নয় মোটেও; সেরা চারে তারা উঠে এসেছে ১১ গোল করে। পরিসংখ্যানের এই পাতায় ফ্রান্স এগিয়ে থাকলে, গোল কম হজমের পাতায় এগিয়ে স্পেন। ছয় ম্যাচে তারা খেয়েছে মাত্র একটি। এর অর্থ, বাকি পাঁচ ম্যাচে ক্লিনশিট নিয়ে মাঠ ছাড়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।









