পাউবোর ২১ স্লুইচগেট নির্মাণ শেষে হস্তান্তর করা হবে চসিককে

হবে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ পরিচালনায় দেওয়া হবে প্রশিক্ষণ

আজাদী প্রতিবেদন | মঙ্গলবার , ১৪ জুলাই, ২০২৬ at ৬:০১ পূর্বাহ্ণ

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবে) ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের আওতাভুক্ত ২১টি স্লুইচগেট নির্মাণ শেষে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) কাছে হস্তান্তর করা হবে। এক্ষেত্রে প্রকল্পটি হস্তান্তরের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চসিকের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি হবে। প্রকল্পটি যাতে চসিক ঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে সেজন্য সেনাবাহিনী ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কারিগরি জনবলের মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশনের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। গতকাল সোমবার দুপুরে টাইগারপাসে চসিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পটির অগ্রগতি এবং প্রকল্পটি সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর বিষয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ ও সাঈদ আল নোমান, পানিসম্পদ সচিব ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিন, সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন এবং চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম।

সভা শেষে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পটি আমরা সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করব। প্রকল্পটি হস্তান্তরের বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি হবে। আমি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মহোদয়কে অনুরোধ করেছি এক বছর যেহেতু আমাদের এই প্রকল্পের মেয়াদ আছে, এক বছরের মধ্যে এই প্রকল্প পরিচালনার জন্য সিটি কর্পোরেশনের প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ করতে হবে। আমরা চাই প্রকল্পটি যেন চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই স্লুইচগেটগুলো পুরোপুরি সচল হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করছি। তিনি বলেন, রেকর্ড বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের কোনো কোনো স্থানে জলাবদ্ধতা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে আমরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট পরিদর্শন করেছি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রামের রেকর্ড বৃষ্টিপাতের বিষয়ে অবগত আছেন এবং সেজন্যই উনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন এখানে স্লুইচগেট নির্মাণের যে প্রজেক্টটি শেষের পর্যায়ে আছে এই প্রজেক্ট যেন কোনো কারণে ব্যাহত না হয় এবং চট্টগ্রামের মানুষ কোনোভাবেই যেন ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতার সম্মুখীন না হয়। এভাবে যদি আমাদের রেকর্ড বৃষ্টিপাতও হয় সেখানে দ্রুততার সঙ্গে যেন পানি নিষ্কাশন হয়, সেই বিষয়টা মাথায় রেখেই উনি এই প্রজেক্টটা সমাপন করার নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের মধ্যেও চট্টগ্রাম নগরীতে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করতে চলমান জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরো জোরদার করা হবে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাঁশখালী ও সাতকানিয়াসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাঙ্গু ও মাতামুহুরীসহ বিভিন্ন নদীর ধারণক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে কমে গেছে, যা এবারের বন্যার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতি ২৫৩০ বছর পরপর নদীতে পলি জমে প্রবাহ কমে যায় এবং তীর ভাঙনও বেড়ে যায়। এই সমস্যা সমাধানে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাজ শুরু হয়েছে। পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়ন হলে এসব নদীও ধীরে ধীরে নাব্যতা ফিরে পাবে।

সভায় মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে কাতালগঞ্জ, বহদ্দারহাট, চকবাজার, হিজড়া খাল ও বামনশাহী খালের বিভিন্ন অংশের কাজসহ প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ এখনো বাকি থাকায় কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। অবশিষ্ট কাজ দ্রুত সম্পন্ন হলে নগরবাসী প্রকল্পটির পূর্ণ সুফল ভোগ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য ড্রেন ও খালে গিয়ে পড়ছে, যা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

শাহাদাত বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর, আধুনিক ও টেকসই করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অধীনে একটি স্বতন্ত্র ওয়াটার লগিং ডিপার্টমেন্ট গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিভাগ রেগুলেটর, পাম্প, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক ও খালসমূহের সার্বক্ষণিক তদারকি এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দায়িত্ব পালন করবে। তিনি জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় সিটি কর্পোরেশন ৭ হাজার প্যাকেট খাদ্য সহায়তা বিতরণ করেছে।

সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, স্লুইচগেটগুলোর মাপ পানি অপসারণের উপযোগী কি না তা যাচাই করতে হবে। এগুলো বড় করা দরকার নাকি ছোট করা দরকার, নাকি ঠিকভাবে আছে সে বিষয়ে সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে খালনালা পরিষ্কার করার কার্যক্রম আরো বেগবান করতে হবে। বর্তমানে কাউন্সিলর না থাকায় ওয়ার্ড পর্যায়ে পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয় সেজন্য মনিটরিং বাড়াতে হবে।

সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, আমি বারুনিঘাট এবং ২৬ নম্বরে দুটো খাল দেখে আসলাম। ছড়া বলতে পারেন। দেখলাম সবকিছু ব্লক হয়ে আছে। এর পেছনে ১৬ নম্বর স্লুইচগেট। আমি ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাহেবকে ওখান থেকে ফোন করে জানিয়েছি, ওখানে স্লুইচগেট ছোটটাও বন্ধ, যেটা বড় তৈরি করা হয়েছে, অনেক বড় করে, অনেক খরচ করে, ওটাও বন্ধ এবং ওটার সাথে কোনো কানেকশন নাই সাগরের অথবা মহেশখালের। এই কারণগুলো আমাদের খুঁজে দেখতে হবে কেন এমন হলো?

পানিসম্পদ সচিব ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করার জন্য আমাদের সবাই কাজ করছে। এই প্রকল্পটি যেহেতু প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ, ৫ শতাংশ বাকি আছে। এটি আগামী জুনে শেষ হয়ে যাবে। আমরা যদি এখন থেকে এটার এঙিট প্ল্যান না করি তাহলে এটার ফুল ইমপ্লিমেন্টেশনের সুফলটা আগামী বর্ষা সিজনে পাব না। এজন্য একটা এমওইউ ড্রাফট করে স্থানীয় সরকারের কাছে পাঠিয়ে দিব। এই এমওইউ চেক করতে ও অনুমোদন করতে দুইতিন মাস লাগতে পারে। যারা পাম্পগুলো নির্মাণ করেছে তারা বিনামূল্যে এগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লোকবলকে প্রশিক্ষণ দিবে। এজন্য দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে।

সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, দীর্ঘমেয়াদে রেগুলেটর, স্লুইচগেট ও সংশ্লিষ্ট ড্রেনেজ অবকাঠামোর কার্যকর পরিচালনা নিশ্চিত করতে এসব স্থাপনার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের হাতে ন্যস্ত করা প্রয়োজন। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; বরং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল মনিটরিং, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল দীর্ঘমেয়াদে নগরবাসী ভোগ করতে পারবেন।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, স্লুইচগেটগুলো মেইনটেনেন্স করার জন্য আলাদা মেইনটেনেন্স টিম করতে হবে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে, অথবা অন্য যেকোনো ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে যেতে হবে, যাতে মনিটরিং সিস্টেমে আমরা দেখতে পারি আবহাওয়ার অবস্থা কী এবং সাগরে কখন জোয়ারভাটা হবে। সবগুলো একটা মনিটরিং সিস্টেম আনতে হবে এবং একটা ডিপার্টমেন্ট থাকতে হবে যেটি এই তথ্যগুলো মনিটরিং করবে। ভবিষ্যতে ড্রেনগুলো বার্ষিক মেইনটেন্সের আওতায় আনতে হবে। ড্রেন সব সময় সচল রাখতে হবে, পরিষ্কার রাখতে হবে।

সভায় উপস্থিত ছিলেন সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া, ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার মো. ওবায়দুর রহমান ও সিডিএর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আহমদ মঈনুদ্দিন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধননদের স্বামী বকাঝকার পর কেড়ে নেন ফোন, পরে প্রবাসীর স্ত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
পরবর্তী নিবন্ধনগরের ১৯৬ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতবিক্ষত