ডালাস স্টেডিয়ামে রেফারির শেষ বাঁশি বেজে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ ইস্পাতকঠিন মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন রোনালদো। শুকনো মুখে এ দিক–ও দিক তাকালেন। বোধহয় বোঝার চেষ্টা করছিলেন কী ঘটে গিয়েছে। সতীর্থ থেকে বিপক্ষ, সকলেই এসে একে একে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছেন। কিছুই ছুঁতে পারছিল না তাকে। উদাস দৃষ্টিতে চোখ ঘোরাফেরা করছিল স্টেডিয়ামের বিভিন্ন দিকে। একটা সময় আর থাকতে পারলেন না। আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করলেন। তত ক্ষণে চোখের কোণ ভরে এসেছে। তিনি বুঝতে পারছিলেন, এই মঞ্চে আর আসা হবে না। এটাই শেষ বার। আরও এক বার খালি হাতেই ফিরতে হল তাকে।
ডালাসে সোমবার শেষ ষোলোর ম্যাচটি ১–০ গোলে জিতেছে ২০১০ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন। আর তাতে করেই শেষ হয়ে গেল পাঁচবারের ব্যালন ডিওর জয়ী, রেকর্ড ছয় বিশ্বকাপের গোলদাতা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায়। দুই ইউরোপীয় জায়ান্ট স্পেন ও পতৃুগালের ম্যাচটি শুরু থেকে চলছিল ঢিমেতালে। মনে হচ্ছিল খেলা গড়া অতিরিক্ত সময়ে, এরপরে টাইব্রেকারে। না তা হলো না। নির্ধারিত সময়ের খেলা যখন প্রায় শেষ, আচমকা এক ঝলকে ভেঙে পড়ল পর্তুগালের রক্ষণ। বদলি নেমে দলকে পথ দেখালেন মিকেল মেরিনো। তার একমাত্র গোলে পর্তুগালকে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার–ফাইনালে উঠল স্পেন। তাতেই শেষ হয়ে যায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায়। ক্লাব ফুটবলে অফুরন্ত সাফল্য পাওয়া এই মহাতারকা জাতীয় দলের হয়ে একবার জিতেছেন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, কিন্তু এই সোনালী ট্রফির স্বাদ আর পাওয়া হলো না তার। গত রোববার সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ। তবে সোমবার যেন বিদায়ের দিনটা না আসে। সেই ইচ্ছাপূরণ হল না রোনালদোর। ফাইনালের দু’সপ্তাহ আগেই রোনালদোর যাত্রা থামিয়ে দিল প্রতিবেশী দেশ স্পেন। অথচ এই দলের বিরুদ্ধেই ২০১৮–য় হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি। সেই রোনালদো এবং এই রোনালদোর মধ্যে অনেক তফাত। এই রোনালদোর ক্ষিপ্রতা, আগ্রাসন, গতি– সব কিছুই উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। এ দিন দু’–একটি এমন বল পেলেন যেখানে থেকে বছর দুয়েক আগেও অনায়াসে গোল করতে পারতেন। মিস্ করার পর হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে যতই বোঝাতে চান যে ইঞ্চি খানেকের ব্যবধান, রোনালদো জানতেন অসম্ভবকে সম্ভব করার ক্ষমতা আর তার নেই। অথচ পর্তুগাল যে হারার মতো খেলেছে এ কথা বলা যাবে না। বরং ম্যাচের বেশ কিছুটা সময় তাদের আধিপত্য ছিল। গ্রুপ পর্বে বা নকআউট পর্বের ম্যাচগুলিতে পর্তুগালের খোলনলচে বেরিয়ে পড়লেও, স্পেনের বিরুদ্ধে তারা লড়াই করছিল সমানে–সমানে। কিন্তু স্পেনের বিরুদ্ধে যতটা ভাল খেলা দরকার, ততটা ভাল খেলতে পারেনি। শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে খেলতে নামলে একটা–আধটা সুযোগ হাতছাড়া করলেও চলে না। সেখানে পর্তুগাল এমন কিছু সুযোগ হাতছাড়া করেছে যা থেকে নিশ্চিত গোল হতে পারত। তাদের শেষ আক্রমণটিতেও একটু সতর্ক থাকলে গোল করা যেত। শেষের দিকে পর্তুগালের আক্রমণের ঝড় দেখা গিয়েছে বটে। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন রোনালদো। তিনি বলেছেন, ‘আমরা সর্বস্ব দিয়েও পারিনি। আমরা সত্যিই দুঃখিত। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমি আমার সবকিছু দিয়েছি। নিজের সেরাটা দিয়েছি। আমি স্বচ্ছ বিবেক নিয়ে বিদায় নিচ্ছি। এটাই ফুটবল। এটাই একজন ফুটবল খেলোয়াড়ের জীবন। কখনও আমরা জিতি। কখনও হারি।’










