কেপ ভার্দের প্রবল প্রতিরোধ, আর্জেন্টিনার রুদ্ধশ্বাস জয়

| রবিবার , ৫ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৪৬ পূর্বাহ্ণ

প্রথমার্ধের ক্লান্তিকর ফুটবলের মাঝে লিওনেল মেসির মুহূর্তের ঝলকে এগিয়ে গেল আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষের বিবর্ণতার সুযোগে বিরতির পর ঘুরে দাঁড়াল কেপ ভার্দে। নড়ে উঠলেন মেসিমার্তিনেজরা; কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কেউ পারলেন না ব্যবধান গড়ে দিতে। অতিরিক্ত সময়ে আবার এগিয়ে গেল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা এবং ফের সমতায় ফিরল আসরের চমক জাগানো দলটি। বারবার মোড় বদলের পর, উত্তেজনায় ঠাসা লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ব্যবধান গড়ে দিল একটি আত্মঘাতী গোল। শিরোপা ধরে রাখার আশা টিকে রইল লিওনেল স্কালোনির দলের। মায়ামি গার্ডেন্সের হার্ড রক স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় গতকাল শনিবার সকালে শেষ হওয়া ১২০ মিনিটের ম্যাচে ৩২ গোলে জিতেছে তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। খবর বিডিনিউজের।

মেসির গোলে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধে নেমে সমতা টানেন দেরয় দুয়ার্তে। এরপর অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের গোলে আবার এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা, এবং কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয়বার সমতায় ফেরে কেপ ভার্দে। পরে, ডিনে বোর্জেস দুর্ভাগ্যবশত আত্মঘাতী হলে, শেষ ষোলোর টিকেট পায় স্কালোনির দল। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা দলটি ১২০ মিনিট ধরে যেভাবে চোখে চোখ রেখে লড়াই করল, অবিশ্বাস্য। লড়াই কতটা জমজমাট ছিল, তা পরিসংখ্যানেও ফুটে উঠছে। ৬০ শতাংশের বেশি সময় পজেশন রেখে গোলের জন্য ২২ শট নিয়ে ১০টি লক্ষ্যে রাখতে পারে আর্জেন্টিনা। আর কেপ ভার্দের ১৬ শটের পাঁচটি ছিল লক্ষ্যে।

আর্জেন্টিনার অতিআয়েশী ভঙ্গির বিপক্ষে কেপ ভার্দের রক্ষণের দৃঢ়তায়, প্রথম হাইড্রেশন ব্রেকের আগে তেমন কিছুই হলো না। মাঝে ভালো পজিশনে একটি ফ্রি কিক পায় শিরোপাধারীরা; তবে মেসির দুর্বল শট জমে যায় গোলরক্ষকের গ্লাভসে। ওই বিরতি থেকে ফেরার পরই অবশ্য চেনা রূপে ধরা দেন মেসি এবং দারুণ নৈপুণ্যে দলকে এগিয়ে নেন। লিসান্দ্রো মার্তিনেজের উঁচু করে বাড়ানো থ্রু বল ডিবক্সে প্রথম ছোঁয়ায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে, দুরূহ কোণ থেকে বাঁ পায়ের শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।

চলতি আসরে মেসির গোল হলো ৭টি, গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে ফের বসলেন তালিকার শীর্ষে। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার মোট গোল হলো ২০টি। জাতীয় দলের হয়ে তার মোট গোল হলো ১২৪টি, ২০৩ ম্যাচে।

কাঙ্ক্ষিত গোল পেলেও, প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার খেলায় গতি ফেরেনি। ৪৫তম মিনিটে আরেকটি সুযোগ অবশ্য তৈরি করে তারা, তবে ডিবঙের বাইরে থেকে এন্সো ফের্নান্দেসের শট ঝাঁপিয়ে আটকে দেন ভজিনিয়া।

প্রথমার্ধে কেবল দুটি লক্ষ্যভ্রষ্ট শট নিতে পারা কেপ ভার্দ বিরতির পর পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। প্রথম ১৫ মিনিটের বেশিরভাগ সময় প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ ধরে রাখে তারা এবং আদায় করে নেয় গোলও। ৫৪তম মিনিটে প্রথমবার গোলের সম্ভাবনা জাগায় প্রথমবার বিশ্বকাপে আসা দলটি। তবে, দুয়ার্তের নিচু শট ঝাঁপিয়ে রুখে দেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।

এর পাঁচ মিনিট পরই আর্জেন্টাইনদের হতবাক করে দেয় কেপ ভার্দ। রায়ান মেন্দেসের পাস ছয় গজ বঙের ডান দিকে একদম ফাঁকায় পেয়ে যান দুয়ার্তে, তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এগিয়ে যান লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, তার দুই পায়ের ফাঁক দিয়েই জোরাল শটে দূরের পোস্ট দিয়ে গোলটি করেন মিডফিল্ডার দুয়ার্তে।

ওই ধাক্কার পর, আর্জেন্টিনা দলে কিছুটা মরিয়া ভাব ফুটে ওঠে। তিন মিনিটের মধ্যে আবার এগিয়েও যেতে পারতো আর্জেন্টিনা, তবে এবার ডিবঙে দারুণ পজিশন থেকে গোলরক্ষক বরাবর শট নেন মেসি। কিছুক্ষণ পর তাদের আরেকটি আক্রমণ রুখতে গিয়ে ডিবঙের ঠিক বাইরে মেসিকে ফাউল করেন দুয়ার্তে। রেকর্ড আটবারের ব্যালন দ’র জয়ীর নেওয়া ফ্রি কিকে বল রক্ষণ দেয়ালের ওপর দিয়ে লক্ষ্যেই ছিল, লাফিয়ে আটকান ভজিনিয়া।

৮১তম মিনিটে আবার ভীতি ছড়ায় আর্জেন্টিনা। ডিবঙে ডান দিক থেকে নাহুয়েল মোলিনা গোলমুখে এন্সো ফের্নান্দেসের উদ্দেশে পাস বাড়ান, গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে বল লক্ষ্যেই ছিল, দারুণ নৈপুণ্যে কোনোমতে বল বাইরে পাঠান পিকো লোপেস। সেখানে আত্মঘাতী হওয়ার যথেষ্ট ঝুঁকিও ছিল।

নির্ধারিত সময়ের দুই মিনিট বাকি থাকতে একটু বিতর্ক ছড়ায়। মেসির ডিবঙে বাড়ানো ক্রসে লাফিয়ে হেড করেন আলেঙিস মাক আলিস্তের, এই মিডফিল্ডারের মাথা হয়ে তার সঙ্গে লাফিয়ে ওঠা পিকো লোপেসের হাতে বল লাগলে পেনাল্টির জোরাল আবেদন ওঠে। যদিও রেফারির সাড়া মেলেনি। আট মিনিট যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে আবার বিপজ্জনক পজিশনে ফ্রি কিক পায় আর্জেন্টিনা। এবার নিচু করে শট নেন মেসি, বল সোজাসুজি আসলেও একটু তালগোল পাকান ভজিনিয়া, তবে বিপদ হয়নি তাদের।

অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলা শুরু হতেই বহুল কাঙ্ক্ষিত দ্বিতীয় গোলটি পায় আর্জেন্টিনা। মেসির কর্নারে বল মাক আলিস্তেরের মাথা ছুঁয়ে দূরের পোস্টে পেয়ে যান লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। অরক্ষিত এই ডিফেন্ডার নিখুঁত জোরাল শটে কাছের পোস্ট দিয়ে লক্ষ্যভেদ করেন।

জাতীয় দলের হয়ে ৩১ ম্যাচের ক্যারিয়ারে দুটি গোল হলো তার, বিশ্বকাপে প্রথম। তাদের আনন্দ বা স্বস্তি কোনোটাই অবশ্য বেশিক্ষণ থাকেনি। ১০২তম মিনিটে অসাধারণ সুন্দর এক গোলে আরেকবার ম্যাচে সমতা টানেন লোপেস কাবরাল। সতীর্থের পাস ডিবঙের বাঁ দিকে পেয়ে, মাক আলিস্তেরকে কাটিয়ে ভেতরে ঢুকেই শট নেন তিনি। বল হাওয়ায় ভেসে, বাঁক খেয়ে দূরের পোস্ট দিয়ে ঠিকানা খুঁজে নেয়। দুই মিনিট পর, আবার সুযোগ আসে মেসির সামনে। কিন্তু তার জোরাল শট রুখে দেন ভজিনিয়া।

অবশেষে ১১১তম মিনিটে প্রতিপক্ষের দুর্ভাগ্য আর্জেন্টিনার জন্য সৌভাগ্য হয়ে আসে। মেসির কর্নারে লাফিয়ে হেড করেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, বল ডিনে বর্জেসের হাতে লেগে গোললাইন পেরিয়ে যায়। ঝাঁপিয়েও নাগাল পাননি ভজিনিয়া। তবে বিস্ময়ের জন্ম দেওয়া কেপ ভার্দ হাল ছাড়েনি শেষ পর্যন্ত। ১১৬তম মিনিটে আবারও গোল প্রায় পেয়েই যাচ্ছিল তারা; ডিবঙের বাঁ দিক থেকে দুর্দান্ত এক ফ্রি কিক নেন সিডনি কাবরাল, ক্রসবার ঘেঁষে বল জালে জড়াতে যাচ্ছিল, কোনোমতে এক হাত দিয়ে বাইরে পাঠান মার্তিনেজ। বাকিটা সময় কোনোমতে কাটিয়ে, শেষের বাঁশি বাজতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে আর্জেন্টিনা শিবির। আর উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্জেন্টাইন গ্যালারি।

কোয়ার্টারফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আটলান্টায় আগামী মঙ্গলবার মিশরের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিশু ইরা হত্যার রায় ঘোষণা ৭ জুলাই
পরবর্তী নিবন্ধসরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য ছয় নির্দেশনা