ফুটপাত কার : পথচারীর অধিকার ও ভ্রাম্যমাণ বাজার নিয়ে কিছু কথা

মনোয়ার হোসেন রতন | শনিবার , ৪ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৫৭ পূর্বাহ্ণ

একটি সভ্য শহরকে চেনার অন্যতম সহজ উপায় হলো তার ফুটপাত। প্রশস্ত সড়ক, উঁচু দালান কিংবা দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা আধুনিকতার প্রতীক হতে পারে, কিন্তু একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকের মৌলিক চলাচলের অধিকার কতটা নিশ্চিত করতে পেরেছে, তার বাস্তব প্রতিচ্ছবি দেখা যায় ফুটপাতে। কারণ ফুটপাত নির্মিত হয় পথচারীর জন্য শিশু, বৃদ্ধ, নারী, প্রতিবন্ধী, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী কিংবা সাধারণ নাগরিকের নিরাপদ চলাচলের উদ্দেশ্যে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের ভিন্ন এক চিত্র দেখায়। রাজধানী ঢাকা থেকে বিভাগীয় শহর, জেলা সদর থেকে উপজেলা, এমনকি অনেক গ্রামীণ বাজারেও ফুটপাত আজ পথচারীর জন্য নয়; বরং ভ্রাম্যমাণ দোকান, অস্থায়ী বাজার, অবৈধ স্থাপনা, মোটরসাইকেল পার্কিং, নির্মাণ সামগ্রী এবং বিভিন্ন ধরনের দখলের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। অনেক স্থানে ফুটপাতের অস্তিত্ব থাকলেও সেখানে হাঁটার কোনো সুযোগ নেই। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যস্ত সড়কে নেমে হাঁটে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত দুর্ঘটনার আশঙ্কায় ভরা।

এটি শুধু একটি নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি নাগরিক অধিকার, সুশাসন এবং আইনের শাসনের প্রশ্ন। প্রতিদিন আমরা দেখি, একটি মা তার শিশুকে নিয়ে গাড়ির পাশ ঘেঁষে হাঁটছেন, একজন বৃদ্ধ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন, একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নিরাপদ পথ না পেয়ে অসহায়ভাবে এগিয়ে চলেছেন। তারা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না; তারা শুধু চান তাদের জন্য নির্মিত ফুটপাটে নিরাপদে হাঁটার অধিকার।

অন্যদিকে, ফুটপাতে বসা অধিকাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও এই রাষ্ট্রেরই নাগরিক। তাদের অনেকেই দারিদ্র্য, বেকারত্ব কিংবা সীমিত কর্মসংস্থানের কারণে জীবিকার তাগিদে ফুটপাতে ব্যবসা করতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের অনেকের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, সন্তানের পড়াশোনা, বৃদ্ধ বাবামায়ের ওষুধের খরচ এবং প্রতিদিনের জীবন সংগ্রাম। তাই সমস্যাটিকে কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ উপেক্ষিত হবে। এই কারণেই সমাধান হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। একদিকে পথচারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পরিকল্পিত বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক বিশ্বের বহু শহরে নির্ধারিত হকার জোন, নির্দিষ্ট সময় ভিত্তিক স্ট্রিট মার্কেট এবং স্বল্প মূল্যের ক্ষুদ্র ব্যবসা কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে পথচারীর চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয় না, আবার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জীবিকাও বন্ধ হয় না।

বাংলাদেশেও এমন পরিকল্পনা গ্রহণ করা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান প্রায়ই সাময়িক হয়ে থাকে। প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান চালায়, কয়েক দিন ফুটপাত পরিষ্কার থাকে, তারপর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এই পুনরাবৃত্তির কারণ কেবল দরিদ্র মানুষের জীবিকার সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠী, চাঁদাবাজি, দুর্বল তদারকি এবং আইনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রয়োগ। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান আর হয় না।

একটি রাষ্ট্রের আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন তা সবার জন্য সমান ভাবে প্রযোজ্য হয়। ফুটপাত যদি জনগণের সম্পদ হয়, তাহলে তার ব্যবহারও জনগণের স্বার্থেই নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা প্রতিষ্ঠানের অবৈধ দখলদারিত্বকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না।

আমরা প্রায়ই উন্নত দেশের উদাহরণ দিই। কিন্তু উন্নত শহরের সৌন্দর্য কেবল উঁচু ভবনে নয়; সেখানে একজন পথচারী নির্ভয়ে হাঁটতে পারেন, একজন হুইল চেয়ার ব্যবহারকারী স্বাধীন ভাবে চলতে পারেন, একজন শিশু নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে। এই ছোট ছোট বিষয় গুলোই একটি সভ্য নগর ব্যবস্থার প্রকৃত পরিচয় বহন করে।

আজ বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনায় পথচারী যেন সবচেয়ে অবহেলিত নাগরিক। আমরা ফ্লাইওভার নির্মাণ করি, এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করি, নতুন সড়ক নির্মাণ করি; কিন্তু ফুটপাতকে কার্যকর ও নিরাপদ রাখার বিষয়ে সমান গুরুত্ব দিই না। অথচ একটি শহরে সবচেয়ে বেশি মানুষ চলাচল করেন পায়ে হেঁটে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ফুটপাতের প্রশ্নটি তাই কেবল ইটপাথরের নয়; এটি মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং নাগরিক মর্যাদার প্রশ্ন। একজন পথচারীর জীবন যেমন মূল্যবান, তেমনি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবন সংগ্রামও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ন্যায্য ভারসাম্য সৃষ্টি করা।

প্রয়োজন একটি জাতীয় নীতি, যেখানে ফুটপাত হবে সম্পূর্ণ পথচারী বান্ধব; একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পরিকল্পিত ও আইন সম্মত বিকল্প বাজার, হকার জোন এবং পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি অবৈধ দখল, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে কঠোর ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে নিরাপদ ও সহজ করে। একজন নাগরিক যদি নিজের শহরের ফুটপাতে নিশ্চিন্তে হাঁটতে না পারেন, তবে সেই উন্নয়নের দাবি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ফুটপাত কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি নাগরিকের অধিকার। আর অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আজ সময় এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন করার আমাদের ফুটপাত কি সত্যিই পথচারীর? যদি উত্তর নাহয়, তবে সেই না‘-কে হ্যাঁ‘-তে রূপান্তর করার দায়িত্ব আমাদের সবার রাষ্ট্রের, প্রশাসনের, জনপ্রতিনিধিদের এবং সচেতন নাগরিক সমাজের। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার আকাশচুম্বী অট্টালিকায় নয়; বরং তার ফুটপাতে নির্ভয়ে হাঁটা সাধারণ মানুষের পদচারণায়।

লেখক: প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅস্তিত্বের ব্যাকরণ: পরিচয় শুধু ‘নারী’ নয়, ‘মানুষ’
পরবর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে