যুগে যুগে নবী রাসূলগণ ইক্বামতে দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্যে আল্লাহর জমিনে রক্ত ঝরিয়েছেন, ত্যাগ করেছেন, কুরবানি করেছেন শুধুমাত্র আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্যে। তাঁদের ত্যাগ ও কুরবানির ফসল হিসেবে ইসলামকে আল্লাহর এই জমিনে পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখেছিলেন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীগণ এবং সেই মহান সাহাবীগণ তাঁদের সেই স্বপ্ন পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন বিশ্ব জাহানকে। ইসলামের চার খলিফা ২৯ বছর ৬ মাস আল্লাহর কোরআন ও রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহ দিয়ে পৃথিবী শাসন করেছেন। যার আদর্শ ছিলেন আমাদের প্রাণপ্রিয় রাসূল (সাঃ) সায়্যিাদেনা মুরসালিন, রাহমাতুল্লিল আ’লামিন (সাঃ)। চার খলিফা আল্লাহর জমিনে যে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, তা আগামী কেয়ামত পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকবে ইনশাল্লাহ। যদিও মুসলিম নামধারী মুনাফেক গোষ্ঠী খেলাফত প্রতিষ্ঠার নামে কুরআন সুন্নাহ বিরোধী আইন প্রণয়ন এর মাধ্যমে মুসলিম জাতির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে যাচ্ছে। অথচ এই দ্বীন প্রতিষ্ঠাকে আল্লাহতায়ালা ফরজ করে দিয়েছেন, ‘(হে মানুষ) আল্লাহতায়ালা তোমাদের জন্যে সেই বিধানই নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ তিনি দিয়েছিলেন নূহকে এবং যা আমি তোমার কাছে ওহী করে পাঠিয়েছি, যার আদেশ আমি ইব্রাহিম, মুসা ও ঈসাকে দিয়েছিলাম (এদের সবাইকে আমি বলেছিলাম) তোমরা এই বিধানকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং (কখনো) এতে অনৈক্য সৃষ্টি কর না’–সূরা আশশূরা– ১৩। দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি এই যে, এই বিধানকে জমিনে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আমরা মুসলমানরাই নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন ইখতিলাফ করে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা করে যাচ্ছি। আল্লাহতায়ালা অন্যত্র বলেন, ‘অনেক নবীই ছিল, আল্লাহর প্রতি যুদ্ধ করেছে, তাঁর সাথে আরও যুদ্ধ করেছে অনেক সাধক ব্যক্তি। আল্লাহর পথে তাঁদের প্রতি যত বিপদ–মুসিবত এসেছে তাতে তাঁরা হতাশ হয়ে পড়েনি, তাঁরা দুর্বলও হয়নি (বাতিলের সামনে তাঁরা) মাথাও নত করেনি, আল্লাহতায়ালা ধৈর্যশীলদের ভালবাসেন’– সূরা আল ইমরান–১৪৬। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসিরে এসেছে, ওহুদ প্রান্তরে মুসলিমগণ পরাজিত হয়েছিলেন এবং তাতে কিছু সংখ্যক লোক শহীদও হয়েছিলেন। সেদিন শয়তান এও প্রচার করেছিল যে, মোহাম্মদ (সাঃ)ও শহীদ হয়েছেন। আর এদিকে ইবনে কামিআ নামক এক কাফির মুশরিকদের মধ্যে প্রচার করে যে, আমি মোহাম্মদ(সাঃ)কে হত্যা করে এসেছি। প্রকৃতপক্ষে শয়তানের কথা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও গুজব এবং ঐ ব্যক্তি ও মিথ্যা ছিল। সে রাসূল (সাঃ)কে আক্রমণ করেছিল বটে তাতে শুধুমাত্র তাঁর মুখমন্ডল কিছুটা আহত হয়েছিল, তা ছাড়া আর কিছুই হয়নি। এই মিথ্যা সংবাদে মুসলিমদের মন ভেঙ্গে যায়, তাদের পা টলে যায় এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নে উদ্যত হয়। তখন সাথে সাথে নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়, ‘এবং মোহাম্মদ (সাঃ) রাসূল ছাড়া কিছুই নয়, নিশ্চয় তাঁর পূর্বে রাসূলগণ বিগত হয়েছে। এতে বলা হয়, পূর্বের নবীগণের মত মোহাম্মদ (সাঃ) ও একজন নবী। হতে পারে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হবেন, কিন্তু আল্লাহতায়ালার দ্বীন দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করবে না। একটি বর্ণনায় রয়েছে, একজন মুহাজির একজন আনসারকে ওহুদের যুদ্ধে দেখেন যে, তিনি আহত হয়ে মাটিতে পড়ে রয়েছেন এবং রক্ত ও মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছেন। তিনি উক্ত আনসারীকে বলেন, ‘রাসূল (সাঃ) যে শহীদ হয়েছেন তা কি আপনি জানেন? তিনি উত্তরে বলেন, যদি এই সংবাদ সত্যি হয় তাহলে তিনি তাঁর কাজ করে গেছেন। এখন আপনারা সবাই আপনাদের ধর্মের উপর নিজেদের জীবন কুরবান করুন’। আল্লাহর পথে যারা শহীদ হন তাদেরকে মৃত বলতে নিষেধ করেছেন আল্লাহতায়ালা। আল্লাহর পথে শহীদ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলেও তাদের আত্না জীবিত থাকে এবং আহার্য প্রাপ্ত হয়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, শহীদগণের আত্নাসমূহ সবুজ রংয়ের পাখির দেহের মধ্যে রয়েছে। তাদের জন্যে আরশে লটকান প্রদীপ সমূহ রয়েছে। সারা জান্নাতের মধ্যে তাঁরা যে কোন জায়গায় বিচরণ করেন এবং ঐ প্রদীপ সমূহে আরাম লাভ করে থাকে। তাদের রব তাদের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে বলেন, তোমরা কিছু চাও কি? তারা বলে, হে আল্লাহ– আমরা আর কি চাইবো? জান্নাতের সর্বত্র আমরা ইচ্ছামত চলে ফিরে বেড়াচ্ছি। এরপরে আমরা আর কি চাইতে পারি? আল্লাহতায়ালা তাদেরকে পুনরায় একই জিজ্ঞাসা করেন এবং তারা একই উত্তর দেন। তৃতীয়বার আল্লাহতায়ালা একই প্রশ্ন করেন। তারা যখন বুঝতে পারেন যে, আল্লাহতায়ালা একই প্রশ্ন করতেই থাকবেন। তাই তারা বলেন যে, হে আমাদের রব আমরা চাই যে, আমাদের আত্নাগুলো আমাদের দেহে ফিরিয়ে দিন, আমরা আবার দুনিয়ায় গিয়ে আপনার পথে যুদ্ধ করব এবং শহীদ হব। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেন যে, যারা মারা যায় এবং আল্লাহর নিকট উত্তম স্থান লাভ করে তারা কখনো দুনিয়ায় ফিরে আসা পছন্দ করে না। কিন্তু শহীদগণ এই আকাঙ্খা করে যে, তাদেরকে যেন পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং তারা আবার আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারে। কেননা তারা স্বচক্ষে শাহাদাতের মর্যাদা দেখেছে– (আহমদ–মুসলিম)। আল্লাহতায়ালা তাঁর পবিত্র কালামে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ মুমিনদের নিকট থেকে তাদের প্রাণ ও তাদের ধন সম্পদ সমূহকে এর বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন যে, তাদের জন্য জান্নাত রয়েছে। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, যাতে তারা (কখনো) হত্যা করে এবং (কখনো) নিহত হয় এবং এর কারণে (জান্নাত) প্রদানে সত্য অঙ্গিকার করা হয়েছে তাওরাতে, ইঞ্জিলে এবং কুরআনে। নিজের অঙ্গিকার পালনকারী আল্লাহতায়ালার চেয়ে অধিক আর কে আছে? অতএব তোমরা আনন্দ করতে থাকো তোমাদের এই ক্রয়–বিক্রয়ের উপর, যা তোমরা সম্পাদন করেছো। আর এটা হচ্ছে বিরাট সফলতা’–সূরা তাওবা– আয়াত–১১১। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা এই সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে তাঁর পথে ব্যয়কৃত জান ও মালের বিনিময় হিসেবে জান্নাত প্রদান করবেন। হযরত হাসান বাসরী (রহ.) এবং হযরত কাতাদাহ (রহ.) বলেন যে, আল্লাহতায়ালা যখন তাঁর বান্দাদের সাথে বেচা–কেনা করলেন, তখন তিনি তাদের খেদমতের বিনিময়ে বিরাট ও উচ্চমূল্য প্রদান করলেন। আল্লাহতায়ালা অন্য আয়াতে বলেন, তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, অতপর হয় হত্যা করে না হয় নিহত হয়। সর্বাবস্থায় তাদের জন্য জান্নাত অবধারিত রয়েছে। সহীহ মুসলিম ও সহীহ বুখারিতে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্য বের হয়, আর এই বের হওয়ার পেছনে একমাত্র উদ্দেশ্যে হচ্ছে তার প্রতি জেহাদ করা এবং তার রাসূল (সাঃ) দের সত্যতা প্রমাণ করা, এই অবস্থায় যদি তার মৃত্যু হয় তাহলে আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর যদি মারা না যান তাহলে আল্লাহ এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন যে, সে যেখান থেকে বের হয়েছে সেখানে তাকে তার লাভকৃত গানিমতের মাল সামান পৌঁছে দিবেন’। এভাবেই মুমিনগণ তাঁদের ত্যাগ ও কুরবানির কারণে আল্লাহর বিধান এই জমিনে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। আগামী কেয়ামত অবধি মুমিনদের এই আত্নত্যাগ জারি থাকবে ইনশাল্লাহ।
লেখক: সভাপতি, রাউজান ক্লাব; সহযোগী অধ্যাপক (ইএনটি), সংযুক্ত: জেনারেল হাসপাতাল, রাঙ্গামাটি












