অস্তিত্বের ব্যাকরণ: পরিচয় শুধু ‘নারী’ নয়, ‘মানুষ’

রিনিক মুন | শনিবার , ৪ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ

রাতের শেষ প্রহরে যখন শহরটা ঝিমিয়ে পড়ে, তখনো কোনো এক জানলার ওপাশে টিমটিম করে জ্বলা আলোয় যে ছায়াটি দেখা যায়, সেটি একজন নারীর। ক্লান্ত শরীরে পরের দিনের সংসারের ছক সাজানো কিংবা অসমাপ্ত কোনো কাজের পেছনে নিজের ঘুম বিসর্জন দেওয়াএই দৃশ্যটি আমাদের সমাজের কাছে অতি পরিচিত, অতি স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালে যে প্রশ্নটি যুগ যুগ ধরে চাপা পড়ে আছে, তা হলোআমরা নারীকে কি সত্যিই ‘মানুষ’ হিসেবে দেখতে শিখেছি? নাকি তাকে কেবল সম্পর্কের এক একটি নিপুণ ছাঁচে বন্দি করে রেখেছি? ভোরের আলো ফুটলে যখন সেই নারীটি ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে বাইরে পা রাখেন, তখন সমাজ তাকে দেখে হাজারো বিচারকের চোখে। তার হাঁটাচলা, তার গলার স্বর, এমনকি তার স্বপ্নগুলোকেও মাপা হয় পিতৃতান্ত্রিক এক দাঁড়িপাল্লায়। আমরা ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রগতির কথা বলি, আকাশছোঁয়া অট্টালিকা বানাই, কিন্তু একজন নারীকে তার রক্তমাংসের আবেগ, মেধা আর স্বতন্ত্র সত্তাসহ ‘মানুষ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আজও কুণ্ঠাবোধ করি। এটা আমাদের সভ্যতার এক গভীর ক্ষত।

শৈশব থেকেই একটি মেয়ের কানে মন্ত্রের মতো গেঁথে দেওয়া হয় যে, তার জীবনের সার্থকতা অন্যের সেবায়। তাকে শেখানো হয় সহনশীলতা মানেই হলো মুখ বুজে সহ্য করা। একটি ছেলে যখন পড়ে গিয়ে ব্যথা পায়, তাকে বলা হয় ‘পুরুষ কাঁদে না’; আর একটি মেয়ে যখন তার অধিকারের কথা বলে, তাকে বলা হয় ‘মেয়েদের এত জেদ করতে নেই’। এই বৈষম্যের বীজ বপন করা হয় খোদ অন্দরেই। ফলে বড় হওয়ার সাথে সাথে মেয়েটি নিজের অজান্তেই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, তার নিজস্ব কোনো ইচ্ছা বা অনিচ্ছা থাকাটা এক ধরনের অপরাধ। সে আয়নায় নিজেকে দেখে কেবল কারো মেয়ে, কারো বোন বা কারো স্ত্রী হিসেবে। অথচ তার ভেতরে যে একটি বিশাল আকাশ আছে, তার যে নিজস্ব একটি বৌদ্ধিক জগৎ আছে, সেটি আবিষ্কার করার ফুরসৎ সমাজ তাকে দেয় না। যখনই একজন নারী প্রথাগত গণ্ডি পেরিয়ে নিজের ডানা মেলতে চায়, তখনই চারপাশ থেকে ধেয়ে আসে অদৃশ্য সব শেকল। তাকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় তার সীমাবদ্ধতার কথা, তার কথিত ‘দুর্বলতা’র কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দুর্বলতা কি জন্মগত, নাকি এটি আমাদের সমাজের সযত্নে লালিত একটি নির্মাণ?

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে অনেক গালভরা কথা শুনি। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে, রাজনীতি থেকে মহাকাশ বিজ্ঞানসর্বত্রই তার পদচারণা। কিন্তু এই বাহ্যিক পরিবর্তনের আড়ালে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন কতটুকু হয়েছে? একজন সফল কর্মজীবী নারীকেও দিনশেষে সমাজের কাছে প্রমাণ করতে হয় যে সে একজন ‘আদর্শ গৃহিণী’। তার পেশাদারত্বের চেয়ে তার রান্নার হাত বা ঘর গোছানোর দক্ষতা দিয়ে তাকে বিচার করার প্রবণতা আজও তুঙ্গে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কি আসলেই তাকে মানসিক মুক্তি দিতে পেরেছে? উত্তরটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক। কারণ সমাজ এখনো মনে করে নারীর উপার্জন কেবল পরিবারের বাড়তি সচ্ছলতা, কিন্তু তার মেধা বা শ্রমের মর্যাদা পুরুষের সমান নয়। এই যে দ্বিমুখী আচরণ, এটিই প্রমাণ করে আমরা তাকে আজও পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গ্রহণ করতে পারিনি। আমরা তাকে হয় দেবী বানিয়ে মন্দিরে বসাতে চাই, নয়তো পণ্য বানিয়ে বিজ্ঞাপনী পাতায় সাজাতে চাই; কিন্তু রক্তমাংসের সাধারণ মানুষ হিসেবে তার দোষত্রুটি, তার ক্লান্তি আর তার স্বপ্নকে মেনে নিতে আমাদের বড্ড অনীহা।

নারীর প্রতি সহিংসতা যখন চরমে পৌঁছায়, তখন বিচার চাইতে গিয়েও আমরা তার পোশাক বা চরিত্রের ব্যবচ্ছেদ করি। এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক যে, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও আমাদের বলতে হয় ‘পোশাক নয়, মানসিকতা বদলান’। একজন অপরাধী যখন একজন নারীকে আক্রমণ করে, তখন তার অবচেতন মনে এই ধারণাটিই কাজ করে যে, এই সত্তাটি তার চেয়ে নিচু বা অধিকারহীন। এই আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় ধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতন আর সামাজিক হেনস্থা। রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে একজন নারীকে যে তীক্ষ্ণ ও লোলুপ দৃষ্টির মোকাবিলা করতে হয়, তা তার মানবিক মর্যাদাকে প্রতি মুহূর্তে চূর্ণ করে দেয়। কেন একটি মেয়েকে সবসময় ভয়ের চাদর গায়ে জড়িয়ে পথ চলতে হবে? কেন তাকে তার নিরাপত্তার জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে? রাষ্ট্র এবং সমাজ যদি একজন নাগরিক হিসেবে তাকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে আমাদের সমস্ত প্রগতিই অর্থহীন। নারীর শরীরকে যখন তার আত্মার চেয়ে বড় করে দেখা হয়, তখনই মানবিকতার পরাজয় ঘটে।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আমরা যখন নারীকে ‘মা’ বা ‘বোন’ হিসেবে মহিমান্বিত করি, তখন আদতে তাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে দেই। ‘মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত’এই মহান বাণীর আড়ালে আমরা একজন মায়ের ব্যক্তিগত ইচ্ছা, তার একাকীত্ব আর তার ছোট ছোট শখগুলোকে অবলীলায় ভুলে যাই। তিনি মা বলেই তাকে সবার শেষে খেতে হবে, তিনি মা বলেই তাকে অসুস্থ শরীর নিয়ে উনুন সামলাতে হবেএই যে ত্যাগের মহিমা আমরা তার ওপর চাপিয়ে দেই, সেটি আসলে তাকে ‘মানুষ’ থেকে বিচ্যুত করার একটি কৌশল মাত্র। ত্যাগের এই প্রতিমূর্তি বানাতে গিয়ে আমরা তার ভেতরের রক্তমাংসের মানুষটিকে মেরে ফেলি। অথচ মা হওয়ার আগে বা স্ত্রী হওয়ার আগে তিনি যে একজন স্বাধীন মানুষ, যার ভালোলাগামন্দলাগা আর নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক মতাদর্শ থাকতে পারে, তা আমরা বেমালুম চেপে যাই। নারীর এই নীরব আত্মত্যাগ আমাদের সমাজের ভিত্তি হতে পারে না, কারণ যে ভিত্তি বলপ্রয়োগ বা মানসিক চাপের ওপর দাঁড়িয়ে, তা আদতে এক ধরনের শোষণ।

​​নারীর লড়াই কেবল একার নয়, এটি পুরো সমাজের লড়াই। কারণ একটি সমাজের অর্ধেক অংশকে পিছিয়ে রেখে বা অবদমিত করে রেখে সেই সমাজ কখনো প্রকৃত উন্নত হতে পারে না। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার যাঁতাকল থেকে পুরুষদেরও বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। কারণ এই ব্যবস্থায় পুরুষরাও এক ধরণের কৃত্রিম কাঠামোর মধ্যে বন্দি হয়ে থাকে। সমতা মানে এই নয় যে নারী আর পুরুষ হুবহু এক হয়ে যাবে, বরং সমতা মানে হলো সুযোগের সমতা, মর্যাদার সমতা এবং সম্মানের সমতা। একে অপরের পরিপূরক হয়ে নয়, বরং একে অপরের সহযাত্রী হয়ে পথ চলাই হোক আগামীর লক্ষ্য। যেদিন একজন নারী তার পরিচয় দিতে গিয়ে কোনো পুরুষের নাম বা সম্পর্কের আশ্রয় ছাড়াই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবেন, যেদিন তার যোগ্যতাই হবে তার একমাত্র পরিচয়, সেদিনই আমাদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে।

আসলে নারীকে মানুষ হিসেবে ভাবার জন্য কোনো অলৌকিক শক্তির প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু একটু সংবেদনশীলতা আর স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির। আমরা তাকে দেবী বা পণ্য হিসেবে না দেখে, তাকে একজন সহমর্মী, বুদ্ধিদীপ্ত এবং স্বাধীন সত্তা হিসেবে বরণ করে নেওয়ার হিম্মত রাখি কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তার হাসির মধ্যে যে আনন্দ, তার কান্নার মধ্যে যে বেদনা এবং তার ঘামের মধ্যে যে শ্রমসেটিকে নিঃশর্ত সম্মান জানাতে শেখাই হলো সভ্যতার প্রথম পাঠ। শিকল ভাঙার গান তো অনেক হলো, এবার সময় এসেছে সেই গানকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার। আসুন, এমন এক পৃথিবী গড়ে তুলি যেখানে জন্মের পর একটি শিশু ‘মেয়ে’ বা ‘ছেলে’ হিসেবে নয়, বরং একজন ‘মানুষ’ হিসেবে পরিচিত হবে। যেখানে সমাজ তাকে জিজ্ঞেস করবে না তার সীমানা কতটুকু, বরং তাকে আকাশ ছোঁয়ার অসীম সাহস জোগাবে। সেই সুন্দরের প্রত্যাশায় আমাদের এই কলম লড়াই জারি থাকুক, যতক্ষণ না প্রতিটি ঘরে এবং প্রতিটি হৃদয়ে নারীর মানবিক সত্তাটি সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কবি, শিক্ষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআমার অনুভবে কবিতা
পরবর্তী নিবন্ধফুটপাত কার : পথচারীর অধিকার ও ভ্রাম্যমাণ বাজার নিয়ে কিছু কথা