তিন বছর পরও প্রত্যাশিত যানবাহন না পাওয়ায় আর্থিক চাপ

কর্ণফুলী টানেল নিয়ে আইএমইডির প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন । ব্যবহার বাড়াতে প্রয়োজন সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা, শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন

হাসান আকবর | শনিবার , ৪ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৪৮ পূর্বাহ্ণ

টানেল ব্যবহারকারী যানবাহনের সংখ্যা প্রাকসমীক্ষার ধারেকাছে না যাওয়ায় কর্ণফুলী টানেল পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণে কোটি কোটি টাকা গচ্ছা দিতে হচ্ছে। নগরীর পতেঙ্গার সঙ্গে আনোয়ারাকে যুক্ত করে প্রায় ৩ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেল দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, শিল্পায়ন ও বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হলেও কার্যত কোনো কিছু হয়নি। উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পরও প্রত্যাশিত যানবাহন না পাওয়ায় প্রকল্পটি এখন বড় ধরনের আর্থিক চাপে রয়েছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, শুধু টোল বাড়িয়ে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়; বরং টানেলের ব্যবহার বাড়াতে প্রয়োজন সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন।

গত সোমবার প্রকাশিত আইএমইডির প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৮ হাজার ৩৫০টি যানবাহন টানেল ব্যবহার করার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে মাত্র চার হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার যানবাহন চলাচল করছে। অর্থাৎ পূর্বাভাসের মাত্র ১৪ শতাংশ যানবাহন টানেল ব্যবহার করছে এবং প্রায় ৮৬ শতাংশের ঘাটতি রয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতির কারণে প্রতিদিন টানেল কর্তৃপক্ষকে প্রায় ১০ লাখ টাকার রাজস্ব ঘাটতি বহন করতে হচ্ছে। বর্তমানে দৈনিক টোল আদায় হচ্ছে প্রায় ১২ লাখ টাকা। অথচ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় ২২ লাখ টাকা। ফলে বছরে প্রায় ৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টোল বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানোর ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। ‘প্রাইস ইলাস্টিসিটি অব ডিমান্ড’ বা মূল্যভিত্তিক চাহিদা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, টোল ১০০ টাকা থেকে ২০০ টাকা করা হলে স্থিতিস্থাপকতার মান দাঁড়ায় মাইনাস ২ দশমিক ৮২ এবং ১৫০ টাকা করা হলেও তা হয় ৪ দশমিক ৮৩। আন্তর্জাতিকভাবে ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে এই মান সাধারণত মাইনাস ০ দশমিক ৩ থেকে মাইনাস ০ দশমিক ৬ এবং ট্রাকের ক্ষেত্রে মাইনাস ০ দশমিক ১ থেকে মাইনাস ০ দশমিক ৪এর মধ্যে থাকে। অর্থাৎ কর্ণফুলী টানেলকে লাভজনক করতে যে মাত্রার চাহিদা প্রয়োজন, তা বাস্তবতার তুলনায় প্রায় ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি, যা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।

আইএমইডি বলছে, বর্তমানে টানেলের চাহিদা অত্যন্ত অস্থিতিস্থাপক। বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রাকগুলো বিকল্প সড়ক ব্যবহার করায় টানেলের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়নি। ফলে শুধু টোল সমন্বয়ের মাধ্যমে রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।

আর্থিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রকল্পটির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। দ্বিতীয় সংশোধনীতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায়, যা মূল ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ২৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি। প্রকল্পে চীন সরকারের ঋণ রয়েছে ৬ হাজার ৭৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৪ হাজার ৬১২ কোটি ১২ লাখ টাকা।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দৈনিক ১৭ হাজার ৩৭৫টি যানবাহনের ভিত্তিতে টোল আয়কে আর্থিকভাবে লাভজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্যের অনেক নিচে অবস্থান করায় প্রকল্পের বার্ষিক নেট নগদ প্রবাহ এখনো ঋণাত্মক রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে বিনিয়োগের অর্থ পুনরুদ্ধার সম্ভব হচ্ছে না।

তবে আইএমইডি মনে করছে, মাত্র তিন বছরের কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে এত বড় অবকাঠামো প্রকল্পের চূড়ান্ত আর্থিক মূল্যায়ন করা যথাযথ নয়। সাধারণত এ ধরনের প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়নে ২০ থেকে ৩০ বছরের সময়কাল বিবেচনা করা হয়। ভবিষ্যতে যানবাহন চলাচল, শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়লে ২০৪৩ অথবা ২০৫৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক অভ্যন্তরীণ রিটার্ন হার (ইআইআরআর) ইতিবাচক অবস্থায় যেতে পারে।

বর্তমানে টানেলের টোল আয় পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৫৪ থেকে ৫৫ শতাংশ মেটাতে পারছে। উচ্চ বিদ্যুৎ ব্যয়, ইলেকট্রোমেকানিক্যাল যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, ঋণের সুদ পরিশোধ এবং পরিপূরক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পটি লোকসানি অবস্থায় রয়েছে। ফলে কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় সরকারকে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন চার হাজারের বেশি যানবাহন টানেল ব্যবহার করে গড়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় সাশ্রয় করছে। এই সময় সাশ্রয়ের আর্থিক মূল্য প্রতিদিন প্রায় ১৮২৫ লাখ টাকা। পাশাপাশি আনোয়ারা অঞ্চলে নগরায়ন ত্বরান্বিত হয়েছে এবং পতেঙ্গা ও পারকি সৈকতে পর্যটক বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইএমইডি কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আনোয়ারা প্রান্তে বন্দরভিত্তিক শিল্পায়ন দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, কর্ণফুলী ড্রাইডক, চায়না ইপিজেড ও কোরিয়ান ইপিজেডের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, চট্টগ্রাম বন্দরের আনোয়ারা অংশে পণ্য খালাস কার্যক্রম বাড়ানো এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে কার্যকর সড়ক সংযোগ নিশ্চিত করা।

এছাড়া ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ বা ‘এক শহর দুই নগর’ ধারণার পূর্ণ বাস্তবায়ন, টানেলের দুই প্রান্তে লজিস্টিক ও বাণিজ্যিক হাব গড়ে তোলা, চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়কের সংযোগ উন্নয়ন, ফিডার রোড সম্প্রসারণ, পণ্যবাহী ট্রাককে টানেলমুখী করার কৌশল গ্রহণ, ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) চালু এবং সার্ভিস এরিয়া বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর কর্ণফুলী টানেল উদ্বোধন করা হয়। চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিত এই টানেলকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নদীর তলদেশের সড়ক টানেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি চট্টগ্রাম বন্দর, আনোয়ারা, কর্ণফুলী এবং কক্সবাজারমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুন মাত্রা দেবে বলে ওই সময় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল।

আইএমইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রত্যাশিত ট্রাফিক না থাকায় প্রকল্পটি আর্থিক চাপে থাকলেও এটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। সঠিক নীতিনির্ধারণ, শিল্পায়নের সম্প্রসারণ, সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে কর্ণফুলী টানেল ভবিষ্যতে শুধু নিজের আর্থিক সক্ষমতাই অর্জন করবে না, বরং চট্টগ্রাম ও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তবে এজন্য সমন্বিত এবং কার্যকর উদ্যোগ এখনিই নিতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচমেক হাসপাতালে ৫০ বেডের নতুন ডেঙ্গু ব্লক প্রস্তুত
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬