চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। এ অঞ্চলের অধিবাসীদের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁদের ভাষা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা দেশে প্রচলিত অন্য সব আঞ্চলিক ভাষা থেকে আলাদা। অধিকাংশ মানুষের মন্তব্য এমন যে, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা বুঝে ওঠা অত্যন্ত কঠিন, এবং তা বলতে অভ্যস্ত হওয়া আরো বেশি কঠিন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় এমন কিছু শব্দ আছে, যা একান্তই তার নিজস্ব। ভাষা গবেষক ড. মুহম্মদ এনামুল হক বেশ কিছু শব্দের উদাহরণও দিয়েছেন। তবে এই ভাষার গান শুধু চট্টগ্রামের মানুষের জন্য নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে অনেক প্রিয়। তাঁরা এই গান শোনেন এবং উপভোগ করেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের চর্চার শুরু বহু আগে থেকে। অবিরাম চর্চা ও প্রচার–প্রসারের কারণে এই আঞ্চলিক গান এখন চট্টগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, দেশের গণ্ডিও ছাড়িয়েছে। হয়েছে প্রশংসিত। বলা যায়, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান আমাদের সংস্কৃতিকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে। তাই এসব গান সংরক্ষণ, চর্চা ও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ অনুভব করেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ইতিহাস সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে এ অঞ্চলের বিনোদনের অত্যন্ত জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল এই গান। গ্রামের যে কোন অনুষ্ঠানে গ্রামোফোন ভাড়া করে আনা হতো এবং তাতে বিরতিহীনভাবে রেকর্ডের গান বাজতো। রেকর্ডগুলো হতো নানা রকম গানের। তারমধ্যে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের কিছু রেকর্ড বাজানো হতো। এই গানগুলো আঞ্চলিক ভাষার গান হলেও এর অর্থ ও ভাব অনেক গভীর এবং মার্জিত রুচির ছিলো। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার গানে যুক্ত হয় চটুল ও হালকা মেজাজ। অত্যন্ত চটুল এবং হালকা মেজাজের গান গেয়ে অনেকে খ্যাতি অর্জন করেন। এই গান গেয়ে কিংবদন্তি হয়ে গেলেন শেফালী ঘোষ এবং শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব। তাঁদেরকে বলা হয় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী।
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর কবিগান, আঞ্চলিক ও মাইজভাণ্ডারী গানের উদগাতা হলেন রমেশ শীল। তিনি উভয় বাংলার শ্রেষ্ঠ কবিয়াল। কবিগানের জলসায় মাঝে মাঝে আঞ্চলিক ভাষায় নিজের বাঁধা কোনো গান হঠাৎ গেয়ে উঠতেন রমেশ শীল। তাঁর গানে উজ্জীবিত হতেন শ্রোতারা। তিনি চমকে দিতেন শ্রোতাদের। তাঁর অনেক জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে :
১. আঁধার ঘরত রাত কাডাইয়ুম, কারে লই, বন্ধু গেলে গই। ২. ‘নাতিন বরই খা বরই খা হাতে লইয়া নুন/ ঠেইল ভাঙিয়া পইজ্জে নাতিন বরই গাছরত্তুন।’
রমেশ শীলের আগে আঞ্চলিক গানকে সমৃদ্ধ করেছেন আস্কর আলী পণ্ডিত ও খাইরুজ্জামা পণ্ডিত প্রমুখ। তাঁদের অবদান অসামান্য। আস্কর আলী পণ্ডিত একজন লোককবি, প্রাচীন পুঁথি রচয়িতা, গীতিকার এবং লোকশিল্পী। তাঁর অনেক গান মানুষের মুখে মুখে। তার মধ্যে রয়েছে : ১. ডালেতে লরি চরি বইও/ চাতকি ময়নারে/ গাইলে বৈরাগীর গীত গাইও। ২. কী জ্বালা দিয়ে গেলা মোরে,/ নয়নের কাজল পরানের বন্ধুরে, না দেখিলে পরান পুড়ে।
বিগত শতকের তিরিশের দশকে শিল্পী মোহাম্মদ নাসির কলকতার এইচএমভির মতো প্রতিষ্ঠান থেকে রেকর্ড করার সুযোগ পান। তিনিও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে সমৃদ্ধ করেছেন, নিয়ে গেছেন অনেকদূর। তাঁর জনপ্রিয় কয়েকটি গান : ১. ‘চাঁদমুখে মধুর হাসি/দেবাইল্যা বানাইল রে মোরে সাম্পানর মাঝি..। ২. ‘রসিক ভান্ডারী তোরে চিনব কেমনে’।
এরপর আমরা পাই অচিন্ত্যকুমার চক্রবর্তীর মতো শিল্পীকে। তিনি লিখলেন অমর গান : ‘সূর্য উডের লে ভাই লাল মারি / রইস্যা বন্ধু ছাড়ি গেলগই / বুগত ছেল মারি।’ তাঁর পাশাপশি মোহন লাল দাশের অবদানকে আমরা ভুলতে পারি না। কথা ও সুরে অনন্য গান ‘ওরে সাম্পানওয়ালা তুই আমারে করলি দিওয়ানা’ চট্টগ্রামের সেরা লোকগান হিসেবে বিবেচিত ও জনপ্রিয়। গবেষকদের মতে, আঞ্চলিক গানের সোনালি সময় হলো গত শতকের ষাট থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত। এ সময়ে বিষয়–বৈচিত্র্যে, সুর–সুষমায় এ গান ব্যাপকভাবে আলোড়িত হয়েছে। এই চার দশকে অসংখ্য কালজয়ী গানের সৃষ্টি হয়েছে, বেশ কয়েকজন কিংবদন্তিতুল্য গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীর দেখা পেয়েছে চট্টগ্রাম।
মোহনলাল দাশ, মলয় ঘোষ দস্তিদার, এম এন আখতার, আবদুল গফুর হালী, সৈয়দ মহিউদ্দিন শেফালী ঘোষ, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, সাবিনা ইয়াসমিন, ইয়াকুব আলী সরকার, রশিদ কাওয়াল, লক্ষ্মীপদ আচার্য, আহমেদ কবির আজাদ, সঞ্জিত আচার্য, কল্যাণী ঘোষ, কান্তা নন্দী, উমা খান, মানস পাল চৌধুরী, ইকবাল হায়দার প্রমুখ শিল্পী লোকগানে ও আঞ্চলিক গানে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছেন।
মলয় ঘোষ দস্তিদার ছিলেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের পথিকৃৎ শিল্পী, চারণ কবি ও রাজনীতিবিদ। মাস্টার দা সূর্য সেনের শিষ্য। ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী গায়ক অগ্নি যুগে অগ্নি রোষে পড়ে গানের জন্য ১৯৫২ সালে তিনি কারাবরণ করেন। তাঁর উল্লেখ্যযোগ্য গানের মধ্যে আছে : ১. চোড চোড ঢেউ তুলি / লুসাই পাহাড়–উত্তুন লামিয়ারে যারগৈ কর্ণফুলী’। ২. চাটগাঁইয়া নওজোয়ান আঁরা চাটগাঁইয়া নওজোয়ান, দইজ্জার কুলত বসত গরি / আঁরা ঠেকাই ঝড় তুয়ান। ৩. বাহার মারি সাম্পান যার। ছোড ছোড ডেউ তুলি গানটি তিনি ১৯৪১ সালে রচনা করেন।
লেখা ও সুর করার পাশাপাশি এম এন আখতার নিজেও গাইতেন। তিনি ১৯৬২ সালে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রের উদ্বোধনী আধুনিক গানের প্রথম শিল্পী। তার অনেক গান চলচ্চিত্রেও নেওয়া হয়েছে। ৩৫ বছর আগে গ্রামোফোন রেকর্ডে শিল্পী এম এন আখতার ও সাবিনা ইয়াসমিন গেয়েছিলেন ‘কইলজার ভিতর গাঁথি রাইখ্যম তোয়ারে’ গানটি। পরে এই গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এছাড়াও রয়েছে : ১. যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম, ২. ও পরানর তালত ভাই চিডি দিলাম, ৩. বাচুরে – জী জী জী ইত্যাদি। তিনি প্রায় পাঁচ হাজারেরও অধিক গান লিখেছেন। তার লেখা গানের মধ্য থেকে কয়েক হাজার গান নিয়ে ‘এম এন আখতারের গান’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
আবদুল গফুর হালী অত্যন্ত জনপ্রিয় গীতিকার, সুরকার ও লোকশিল্পী। তিনি চট্টগ্রামের ভাষায় মাইজভাণ্ডারী, মুর্শিদি, মারফতি প্রভৃতি ধারায় প্রায় দুই হাজারের অধিক গান রচনা করেছেন। নিজের রচিত অধিকাংশ গানে সুরারোপ করেন নিজেই। তাঁর জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে : ১. দুই কূলের সোলতান ভান্ডারী দুই কূলের সোলতান, ২. দেখে যারে মাইজভাণ্ডারে দেখে যারে, ৩. সোনাবন্ধু তুই আমারে করলি রে দিওয়ানা, ৪. বন্ধু আঁর দুয়ারদি যঅ/ আঁর লয় কথা কা ন হঅ, ৫. অই লাল কোর্তা অলা / অই পাঞ্জাবিওয়ালা/ মনে বড় জ্বালা রে পাঞ্জাবিওয়ালা, ৬. ন মাতাই ন বোলাই গেলিরে বন্ধুয়া, ৭. তুঁই যাইবা সোনাদিয়া বন্ধু, মাছ মারিবার লাই, ৮. অ শ্যাম রেঙ্গুম ন যাইও, ৯. ঢোল বাজের আর মাইক বাজের, ১০. বানুরে অ বানু আঁই যাইয়্যুম গই চাটগাঁ শঅরত তোঁয়ার লাই আইন্নুম কি?
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের কিংবদন্তি জুটি শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব। এই শ্যাম–শেফালীই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে নিয়ে গেছেন জাতীয় পর্যায়ে, বিশ্ব দরবারে। তাঁদের গাওয়া প্রচুর গান। যেমন : ১. ন’জাইয়ুম, যাইতাম’ন লাল মিয়ার বাড়ি; ২. যদি সোন্দর একখান মুখ পাইতাম। এ ছাড়া এই জুটির জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে : ‘বন্ধু আঁর দুয়ারদি যঅ’, ‘তুঁই যাইবা সোনাদিয়া বন্ধু’, ‘বানুরে…’, ‘আঁরে হত ভারাইবা’, ‘নঅ যাইও নঅ যাইও’, ‘রেঙ্গুইন্যা সুন্দরী’, ‘বাইক্যা টিয়া দে’। এই জুটির অবিস্মরণীয় অসংখ্য গান মানুষের মুখে মুখে ফিরে।
আরো কিছু জনপ্রিয় গানের উল্লেখ না করলেই নয়। যেমন : ১. বাঁশখালী মইশখালী … তোরা কন্ কন্ যাবি আঁর সাম্পানে– কথা, সুর ও শিল্পী : সনজিত আচার্য। ২. অ জেডা ফইরার বাপ– সৈয়দ মহিউদ্দিন। ৩. হেডমাস্টরে তোঁয়ারে তোয়ার– সিরাজুল ইসলাম আজাদ। ৪. ‘মধু হই হই বিষ হাবাইলা’ – আবদুর রশিদ মাস্টার। ৫. ‘পালে কী রং লাগাইলরে মাঝি’ (কথা ও সুর–কবিয়াল ইয়াকুব আলী)। সম্প্রতিক সময়ে বুলবুল আক্তারের একটি গান বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে যা উল্লেখ না করলেই নয় ‘ও হালাচান গলার মালা/পেট ফুরেদ্দে তোঁয়ার লাঁই।’
অতি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে শিল্পী মানস পাল চৌধুরীর লেখা ২৪৬টি গানের সংকলন হলো ‘গানে মিলে প্রাণ’। ৫টি অধ্যায়ে বিভক্ত এই গানগুলোর মধ্যে রয়েছে– ৫টি দেশের গান, ৪৭টি পল্লিগীতি, ৪৩টি লোকসংগীত, ৪০টি বাউল গান, ১৫টি জীবনমুখী গান এবং ৮৮টি আঞ্চলিক গান। বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন প্রয়াত ভাষাবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. মাহবুবুল হক। ফ্ল্যাপের মূল লেখাটি লিখেছেন প্রখ্যাত বাউল সংগীতশিল্পী কিরণ চন্দ্র রায়। অন্য ফ্ল্যাপে শুভেচ্ছা কথনে আছেন অশোক ধর। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী দীপক দত্ত। প্রকাশ করেছে দি অ্যাড কমিউনিকেশন। মূল্য রাখা হয়েছে ৩৫০টাকা। গানগুলোর মধ্যে আনন্দের বিষয় আছে, চিন্তার গভীরতার বিষয় আছে। জীবন, পেশা, প্রকৃতি ও পারিবারিক জীবনের সঙ্গে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের সম্পর্ক পাকাপোক্ত। গানের ভাব–ভাষা, আবেদন সুর এবং জীবনের নান্দনিকতায় এ অঞ্চলের গান স্বমহিমায় অদ্বিতীয়।
মানস পাল চৌধুরী একজন নিবিষ্ট বাউল শিল্পী। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পী। ষাট দশক থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে তিনি এ অঙ্গনে কাজ করে আসছেন সনিষ্ঠ আন্তরিকতায় ও দোর্দণ্ডপ্রতাপে। চট্টগ্রাম শহরে এমন সংগঠন খুঁজে পাওয়া কষ্ট হবে, যেখানে তিনি গান পরিবেশন করেননি। তাঁর গান নিয়ে একটা অনুষ্ঠান ও তাঁর বইয়ের প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন চলছে। আগামী ৩ জুলাই ২০২৬ শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন দৈনিক আজাদী সম্পাদক একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব এম এ মালেক। লোকগান ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত গান, যেগুলোর উল্লেখ করেছি ইতোপূর্বে, সেগুলোর মতো মানস পালের গানও যে এত সুন্দর, এত মধুর এবং এত উপভোগ্য হতে পারে তা শুনবো এ অনুষ্ঠানে। আমরা সেই অনুষ্ঠানে শিল্পী মানস পাল চৌধুরীকে পাবো নতুন করে। তথ্যসূত্র : ১. চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান– কল্যাণী ঘোষ সম্পাদিত –বাংলা একাডেমি, ২. চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান –নাসির উদ্দিন হায়দার ৩. উইকিপিডিয়া
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী; ফেলো,
বাংলা একাডেমি।












