রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিপক্বতা আনতে হবে

অধ্যাপক (ডা.) মোহাম্মদ রেজাউল করিম | সোমবার , ২৯ জুন, ২০২৬ at ৫:২১ পূর্বাহ্ণ

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। জনগণের রায় অনুযায়ী এক সরকার যায়, আরেক সরকার আসে। কিন্তু একটি পরিণত রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তনের অর্থ কখনোই রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, নীতি, প্রতিষ্ঠান কিংবা যোগ্য ব্যক্তিদের অস্বীকার করা নয়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে সরকার পরিবর্তন অনেক সময় এমন এক মানসিকতার জন্ম দেয়, যেখানে মনে করা হয় পূর্ববর্তী সরকারের আমলে যা কিছু হয়েছে, যা কিছু অর্জিত হয়েছে, সবই বাতিলযোগ্য। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, নীতি, এমনকি জ্ঞান ও মেধাও যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। এটি শুধু রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এক গভীর মানসিক দারিদ্র্যের প্রতিফলন।

একটি উন্নত রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা (Institutional Continuity)। সরকার পরিবর্তিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশাসনিক কাঠামো এবং মেধাবী ব্যক্তিদের মূল্যায়ন অব্যাহত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, United Kingdom, Japan  কিংবা Germanyএ এক সরকার অন্য সরকারের গৃহীত ভালো উদ্যোগকে শুধু রাজনৈতিক কারণে বাতিল করে না। কারণ তারা জানে, রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়; এটি একটি চলমান ঐতিহাসিক সত্তা।

কিন্তু আমাদের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনে বদলির ঝড় ওঠে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব পাল্টে যায়, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া অনেক যোগ্য ব্যক্তি সন্দেহের চোখে দেখা হয়, চলমান প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করা হয়, কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও থমকে যায়। যেন রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘তোমার সময়ের সব খারাপ, আমার সময়ের সব ভালো।’

এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে মেধা ও জ্ঞানকে। একজন দক্ষ শিক্ষক, গবেষক, প্রশাসক, চিকিৎসক বা বিজ্ঞানী তার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সেবা দেন। তার মূল্যায়নের মাপকাঠি হওয়া উচিত তার কর্ম, সততা ও যোগ্যতা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক পরিচয়ই প্রধান হয়ে ওঠে, তখন প্রকৃত মেধাবীরা অবমূল্যায়নের শিকার হন। তাদের পরিবর্তে অনেক সময় দলীয় আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ফলে রাষ্ট্র হারায় তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ যোগ্য মানুষ।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতি তার জ্ঞানীদের অবমূল্যায়ন করে, সে জাতি কখনো দীর্ঘমেয়াদে অগ্রসর হতে পারে না। প্রাচীন Islamic Golden Age, ইউরোপের Renaissance কিংবা আধুনিক পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থানের পেছনে ছিল মেধার যথাযথ মূল্যায়ন এবং জ্ঞানীদের প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান।

আমাদের দেশে অনেক সময় দেখা যায়, একজন কৃতী ব্যক্তি কোনো সরকারের আমলে সম্মানিত হলে পরবর্তী সময়ে তাকে অবজ্ঞা করা হয়, শুধু এই কারণে যে তিনি ‘ওই সময়ের মানুষ’। অথচ জ্ঞান, গবেষণা, সাহিত্য কিংবা বিজ্ঞানের কোনো দলীয় পরিচয় নেই। একজন কবির কবিতা, একজন বিজ্ঞানীর আবিষ্কার বা একজন শিক্ষাবিদের গবেষণা কোনো রাজনৈতিক সরকারের সম্পত্তি হতে পারে না।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, দুর্বল রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতিভ্রংশ (Institutional Amnesia)। অর্থাৎ প্রতিটি নতুন ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী মনে করে ইতিহাস তাদের দিয়েই শুরু হয়েছে। ফলে পূর্বসূরিদের ভালো কাজগুলো সংরক্ষণের পরিবর্তে ধ্বংসের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এতে করে রাষ্ট্রের ধারাবাহিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং জাতীয় সম্পদের অপচয় ঘটে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি ভয়াবহ প্রবণতা ব্যক্তিপূজা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি বা দলের প্রভাবে পরিচালিত হয়, তখন ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর চরিত্রও বদলে যায়। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের শক্তি নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও স্থায়িত্বের ওপর, কোনো ব্যক্তির ওপর নয়।

এই সংস্কৃতির আরেকটি ক্ষতিকর দিক হলো তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভুল বার্তা পৌঁছানো। তারা দেখতে পায়, কঠোর পরিশ্রম, মেধা ও সততার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য অনেক সময় বেশি কার্যকর। এতে করে মেধাবীরা হতাশ হয়, সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং অনেক যোগ্য মানুষ দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান। এই ব্রেইন ড্রেইন বা মেধাপাচার একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। প্রশ্ন হলো, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী?

প্রথমত, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিপক্বতা আনতে হবে। বিরোধী পক্ষের ভালো কাজকে স্বীকার করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। তৃতীয়ত, যোগ্যতা ও মেধাকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতিগুলোকে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো পরিবর্তিত না হয়। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বুঝতে হবে সরকার ও রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। সরকার সাময়িক; রাষ্ট্র স্থায়ী। সরকার আসে ও যায়, কিন্তু জাতির জ্ঞান, মেধা, প্রতিষ্ঠান এবং অর্জনগুলো পুরো জাতির সম্পদ।

যে সমাজে সরকার পরিবর্তনের অর্থ হয়ে দাঁড়ায় সবকিছু পরিবর্তন, সেখানে উন্নয়ন টেকসই হয় না, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় না এবং মেধার বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়। আর যে সমাজে কৃতী ও জ্ঞানীর পরিচয় রাজনৈতিক রঙে নির্ধারিত হয়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজেকেই দরিদ্র করে তোলে। অতএব, আমাদের জাতীয় চেতনায় একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের শিখতে হবে, ব্যক্তি নয় প্রতিষ্ঠান বড়; দল নয় রাষ্ট্র বড়; ক্ষমতা নয় যোগ্যতা বড়। যেদিন আমরা এই সত্য উপলব্ধি করতে পারব, সেদিন সরকার পরিবর্তন আর জাতীয় অস্থিরতার কারণ হবে না; বরং গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ও সুন্দর ধারাবাহিকতার অংশ হয়ে উঠবে। তখনই আমরা বলতে পারব, আমরা কেবল সরকার পরিবর্তন করছি, রাষ্ট্রকে নয়।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআসকার দিঘিসহ নগরীর হারিয়ে যেতে বসা পুকুর ও দিঘিগুলো উদ্ধার করা জরুরি
পরবর্তী নিবন্ধবর্ষার আবহে এলো কোক স্টুডিও বাংলার নতুন গান ‘মেঘ’