‘জীবন নাটকের মতো, কিন্তু নাটক জীবন নয়’ বলে প্রচলিত প্রবাদ আমরা আওড়ালেও জীবন আসলে একটি চলমান নাটকই। নাটক যাপিত জীবনের হাসিকান্না, সুখদুঃখ, আনন্দবেদনা, মিলনবিরহের জটিল সমীকরণকে একটি কাঠামোয় চরম নাটকীয় দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে উত্তেজনার শিখর থেকে ধীরে ধীরে গ্রন্থি উন্মোচন করে বলে এটি একটি জটিল সমবায়ী শিল্প।
১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে রুশ নাট্যবোদ্ধা হিরাসিম লেবেদেভ বিদেশী নাটকের অনুবাদে বাংলা নাটক মঞ্চায়নের পর থেকে অসংখ্য নাটক রচিত হলেও শিল্পসফল বাংলা নাটকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় রস বিচারে নাটকের শ্রেণিবিভাজন হয়েছে, আধুনিক নাট্যকাররা নাটক নির্মাণ ও পরিবেশনা নিয়ে নানা নিরীক্ষা চালিয়েছে, উপস্থাপন পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য এসেছে, গতানুগতিক বৃত্তাবদ্ধ অভিনয়ে এসেছে দারুণ স্বকীয়তা, দর্শকদের রুচিও আমুল পাল্টেছে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে নাটকের ভাব, ভাষা, আঙ্গিক ও বিষয়গত বৈপ্লবিক পরিবর্তনে রয়েছে তরুণ নাট্যকারদের অশেষ অবদান।
চট্টগ্রামের নাট্যজগতে সৃজনশীল নাট্যকারদের মধ্যে স্বপন কুমার বড়ুয়া স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল একজন মৌলিক নাট্যকার। শৈশব থেকেই নাট্যজগতের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা তাঁকে নাটক লেখায় উদ্বুদ্ধ করে। তিনি যাপিত জীবনের ঘাতপ্রতিঘাত, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, দ্বন্দ্বসংঘাত, মনোজাগতিক মিথষ্ক্রিয়া, সংবেদী সংলাপ আর কুশলী উপস্থাপনে পারঙ্গম একজন নাট্যকার। তাঁর মঞ্চায়িত নাটক ইতোমধ্যেই দর্শকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সমপ্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ছয়টি নাটকের সংকলন ‘নাট্যষষ্ঠী’। বিভিন্ন সময়ে লিখিত ও মঞ্চায়িত নাটকগুলো গ্রন্থিভূত করে তিনি নাট্যপ্রেমীদের নাট্যক্ষুধা নিবারণ করেছেন। গ্রন্থভুক্ত নাটকগুলো হলো ‘একতারা আবার বাজবে’, ‘ইচ্ছের পৃথিবী যেখানে’, ‘অনন্ত কালপুরুষ’, ‘ইপ্সিত ভুবন’, ‘জন্ম ব্যতিক্রম’, ও ‘বেহেস্তের দুয়ার সস্তা হোক’।
প্রথম নাটক ‘একতারা আবার বাজবে’ ঊনত্রিশটি চরিত্রের নাটক। বন্যাত্তোর দুর্ভিক্ষের কবলে পড়া গ্রামবাসীর সর্বস্ব কেড়ে নেয়ার সামন্তবাদী চক্রান্ত, ক্ষুধার জ্বালায় গ্রাম ছেড়ে যাবার হাহাকার, মানবিক প্রেম এ নাটকে উপস্থাপিত হয়েছে।
‘ইচ্ছের পৃথিবী যেখানে’ একটি প্রেমের নাটক। নিম্ন মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ আর কল্পনার মানবিক জগতে দারিদ্র্যের কষাঘাত করুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন নাট্যকার।
‘অনন্ত কালপুরুষ’ নাটকের প্রধান চরিত্রে একজন শিল্পী। যিনি বাগানের ছবি আঁকতে গিয়ে থমকে যান। পারিপার্শ্বিক অসুন্দর আর দুর্বিষহ সামাজিক অবক্ষয়ে তিনি ন্যুব্জ, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। মানবিক বিশ্ব সন্ধানী নাট্যকারের ‘অনন্ত কালপুরুষ’ একটি ব্যতিক্রমী রচনা।
‘ইস্পিত ভুবন’ নাটকে নাট্যকার মূলত একই পৃথিবীর মানুষের বিত্তের বৈপরীত্য একটি প্রতীকী দ্বীপের কল্পনায় তুলে ধরেছেন। সাম্য পৃথিবীর স্বপ্নদ্রষ্টা নাট্যকার দর্শকের মনোজগতে এমন এক পৃথিবীর সন্ধান দেন যে পৃথিবী সাম্য, শান্তি ও মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ। শোষক–শোষিতের চিরকালিক সংঘাত নাট্যকার এ নাটকে দারুণ মুন্সীয়ানায় উপস্থাপন করেছেন।
‘জন্ম ব্যতিক্রম’ বিষাদাত্মক করুণ পরিণতির নাটক। এ নাটকের ব্যাপ্তি তপন নামের এক শিক্ষিত যুবকের বেকারত্ব, স্বপ্নের অপমৃত্যু, হতাশা, বিচ্ছেদবেদনা, প্রতিবাদী সত্তার উন্মেষ ও পদস্খলন। নাট্যকার সংক্ষিপ্ত পরিসরে প্রতি দৃশ্যে লাখো বেকার তরুণের প্রতিনিধি তপনের জন্ম থেকে জেলে যাওয়া পর্যন্ত ঘটনাক্রম নানা সাংকেতিক দৃশ্যকল্পে মূর্ত করেছেন।
‘নাট্যষষ্ঠী‘ গ্রন্থভুক্ত শেষ নাটক ‘বেহেশতের দুয়ার সস্তা হোক’ একক চরিত্রের রম্য নাটক। তোরাব আলী একটি অফিসের কর্মকর্তা। মহাধুরন্ধর, ফাঁকিবাজ, অসৎ একজন মানুষ হিসেবে সর্বজনবিদিত। চাকরিজীবনে যত অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনা করা যায় সবই সে করেছে। স্বগতোক্তিতে সে নিজের চেহারা, অনিয়ম নিয়ে চারপাশের মানুষের নিন্দা ও মৃত্যুপরবর্তী প্রশংসা তাকে কিভাবে আলোড়িত করে তাই সে হাস্যরসাত্মকভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করে। এ স্যাটায়ারধর্মী নাটকে দ্বিচারী মানুষের কৃত্রিম আচরণ চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
নাটক পাঠে নয়, দেখা আনন্দের হলেও ‘নাট্যষষ্ঠী’র নাটকগুলো পড়তে গিয়ে অবচেতনে মনে পড়েছে ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’, মানিক বন্ধ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, তারাশঙ্কর বন্ধ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের কাহিনি। মনে পড়ার কারণ উপর্যুক্ত উপন্যাসগুলোর মতো ‘নাট্যষষ্ঠী’তেও রয়েছে চিরায়ত সাহিত্যের আবেশ। প্রতিটি নাটকের কাহিনি, চরিত্র নির্মাণের অভিনবত্ব এবং দৃশ্যের বিস্তৃত বর্ণনায় নাটকগুলো হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সামাজিক দর্পণ। দারুণ সব যুৎসই সংলাপ, নেপথ্যের করণীয় নাট্যকার যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন তাতে নাটকগুলো মঞ্চায়নে কারো কোন বেগ পেতে হয় না। ‘নাট্যষষ্ঠী’ গ্রন্থের চমৎকার একটি ভূমিকা লিখেছেন নাট্যজন, অঙ্গন থিয়েটারের দলপতি অধ্যাপক সনজীব বড়ুয়া। নান্দনিক প্রচ্ছদ এঁকেছেন হাচনাত, প্রকাশ করেছে বলাকা প্রকাশন।
লেখক: নাট্যকর্মী, প্রাবন্ধিক, কলেজ শিক্ষক।











