কিশোর গ্যাং : সংকট উত্তরণের উপায় কী

রোকেয়া হক | সোমবার , ২৯ জুন, ২০২৬ at ৫:১৩ পূর্বাহ্ণ

বয়স যখন স্কুলে যাবার। হাতে থাকার কথা বই, তাদের হাতে বইয়ের বদলে উঠে এসেছে ধারালোঅস্ত্র। চুরি ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, মাদকদ্রব্য, চোরাচালানির সিলমোহর। চক্রান্তকারীদের খপ্পরে পড়ে জড়িয়ে যাচ্ছে অপরাধ জগতে মৃত্যুর দূত হয়ে। বিশ্বে কিশোর গ্যাং শুরু হয়েছিল ১৮০০ শতকের শেষ ভাগে ইংল্যান্ডে। তবে ১৯৭০ সালের পর থেকে এটি ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্ব জুড়ে । বাংলাদেশে ১৯১৭ সালে ঢাকার উত্তরায় এক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের নাম উঠে আসে পত্রপত্রিকা, নিউজ এর হেডলাইনে। সেই থেকে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ প্রবণতা উত্তর উত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রথমে ছিল শহর এলাকায়, ক্রমে গ্রামেগঞ্জে, মহল্লায়, অলিতেগলিতে ত্রাসের রাজত্ব চালাচ্ছে কিশোর গ্যাং। অধিকাংশ সদস্যের বয়স ১২ থেকে ১৮ বছর। নানা নামে এরা পরিচিত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য শুরু হয় ১৯৯০ সালের দিকে। ২০২৪ সালে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ছিল ২৩৭ টি। এদের সদস্য সংখ্যা ছিল ২৩৮২ জন। বর্তমানে এর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০,০০০ এরও বেশি। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কিশোর। মাদক পাচার, চাঁদাবাজি, মেয়েদেরকে উত্ত্যক্ত করা, এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখা, অস্ত্র প্রদর্শন, খুনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপুল সংখ্যক কিশোরদের একটি অংশ কেন জড়িয়ে পড়ছে অপরাধ জগতে? এর কারণ বহুমাত্রিক। প্রথমত পরিবারে সন্তান এর প্রতি সময় ও মনোযোগের অভাব। দ্বিতীয়ত সমাজে অপরাধ কে ‘ক্ষমতার’ হিসেবে উপস্থাপন। কোন একটা গ্যাংয়ের ‘হিরো’ হওয়া। তৃতীয়ত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। অনেক এলাকায় জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে কিশোরদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। এলাকাবাসীরা বলেন, সমাজের স্বার্থান্বেষী মহল তথাকথিত বড় ভাইরা সামান্য টাকা, সস্তা বিনোদন ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে মিছিলে, মহড়ায় কিংবা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কাজে এদের নামিয়ে দেয়। ক্রমে এরা অনেক রকম অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছে। কাজগুলো করতে গিয়ে তারা অল্প বয়সে চাঁদাবাজি করছে। যেমন অলিগলির ভেতরে রাস্তার দুপাশে, আইনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে অবৈধ ভ্যানগাড়ির পণ্য, বাতিল অটো গাড়িগুলোকে চাঁদাবাজির বিনিময়ে রাস্তায় চলাচলের ব্যবস্থা করে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি করে। স্কুল, কলেজের গেইটের সামনে, ওয়ালের উপর বসে মেয়েদের ইভটিজিং করে ও ‘ইলিকট্রিক স্মোকিং’ করে। সারাদিনের ইনকাম গডফাদারদের কাছে জমা করে, তাদের প্রাপ্য ভাগ নিয়ে, সন্ধ্যা থেকে লিডারদের সাথে জায়গায় জায়গায় জটলা করে গভীর রাত অবধি নেশাভান করে। কিশোর গ্যাং উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত থেকে উঠে আসে। ছিন্নমূল, টোকাইদের বিশেষ ভাবে ট্রেনিং দেয়া হয়, যারা ছোট খাটো চুরি, (যেমন ইলিকট্রিক মিটার থেকে তার খুলে তারের ভেতর থেকে তামা, পানির গেইটবল, জানালা দিয়ে মোবাইল টেনে নেয়া, চলন্ত ট্রাক থেকে পণ্য ছুঁড়ে ফেলে কুড়িয়ে নেয়ার এমন ন্যক্কারজনক কাজগুলো করে থাকে। মধ্যবিত্ত দের মধ্যে স্কুল কলেজে কাঁধে স্কুল ব্যাগ ঝুলিয়ে ইয়াবা, গাঁজা, হিরোইন, ফেনসিডিল বহন করে স্টুডেন্ট সেজে নির্দিষ্ট স্থানে বিতরণ ও পাচার করে আসে। উচ্চবিত্ত গ্যাংগুলো উচ্চবিলাসী, ক্যাডার বাহিনী। অপরাধগুলোও মাফিয়া ডন স্টাইলের। এসব কিশোরগুলো যে যার অবস্থানে থাকে, দখলদারী, মাদকদ্রব্য ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও পাচার, চোরাচালান, সিন্ডিকেট করে খুন, হত্যা সংঘর্ষে দেশ তথা সমাজ কে অস্থির করে রেখেছে। গ্যাং লিডাররা কাজে পারদর্শী হয়ে সে আবার আর একটা নতুন গ্যাং এর জন্ম দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে গ্যাং কালচারের দ্রুত উত্থান চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, কিশোর গ্যাং কালচার থেকে উত্তরণের উপায় কী? বিজ্ঞজনদের মতে, প্রথমে পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে। ১২ থেকে ১৮ সময়টি বয়ঃসন্ধিকাল। সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে কিশোররা পরিবারের চেয়ে বন্ধুদের কথা বেশি বিশ্বাস করে। এসময়ে যদি কোন ভুল বন্ধুর চক্রে পড়ে যায় তাহলে সে জীবনের জন্য অন্ধকার জগতে তলিয়ে যাবে। তাই তাদের সাথে ব্যবহার হতে হবে বন্ধু সুলভ। মাবাবার যতই কর্মব্যস্ততা থাকুক না কেন, খাওয়াদাওয়ার সময়কালে, পড়াশোনার সময়ে বাবা অথবা মা কে পাশে বসিয়ে সন্তানের কুশলাদি জানতে হবে। সন্তানদের বন্ধুবান্ধবকে চিনতে হবে। তাদের পরিবার সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে হবে। তাদের ইচ্ছাঅনিচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে। এই বয়সে মোবাইল, ল্যাপটপ, বাইক চালানো, পকেট মানি সীমিত করতে হবে। সন্তানের পছন্দের খাওয়াদাওয়া, পোশাক কিংবা পছন্দের কিছুর বায়না থাকলে বাবা অথবা মাকে নিজ দায়িত্বে তা পূরণ করতে হবে। অতিরিক্ত সখ, আহ্লাদকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। সপ্তাহে কিংবা মাসে বন্ধুদের বাসায় ডেকে নিতে হবে গল্প করার পরিবেশ করে দিতে হবে। তদ্রুপ সন্তানকেও বন্ধুদের বাসায় নিয়ে যেতে হবে। এ ছাড়া পড়াশুনার পাশাপাশি, আউটডোর, ইনডোর খেলাধুলা, সংস্কৃতিক চর্চা, ধর্মীয়, শিক্ষণীয় গল্পের বই, পড়তে, লাইব্রেরিতে যাতায়াতে অভ্যস্ত করতে হবে।

আত্মীয় স্বজন, গ্রামের প্রকৃতির সাথে পরিচয় করাতে হবে । পারিবারিক সমস্যা থেকে দূরে রাখতে হবে। মোবাইল আসক্তি রোধ করতে হবে। মোটকথা, সুস্থ পরিবেশ, সুস্থ মানসিকতার বিকাশ ঘটাতে হবে। তাহলে অশুভ শক্তির কালো ছায়া সহজে তাদের গ্রাস করতে পারবে না। পরিবারের পরে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। পড়ালেখার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের গতিবিধির নজর রাখতে হবে। সঠিক সময়ে স্কুলে হাজির থাকা। স্কুল চলাকালীন মাঝপথে উধাও হয়ে যাচ্ছে কিনা। চলাফেরায় সন্দেহজনক কিছু দেখা গেলে, অভিভাবকদের সাথে নিয়ে দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে হবে। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সুশীলসমাজ আইন শৃঙ্খলা রক্ষককে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। পথেপ্রান্তরে অসামাজিক কার্যকলাপে কিশোর গ্যাং জড়িত হলে, সাথে সাথে বাধা দিতে হবে। সর্বশেষে কিশোর গ্যাং বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বড় সামাজিক ব্যাধি এবং প্রতিটি মা বাবার জন্য একটি মূর্তিমান আতঙ্ক। তাই কিশোর গ্যাং কালচারকে সবাই মিলে নির্মূল করতে হবে। পরিবার, সমাজ তথা দেশকে সুস্থ, কলংক মুক্ত রাখতে হবে ।

লেখক: প্রাবন্ধিক, রন্ধনশিল্পী, টিভি উপস্থাপক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবন্দরজট কমাতে করণীয়
পরবর্তী নিবন্ধনাট্যষষ্ঠী : স্বপন বড়ুয়ার অনন্য সৃজনশিল্প