গরিব রোগীদের হার্টে বিনামূল্যে রিং লাগানোর জন্য অর্থ বরাদ্দের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো রিং কেনার প্রক্রিয়া শেষ করতে পারেনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, কেনাকাটার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে রিং কেনার জন্য মূলত কিছুটা সময়ক্ষেপণ হয়েছে। তবে রিং কেনা বাবদ প্রাপ্ত ৫ কোটি টাকা সম্পূর্ণ অনুদানের হওয়ায় এসব টাকা অর্থবছরের মধ্যে ব্যয় না হলে ফেরত যাওয়ার আশঙ্কা নেই। আগামী ১ জুলাই থেকে দরপত্র আহ্বান করা হবে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ১৮ জানুয়ারি ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের জন্য ৫ কোটি টাকা, ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের জন্য ১০ কোটি টাকা এবং চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের জন্য ৫ কোটি টাকা এবং নিউরোলজি বিভাগের জন্য ৫ কোটি টাকা অনুদানের চেক দেওয়া হয়। তবে হৃদরোগ বিভাগের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থব্যয় কেবল প্রাইমারি পিসিআইয়ের (আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত সময়ে রিং পরানো) জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। প্রাইমারি পিসিআই করার জন্য রোগীকে হার্ট অ্যাটাকের ১২ ঘণ্টার মধ্যে আসতে হবে। প্রাথমিকভাবে ধনী–গরিব সবাই এই অনুদানের অর্থ পাবেন। তবে পরবর্তীতে রোগীর সামাজিক অবস্থান ও অর্থবিত্ত যাচাই করে ধনী বা সামর্থ্যবানদের কাছ থেকে সেই অর্থ ফেরত নেওয়া হবে। বিনামূল্যে রিং পাবেন কেবল গরিব রোগীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাইমারি পিসিআই হৃদরোগের একটি আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে রোগীর হার্ট অ্যাটাকের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এনজিওগ্রাম করার পরে হার্টের রক্তনালীর ব্লক থাকলে রিঙের মাধ্যমে খুলে দিয়ে পুনরায় সচল করা হয়। এতে হার্টের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। ফলে রোগীও খুব দ্রুত স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে যেতে পারে। সরকারি পর্যায়ে এই চিকিৎসা এখন পর্যন্ত ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দেওয়া হচ্ছে। হৃদরোগীর এই চিকিৎসার জন্য বর্তমানে চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতালই একমাত্র ভরসা। সেখানে বর্তমানে ২ থেকে ৩ লাখ খরচ হয়। চমেক হাসপাতালে সেবাটি চালু করলে সুফল পাবেন গরিব রোগীরা।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন আজাদীকে বলেন, প্রাইমারি পিসিআইয়ের রিঙের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে। আগামী ১ জুলাই থেকে প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মতে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কম টাকায় যাতে রিং নিতে পারি, সে কারণে দরপত্র নেওয়া হচ্ছে। আগামী ১ তারিখ থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে।
চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে এনজিওগ্রাম করা হয়েছে ১ হাজার ৫৩৫ রোগীর এবং হার্টে রিং লাগানো হয়েছে ৪৮৬ রোগীর। টেম্পোরারি পেসমেকার লাগানো হয়েছে ৮৯ রোগীর এবং পার্মানেন্ট পেসমেকার লাগানো হয়েছে ৯০ রোগীর। ২০২২ সালে এনজিওগ্রাম করা হয়েছে ২ হাজার ৬৮৮ রোগীর, পেরিপেরাল এনজিওগ্রাম করা হয়েছে ২ রোগীর ও হার্টে রিং লাগানো হয়েছে ৭৩৭ রোগীর, টেম্পোরারি পেসমেকার লাগানো হয়েছে ১২৫ রোগীর এবং পার্মানেন্ট পেসমেকার লাগানো হয়েছে ৯৭ রোগীর, পিটিএমসি ৬ জনের, একজনের পিডিএ, এএসডি ৩ জনের এবং ভিএসডি করা হয়েছে ১ জনের। ২০২৩ সালে এনজিওগ্রাম করা হয়েছে ২ হাজার ৪৩৫ রোগীর, পেরিপেরাল এনজিওগ্রাম ১২ জনের, হার্টে রিং লাগানো হয়েছে ৮০৮ জনের, টেম্পোরারি পেসমেকার লাগানো হয়েছে ১১২ জনের এবং পার্মানেন্ট পেসমেকার লাগানো হয়েছে ৯৪ রোগীর। ২০২৪ সালে এনজিওগ্রাম করা হয়েছে ২ হাজার ১৭২ রোগীর, পেরিপেরাল এনজিওগ্রাম ৭ রোগীর, হার্টে রিং লাগানো হয়েছে ৮৫৮ রোগীর, টেম্পোরারি পেসমেকার লাগানো হয়েছে ৯৭ রোগীর এবং পার্মানেন্ট পেসমেকার লাগানো হয়েছে ৭৭ রোগীর। এছাড়া পিটিএমসি করা হয়েছে ৫ রোগীর। ২০২৫ সালে এনজিওগ্রাম করা হয়েছে ২ হাজার ১৩০ রোগীর, পেরিপেরাল এনজিওগ্রাম করা হয়েছে ৬ রোগীর, হার্টে রিং লাগানো হয়েছে ৯৮৯ রোগীর, টেম্পোরারি পেসমেকার লাগানো হয়েছে ৭৮ রোগীর এবং পার্মানেন্ট পেসমেকার লাগানো হয়েছে ৭৩ রোগীর।
চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত এনজিওগ্রাম করা হয়েছে ৮০৮ রোগীর, পেরিপাইরাল এনজিওগ্রাম করা হয়েছে এক রোগীর, হার্টে রিং লাগানো হয়েছে ৪১৭ রোগীর, টেম্পোরারি পেসমেকার লাগানো হয়েছে ২১ রোগীর এবং পার্মানেন্ট পেসমেকার লাগানো হয়েছে ২৫ রোগীর।












