১১ ই জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হবে। এটি বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। প্রতিবছরের ন্যায় এবারের বাজেটেও রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের নতুন লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হবে এবং তা আগের বছরের চেয়ে বাড়বে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়। বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে সরকার বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য নতুন নতুন পন্থা ও ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত করে। বাজেট ঘোষণার তিন/চার মাস আগে থেকে কিভাবে রাজস্ব আয় বাড়ানো যায় সেটি নিয়ে সেমিনার সিম্পোজিয়াম ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের মতামত গ্রহণ করে এবং শুল্ক, ভ্যাট ও ট্যাক্সের আওতা বাড়ায়। বাংলাদেশের প্রকল্প পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প। সরকারের যে কোন কেনাকাটায় অতিরিক্ত টাকা ব্যয় হয়। এই অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অপরিকল্পিত ব্যয় নিয়ে সারাবছর দেশের পেপার পত্রিকায় প্রচুর নিউজ বের হয়। কিন্তু বিষয়গুলোর সমাধান অদ্যাবধি হয় নাই। সবকিছু দেখে মনে হয় বিষয়গুলো দেখভাল করে খরচের লাগাম টানার মত দেশে কেউ নেই। দেশে সরকারি প্রজেক্ট ও প্রকল্প বাস্তবায়নের কর্তৃপক্ষ হলো–
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)।
এসব দপ্তরে চাকরিরত ব্যক্তি ও নীতিনির্ধারকেরা হলো দেশের সবচেয়ে মেধাবী সন্তান ইঞ্জিনিয়ার। যারা বুয়েটসহ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করা ছাত্র ছাত্রী। যাদের মেধা যোগ্যতা ও শিক্ষা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। কিন্তু চাকরিতে তাদের কার্যকলাপ ও বিভিন্ন প্রকল্পের অপরিপক্কতা ও ব্যয় নিয়ে পত্রিকায় প্রায় নেতিবাচক সংবাদ হয়। তেমনি একটি প্রকল্প নিয়ে আজকের আলোচনা।
প্রকল্পটি বিদেশী ঋণ নির্ভর টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত মহাসড়ক সমপ্রসারণ প্রকল্প। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে এই প্রকল্পে যুক্ত করা হয় গবেষণাগার উন্নয়নের নামে ভবন নির্মাণসহ নানা বিলাসী উপকরণ। মাল্টিপারপাস হল, সেমিনার হল, কনফারেন্স হল, লাউঞ্জ, দেড় শতাধিক পাঁচ তারকা হোটেলের সমমানের থাকার কক্ষ, সুইমিংপুল, জিমনেসিয়াম, ইনডোর গেমস সরঞ্জাম (বিলিয়ার্ড, স্নুকার, কার্ড রুম) ইত্যাদি। এসব করা হচ্ছে পরিবেশ বিধ্বংসী পদ্ধতি বড় বড় গাছ কেটে ও পুকুর ভরাট করে। বর্তমান সরকার সারা দেশে বৃক্ষরোপণে জোর দিয়েছে। অথচ সরকারেরই একটি সংস্থা গাছ কেটে বিলাসী ভবন তৈরি করছে।
প্রকল্পটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের। প্রকল্পটির নাম সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প–২। আর বিলাসী ভবনগুলোর নির্মাণকাজ চলছে মিরপুরের পাইকপাড়ায় সড়ক গবেষণাগার এলাকায়। জায়গাটি মূল সড়ক থেকে ভেতরে, গাছগাছালিতে ঘেরা। এখানে নতুন ভবন নির্মাণ করতে ভাঙা হয়েছে পুরোনো স্থাপত্যশৈলীর ভবন। প্রকল্পে বিলাসী উপকরণ যোগ হওয়ার সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ও। শুরুতে এসব ভবন ও কিছু যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই) নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে। তারা কাজটি পেয়েছিল ২৩২ কোটি টাকায়। কিন্তু তিন দফা ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্পটি এখন ৩৩৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে।
অভিযোগে প্রকাশ, ঠিকাদার সওজের প্রাক্কলনের চেয়ে ১৩.৫% ছাড়ে (লেস) মূল্য প্রস্তাব করে কাজটি পান। তখন অনেক উপকরণের (আইটেম) মূল্য কম দেখিয়ে কাজটি বাগিয়ে নেন। পরে প্রকল্পের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে যেসব আইটেমের মূল্য কম দেখানো হয়েছিল, এর বেশির ভাগ বাদ দেওয়া হয়। আর নতুন নতুন পণ্য ও কাজ যোগ করা হয়, যেগুলোর মূল্য বেশি। মূলত বাড়তি লাভের জন্যই এই কারসাজি করা হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ জেনেশুনে অনুমোদনও করেছে। সব মিলিয়ে ঠিকাদার কাজ নেওয়ার পর কৌশল করে প্রায় ৪৫% ব্যয় বাড়িয়েছেন, যা খুবই অস্বাভাবিক। আরো ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো হাতিরঝিলের পাশেই ২০২৩ সালের শেষের দিকে সওজের নতুন প্রধান কার্যালয় উদ্বোধন করা হয়। আধুনিক নকশা এবং দৃষ্টিনন্দন এই ভবনের পাশেই আরেকটি গোলাকার দৃষ্টিনন্দন ভবন তৈরি করা হয় একই সময়। এটির একাংশ ব্যবহার করে সওজ, অন্য অংশ ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। দুটি ভবনই ১৩ তলাবিশিষ্ট। প্রধান কার্যালয়ে ৭০০ আসনবিশিষ্ট মিলনায়তনসহ বিভিন্ন আকারের সম্মেলনকক্ষ, বড় মসজিদ, পাবলিক প্লাজা, ডে কেয়ার সেন্টার, পাঠাগার, ক্যাফেটেরিয়া, ২০০ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আছে। সব মিলিয়ে দুটি ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছিলো ৩৩৫ কোটি টাকা। দুটি ভবনে এক হাজারের মতো কর্মকর্তা–কর্মচারীর কক্ষ ও বসার জায়গা রয়েছে। অন্যদিকে সওজের গবেষণাগারে সর্বসাকুল্যে লোকবল আছে ৫০ জনের মতো। তারপরও খরচ করা হচ্ছে দুই ভবনের সমান টাকা।
দৃষ্টিনন্দন ভবন থাকা সত্ত্বেও নতুন করে বিলাসী ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্য নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিমত, সড়ক ভবনে সেমিনার হলসহ অন্যান্য সুবিধা থাকার পরও নতুন করে একই ধরনের বিলাসী স্থাপনা করার যৌক্তিকতা নেই। প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর এটা একটা কৌশল।
আসলে এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় কয়েক গুণ বেশি–এমনি এমনি হয়না। বিলাসী ব্যয়, যোগসাজশ করে উপকরণ কমানো–বাড়ানো এভাবেই ব্যয় বাড়ে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, মন্ত্রিসভা কমিটি–কীভাবে এগুলো পাস করে, তা বড় প্রশ্ন। নিশ্চয়ই বিভিন্ন স্তরে সুবিধাভোগী রয়েছে। একই সঙ্গে ঋণদাতা সংস্থাও দায় এড়াতে পারে না বলে তারা মনে করেন।
সওজ সূত্র জানায়, মিরপুরের গবেষণাগারে বিলাসী স্থাপনা নির্মাণসহ দুটি প্যাকেজের কাজ পাওয়া এনডিই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৭ সালের শেষ দিকে সওজে ঠিকাদারি শুরু করে। পরবর্তী ছয় বছরে তারা সড়কে একক ও যৌথভাবে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার ঠিকাদারি পেয়েছে, যা মোট কাজের ১০%। অন্য কোনো ঠিকাদার এত কাজ পায়নি।
সাসেক হলো দক্ষিণ এশীয় উপ–আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত ১৯০ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয় সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প–২। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১১,৮৯৯ কোটি টাকা। তিন দফা ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯,০৫৬ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে। তারা ১১,০০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ দিচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা, দুই পাশে স্থানীয় যাতায়াতের জন্য সড়ক নির্মাণ, বেশ কিছু উড়ালসড়ক ও সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে।
আসলে দেশের উন্নয়নে যে টাকা খরচ করা হয় তার যোগানদার হলো দেশের ১৮ কোটি জনগণ। এতে আমার আপনার সবার টাকা রয়েছে। তাই আমার টাকার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কিনা সেটি দেখার ও হিসাব নেওয়ার অধিকার ও দায়িত্ব দুটোই আমার রয়েছে। ব্যয়িত টাকা সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে কিনা তা দেখার অধিকার রয়েছে দলমত নির্বিশেষে নাগরিক সমাজেরও। মনে রাখতে হবে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও যদি এসব অনিয়মের বিচার করা না যায়, তবে এ জাতির দুঃখ কখনো শেষ হবে না।
লেখক: কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক।












