প্রকৃতি বাঁচলে মানবতা বাঁচবে

সিঞ্চন ভৌমিক | শুক্রবার , ৫ জুন, ২০২৬ at ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ

প্রকৃতি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং পরিবেশ দূষণের ভয়াবহ প্রভাব শুধু একটি দেশ বা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমগ্র পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবজাতি, বন্যপ্রাণী, পাখি, সামুদ্রিক প্রাণসবাই আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি।

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। কিন্তু বাস্তবে আমরা সমাজ ও রাষ্ট্রের দিকে তাকালে দেখতে পাই অবহেলা, উদাসীনতা এবং দায়িত্বহীনতার এক নির্মম চিত্র। তাই নতুন প্রজন্মকে পরিবেশ ও প্রাণপ্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

উনবিংশ শতাব্দীর কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেছিলেন, ‘পরিবেশ আমাদের জাতীয় সম্পদ।’ তাই পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যেমন আমাদের সাংবিধানিক অধিকার, তেমনি পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব।

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, একটি দেশের মোট আয়তনের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। অথচ সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১৬ শতাংশ, আর বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণায় এ হার ৯ শতাংশেরও কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমাদের দেশের অনেক স্থানে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছেরাস্তার ধারে গাছ লাগিয়ে ১৫২০ বছর পর তা কেটে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করা যায়। এই মানসিকতা শুধু পরিবেশবিরোধী নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অন্যায়। গাছ লাগানোর অধিকার সবার আছে, কিন্তু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে বৃক্ষনিধনের অধিকার কারও নেই।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাস্তার পাশের গাছ জমির মালিকানা দাবি করে নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে। অথচ পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে এভাবে সড়কপথের বৃক্ষ ধ্বংস করা হয় না। রাস্তার পাশের গাছগুলো মাটির ক্ষয়রোধ করে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমায়, পাখির আবাসস্থল তৈরি করে, শব্দ ও তাপদূষণ কমায় এবং সর্বোপরি মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করে। মানুষের জীবনের জন্য অক্সিজেন কতটা অপরিহার্য, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনুযায়ী একজন মানুষ প্রতিদিন প্রায় ১১ হাজার লিটার বায়ু গ্রহণ করে। এই অক্সিজেনের প্রধান উৎস বৃক্ষ, লতাগুল্ম এবং জলজ উদ্ভিদ। বিজ্ঞান আজ অনেক বিস্ময়কর আবিষ্কার করেছে, কিন্তু প্রকৃতির মতো সহজে ও অবিরাম অক্সিজেন উৎপাদনের বিকল্প এখনো সৃষ্টি করতে পারেনি। অথচ অক্সিজেন ছাড়া একজন মানুষ কয়েক মিনিটের বেশি বাঁচতে পারে না।

প্রতিটি ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় সেখানে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যার অনুপাতে বৃক্ষরোপণের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোন প্রজাতির গাছ রোপণ করা হবে, তাও পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। নগর উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।

বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ২ লাখ ৫৭ হাজার একর বনভূমি অবৈধ দখলদারদের কবলে রয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসব বনভূমি দখল করে রেখেছে। এই পরিস্থিতি শুধু পরিবেশের জন্য নয়, দেশের ভবিষ্যতের জন্যও ভয়াবহ হুমকি।

প্রকৃতি কারও একার সম্পত্তি নয়। এর উপর মানুষের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি রয়েছে পশুপাখি, জীববৈচিত্র্য এবং সমগ্র প্রাণিজগতেরও অধিকার। পৃথিবীতে শুধু মানুষের নয়, সকল জীবের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।

তাই আসুন, আমরা প্রকৃতিকে ভালোবাসি, বৃক্ষরোপণ করি, বিদ্যমান বৃক্ষ রক্ষা করি এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গড়ে তুলি। কারণ প্রকৃতি বাঁচলে মানবতা বাঁচবে, প্রকৃতি ধ্বংস হলে মানবসভ্যতার অস্তিত্বও একদিন সংকটের মুখে পড়বে।

আমরা প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতির মাঝেই আমরা বাঁচতে চাই মানুষের মতো, মানবিকতার সঙ্গে।

লেখক : প্রকৌশলী

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিক্ষিত অমানবিক সন্তানের চেয়ে অশিক্ষিত মানবিক সন্তান অনেক গুণ শ্রেষ্ঠ!
পরবর্তী নিবন্ধজলবায়ু পরিবর্তন : পাপ অন্যের, শাস্তি বাংলাদেশের