ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির সন্দেহভাজন খুনিদের গ্রেপ্তার নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যের পর তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার শিলিগুড়ি সাইবার থানায় রিংকি চ্যাটার্জী সিং নামে এক আইনজীবী তার বিরুদ্ধে মামলা করেন বলে ভারতের সংবাদ সংস্থা এএনআই লিখেছে। খবর বিডিনিউজের।
মামলায় এ আইনজীবী অভিযোগ করেছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে দাবি করেন, ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তার গোপন আলোচনা হয়েছে। তিনি প্রতিবেশী বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারত সরকার ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জড়িয়ে আরো কিছু অভিযোগ তোলেন। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছে কেন্দ্রীয় সরকারের ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করা এবং দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে শত্রুতা তৈরির স্পষ্ট উদ্দেশ্যে এই ধরনের অভিযোগ জনসাধারণের সামনে ও গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে করা হয়েছে।’
মমতার বক্তব্যকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রতি উসকানিমূলক ও মানহানিকর বলে মামলায় অভিযোগ করেন রিংকি চ্যাটার্জী। এ আইনজীবীর অভিযোগ, সমপ্রতি বিভিন্ন জনসভা, রাজনৈতিক মঞ্চ ও গণমাধ্যমে তিনি ভারতের নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনে আইনশৃক্সখলা বজায়ের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীসহ ভারতের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বেশ কিছু উসকানিমূলক আর উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি প্রকাশ্যে এই ধরনের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সততা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের মাঝে অবিশ্বাস ও অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা করেছেন। মঙ্গলবার কলকাতার ধর্মতলার ‘ওয়াই চ্যানেল’ এলাকায় এক প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তৃতায় রাজ্য ও কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির কড়া সমালোচনা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বক্তৃতায় মমতা দাবি করেন, বিজেপির কাছে ক্ষমতা হারানোর প্রায় এক মাস পর বাংলাদেশে আগের বছরের বড় একটি হত্যাকাণ্ডের আসামিদের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তারের পর এ বিষয়ে তাকে ‘চুপ থাকতে বলেছিলেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত এক ভিডিওতে তার এ বক্তব্য প্রচার করা হয়। ওই বক্তব্যের এক দিন পরই তার বিরুদ্ধে মামলা হল।
বাংলাদেশ বড় ওই হত্যাকাণ্ডের শিকার কে হয়েছিলেন, সে বিষয়ে কারও নাম না নিলেও ঘটনার ধারাবাহিকতা বলছে, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়েই কথা বলেছেন। হাদি হত্যাকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে মমতা তখন বলেন, বাংলাদেশ থেকে একটা বড় খুনিকে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল; যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন হয়েছিল। অন্য দেশের কথা আমি বলছি না, আমার অধিকারও নেই বলার। কিন্তু আমি যেটা বলতে চাইছি তা হল ওই হত্যাকারীরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে। বাংলায় আসার পর আমাদের এসটিএফ তাদের ধরে। এইটা তাদের কৃতিত্ব। কিন্তু তারপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, আপনি রাজ্য পুলিশকে জানিয়ে দিন এটা যেন বাইরে না যায়। কারণ এটা দেশের ব্যাপার। কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল? আজকের সরকার পরিবর্তন হলেও আমি সবটাই জানি। আমার হৃদয়টাই একটা কথার ভাণ্ডার, তথ্য ভাণ্ডার। এতদিন আমি বলিনি। কিন্তু আজকে অত্যাচারে শেষ সীমায় গেছে বলে আমাকে মুখ খুলতে হয়েছে। আমি সেই নামটা বলতে চাইছি না, বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে। আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি। দেশের স্বার্থে ওই নাম আমি বলব না।
বিবিসি বাংলাকে আইনজীবী রিংকি চ্যাটার্জী বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছিলেন, তখন তিনি শপথ নিয়েছিলেন যে দেশের সুরক্ষা, সার্বভৌমত্ব ও সংহতি তিনি রক্ষা করবেন। কিন্তু তার বক্তব্যে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খারাপ হতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়। বাংলাদেশের সরকার এমনকি ওসমান হাদির পিতামাতাও এই হত্যাকাণ্ডে ভারতের দিকে আঙুল তোলেননি, ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক বড় বিপদের জন্ম দিয়েছেন। এই মন্তব্যের ফলে বাংলাদেশে ভারত বিরোধী শক্তি সক্রিয় হতে পারে ও বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা অসুরক্ষিত হয়ে পড়তে পারেন।












