কুয়েত বিমানবন্দরে ইরানের হামলা নিহত ১, আহত চার বাংলাদেশি

কূটনৈতিক মিশন ক্ষতিগ্রস্ত, আতঙ্কে প্রবাসীরা

আজাদী ডেস্ক | বৃহস্পতিবার , ৪ জুন, ২০২৬ at ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ

কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন নিহত এবং অন্তত ৬০ জন আহত হয়েছে। হামলায় আহতদের মধ্যে চারজন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাস। একই সঙ্গে কুয়েত সরকার জানিয়েছে, হামলায় কয়েকটি কূটনৈতিক মিশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গতকাল বুধবারের এই হামলার পর পুরো কুয়েতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কুয়েতের প্রতিরক্ষামন্ত্রণালয় এ ঘটনাকে ইরানের অপরাধমূলক আগ্রাসন হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় বলেছে, আক্রমণের ফলে কূটনৈতিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

কুয়েতের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর সেখানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিমানবন্দরের বিভিন্ন অংশে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয় এবং উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে নিরাপত্তা বাহিনী ও চিকিৎসা দল। নিহত ব্যক্তিকে পরে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, আরও কয়েকজন ভারতীয় নাগরিক আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দ্রুত এ ধরনের হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি।

এদিকে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, হামলায় আহত চার বাংলাদেশিকে স্থানীয় ফারওয়ানিয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দূতাবাসের এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আহতদের চিকিৎসা ও সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। তবে আহত বাংলাদেশিদের নামপরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান আঞ্চলিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সমপ্রতি কুয়েতের আকাশসীমা একাধিকবার ড্রোন ও মিসাইল দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় চারজন বাংলাদেশি নাগরিক আহত হয়েছেন এবং আরও কয়েকজন বিদেশি নাগরিক আহত হওয়ার পাশাপাশি একজন নিহত হয়েছেন।

হামলার পর কুয়েতে অবস্থানরত প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সতর্কবার্তাও দিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস। কুয়েত সরকারের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে দূতাবাস বলেছে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে রকেট বা ড্রোন হামলার ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেগুলো প্রকাশ করা দেশটির আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কুয়েত সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, এ ধরনের বিশেষ পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থলের বিশেষ করে রকেট বা ড্রোন হামলার এবং সেগুলি প্রতিহত করার ছবি তোলা কিংবা ভিডিও ধারণ করা কুয়েতের আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। এ অবস্থায় কুয়েতের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে কুয়েত সরকারের দিকনির্দেশনা মেনে চলা এবং এসব ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করা থেকে বিরত থাকার জন্য সকলকে অনুরোধ করা হল। হতাহত বৃদ্ধির কারণে কুয়েতের কেন্দ্রীয় ব্লাড ব্যাংকে রক্তের সংকট তৈরি হয়েছে বলেও জানিয়েছে দূতাবাস। এ প্রেক্ষাপটে রক্তদানে সক্ষম প্রবাসী বাংলাদেশিদের দ্রুত কেন্দ্রীয় ব্লাড ব্যাংকে গিয়ে রক্ত দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

দূতাবাস বলেছে, এ প্রেক্ষিতে রক্তদানে সক্ষম কুয়েতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের জরুরি ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্লাড ব্যাংকে গমন করে রক্ত দান করা এবং অন্যদেরকে এ বিষয়ে উৎসাহিত করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।

অন্যদিকে, হামলার পর কুয়েত সরকার তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় দুই ইরানি কর্মকর্তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কুয়েত ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি ইরানের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হামলার দায় স্বীকার করে বলেছে, ইরানের একটি তেল ট্যাংকার এবং কাশেম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে কুয়েতে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে।

মার্কিন বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরান কুয়েতের দিকে দুটি এবং বাহরাইনের দিকে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। তাদের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর সবই ধ্বংস করা হয়েছে অথবা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পাল্টা জবাব হিসেবেই তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

এর আগে সেন্টকম জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ পরিস্থিতির মধ্যে ইরান অভিমুখে অগ্রসর হওয়া একটি খালি তেল ট্যাংকারে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। বতসোয়ানার পতাকাবাহী ওই ট্যাংকারটির নাবিকরা একাধিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার পর যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধবিমান ট্যাংকারটির ইঞ্জিন লক্ষ্য করে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এই ঘটনার পরই তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেয় আইআরজিসি। তারা সতর্ক করে বলেছিল, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার জন্য মার্কিন বাহিনীকে চড়া মূল্য দিতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার এই উত্তেজনা আরও বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক বিমান চলাচল, তেল সরবরাহ ও প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কুয়েতে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ঢাকাও।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচরম মানসিক ও আর্থিক সংকটে পারস্য উপসাগরে আটকা পড়া নাবিকরা
পরবর্তী নিবন্ধবিএনপি আমার শেষ ঠিকানা : সাবেক পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান