মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) মে মাসের ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি মনিটরিং প্রতিবেদন’–এ বলা হয়েছে, দেশে মব সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েই চলেছে। মে মাসে মব সহিংসতায় ৩২ জন নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত রোববার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এমএসএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১০ জন মব সহিংসতায় নিহত হন। একই ধরনের ঘটনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৮, মার্চে ১৯ ও এপ্রিলে ২১ জন প্রাণ হারান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মব সহিংসতার সংখ্যা নির্দেশ করে যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সামাজিক বিরোধগুলো ক্রমেই সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মবের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, যা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের দুর্বলতা নির্দেশ করে।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল স্বাক্ষরিত মে মাসের প্রতিবেদনে এমএসএফ বলেছে, মে মাসে কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটলেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে উদ্বেগজনক অবনতি লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে, মব ভায়োলেন্স ও সীমান্ত এলাকায় সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ ও বিচারবহির্ভূত প্রবণতার ইঙ্গিত বহন করে।
এপ্রিল ও মে মাসের তুলনামূলক বিশ্লেষণে এমএসএফ বলেছে, ধর্ষণসহ নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। মে মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের অন্তত ৩২৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় ১২টি বেশি। মে মাসে ৭০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যা আগের মাসে ছিল ৫৪টি। সে হিসাবে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া ১৬টি দলবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ছয়টি ঘটনা ঘটেছে। এপ্রিল মাসে এমন ঘটনা ছিল দুটি। এমএসএফ জানিয়েছে, এ মাসে ৫৩টি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। আর কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে সাতজনের।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মব কালচার বন্ধে বিদ্যমান আইন সংস্কার করা হবে। তিনি বলেন, মব কালচার পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্যে বিদ্যমান আইনকে সংশোধন ও সংযোজন করে যুগোপযোগী করা হবে। রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ মিলনায়তনে পুলিশ সপ্তাহ–২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কল্যাণ সভায় তিনি এ কথা বলেন। এ সময় পুলিশ বাহিনীকে একটি জনকল্যাণমুখী ও আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের আর্থিক সঙ্গতি ও সক্ষমতা বিবেচনায় তাদের যৌক্তিক দাবিসমূহ পূরণের আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ তাঁর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ‘মব কালচারের দিন শেষ‘। কিন্তু দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা ঠেকানো সরকারের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং হবে, এই প্রশ্ন সামনে আসছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এ ধরনের প্রশ্ন উঠছে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই আলোচনায় ছিল ‘মব ভায়োলেন্স‘ বা ‘দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা‘ সৃষ্টির নানা ঘটনা। এর বিরুদ্ধে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও নানা আলোচনা–সমালোচনা হয়েছে। মব তৈরি করে কখনও নিরপরাধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, চাঁদাবাজি যেমন হয়েছে, তেমনি মারপিট করা হয়েছে ভিন্ন মতের রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের। এমনকি দলবদ্ধভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২৫ সালেই বাংলাদেশে ৪৬০ জনকে মব জাস্টিস এবং ম্যাস বিটিং এর মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী এবং অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেঙে পড়া আত্মবিশ্বাস এবং ‘মব ভায়োলেন্স‘ দমনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্লিপ্ততা অপরাধীদের উৎসাহ জুগিয়েছে। দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে সংগঠিত একের পর এক অপরাধের ঘটনা ঘটলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চুপ থেকেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এমন প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে নতুন সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা ঠেকানো বিএনপি সরকারের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং হবে, এই প্রশ্ন সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের জন্য পরিস্থিতি সামলানো চ্যালেঞ্জিং হবে, তবে অসম্ভব নয়। তাঁরা বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব। তবে বিচারের নামে কেবল ভিন্ন মত দমন, নিজ দলের সমর্থকদের সব দোষ মাফ কিংবা দলবদ্ধভাবে ভিন্ন মতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পুরনো সংস্কৃতি চলতে থাকলে কোনো লাভ হবে না বলে মনে করেন তাঁরা। তবে বিচারের ক্ষেত্রে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে যেন প্রশ্ন না ওঠে, এমন কথাও বলছেন বিশ্লেষকরা।








