অসুরের বিরুদ্ধে সুরের আগুন জ্বালানো এক আলোকবর্তিকার প্রস্থান

হাবিবুল হক বিপ্লব | সোমবার , ১ জুন, ২০২৬ at ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের আকাশে আরেকটি নক্ষত্রের পতন ঘটল। ডা. চন্দন দাশ আর নেই। তাঁর প্রয়াণ শুধু একজন চিকিৎসকের মৃত্যু নয়, এটি একটি আদর্শ, একটি চেতনা, একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ধারকবাহকের বিদায়। এমন এক সময়ে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, যখন বাংলাদেশে অসামপ্রদায়িকতা, মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীল মূল্যবোধ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই তাঁর চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে এক অপূরণীয় ক্ষতি।

ডা. চন্দন দাশ ছিলেন পেশায় চিকিৎসক, কিন্তু তাঁর পরিচয়ের পরিধি তার চেয়েও অনেক বিস্তৃত। তিনি ছিলেন সাংস্কৃতিক সংগঠক, গণমানুষের কণ্ঠস্বর, নাগরিক আন্দোলনের সহযোদ্ধা এবং চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। মানুষের শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি সমাজের অসুস্থতাকেও নিরাময় করতে চেয়েছেন সংস্কৃতি, মানবতা ও যুক্তিবাদের আলো দিয়ে।

বামপন্থী রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ডা. চন্দন দাশ দীর্ঘদিন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর নেতৃত্বে যুক্ত ছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, অন্ধকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো সংস্কৃতি। তাঁর প্রিয় দর্শন ছিল-‘অসুরের বিরুদ্ধে সুরের আগুন জ্বালানো।’ এই বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করেই তিনি সারাজীবন সামপ্রদায়িকতা, মৌলবাদ, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। ২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চের চট্টগ্রাম পর্বে তিনি ছিলেন অন্যতম সংগঠক। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনের আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করতেন, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা ছাড়া কোনো জাতি সামনে এগোতে পারে না। তাই মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ রক্ষার সংগ্রামে তিনি কখনো আপস করেননি। শুধু সাংস্কৃতিক আন্দোলন নয়, চট্টগ্রামের নাগরিক অধিকার আন্দোলন, পরিবেশ রক্ষার সংগ্রাম কিংবা যেকোনো জনবান্ধব উদ্যোগে তাঁকে দেখা গেছে সামনের সারিতে। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানুষের জন্য, সমাজের জন্য এবং একটি মানবিক বাংলাদেশের জন্য কাজ করেছেন নিরলসভাবে। তাঁর কণ্ঠ ছিল প্রতিবাদের, তাঁর উপস্থিতি ছিল সাহসের উৎস, তাঁর জীবন ছিল প্রতিশ্রুতির প্রতীক।

আজ যখন উগ্রবাদ, অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের রাজনীতি সমাজকে ক্রমাগত সংকুচিত করে তুলছে, তখন ডা. চন্দন দাশের মতো মানুষের প্রয়োজন ছিল আরও বেশি। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে সংলাপ, সমপ্রীতি ও সহাবস্থানের পথ খুঁজতেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের বিষয় নয়; এটি প্রতিরোধের ভাষা, মানবমুক্তির শক্তি।

ডা. চন্দন দাশের মৃত্যুতে চট্টগ্রাম হারাল তার এক নিবেদিত প্রাণ সাংস্কৃতিক সৈনিককে, প্রগতিশীল সমাজ হারাল এক নির্ভীক কণ্ঠকে, আর বাংলাদেশ হারাল অসামপ্রদায়িক চেতনার এক অক্লান্ত প্রহরীকে।

তবে মানুষ চলে যান, তাঁদের আদর্শ থেকে যায়। ডা. চন্দন দাশও বেঁচে থাকবেন তাঁর লালিত মূল্যবোধে, তাঁর সংগঠিত আন্দোলনগুলোর স্মৃতিতে, তাঁর সাহসী উচ্চারণে এবং অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅহংকার করার মত নেতা
পরবর্তী নিবন্ধপেশাদার ও ছদ্মবেশী ভিক্ষাবৃত্তি : সংকটে মানবিকতা