নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি মানুষের আকর্ষণ দুর্নিবার। পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম মানুষ আদম বা এডাম। তিনি যদি ইভ কে নিয়ে নিষিদ্ধ গন্ধম না খেতেন তাহলে আমরা মানব জাতিই পেতাম না। এই আকর্ষণ এমনই প্রবল ছিল যে স্বর্গের নন্দনকাননের হাতছানি এড়িয়ে আদম নেমে এসেছিলেন মাটির দুনিয়ায়। কী আকর্ষণ! কী দুর্নিবার টান। এই যে নিষিদ্ধকরণ এর একটা চমৎকার ঐতিহাসিক গল্প আছে। আপনারা জানেন সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাশিয়া তথা সোভিয়েত ইউনিয়নে লেনিন বরিস পাস্তারনাকের একটি বই নিষিদ্ধ করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে লেনিনের মত ছিল একটি বাচ্চা বা শিশুকে যখন এক গ্লাস চিনি দেয়া হয় মিষ্টির প্রতি আসক্তির কারণে সে ভালো মন্দ বিবেচনা না করেই তা খেয়ে ফেলে। যা তার শরীরের জন্য মারাত্মক। এটা থেকে তাকে বাঁচানো যেমন মাতা পিতার কর্তব্য তেমনি জাতিকে বাঁচানো ও সরকার বা দেশের প্রধানের কর্তব্য। সে কারণেই ব ইটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ফলাফল কি?
নিষিদ্ধ তকমা উঠে যাবার পর এই বই পড়ার জন্য মানুষ যেমন মুখিয়ে ছিল আজো দুনিয়াতে তার চলমানতা রয়ে গেছে। অথচ এটি নিতান্ত ই একটা সাধারণ গ্রন্থ।
বাঙালি লেখক বুদ্ধদেব বসু। সময়ের চাইতে এগিয়ে ছিলেন ভদ্রলোক। আমি সবসময় বলি, বুদ্ধদেব বসু না জন্মালে আমাদের এখনো বঙ্কিম বা রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের স্টাইলে গদ্য লিখতে হতো। ভালো কী মন্দ সে আলোচনা অবান্তর। মূল কথা হলো বুদ্ধদেব বসু আমাদের ছোট ছোট বাক্যে গদ্য লেখা শিখিয়েছেন। তাঁর একটা অনুপম উপন্যাসের নাম ‘রাত ভরে বৃষ্টি’। ধারণা করা হয় প্রেমাংশু স্বয়ং বুদ্ধদেব বসু, মালতী তার স্ত্রী প্রতিভা বসু আর জয়ন্ত হলেন নজরুল। ত্রিভুজ প্রেমের এই উপন্যাসটির বিরুদ্ধে নগ্নতার অভিযোগ এনে মামলা করা হয়েছিল। সাময়িক বিধিনিষেধের কবলে পড়েছিল এই উপন্যাস। অথচ তেমন কিছুই ছিল না এতে। আদালত পর্যন্ত গড়ানো এই কাহিনী উপন্যাসটিকে তুলে দিয়েছিল আকাশের উচ্চতায়। নিষিদ্ধ হবার কারণে বা তোপের মুখে পড়ার কারণে পাঠক এটিকে গিলেছে। সমরেশ বসু আমাদের বাংলা সাহিত্যের আরেক দিকপাল। তাঁর যে উপন্যাসটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল সেটি এখনো দাপটের সাথে টিকে আছে। হারিয়ে গেছে অভিযোগ কারী আর নিষিদ্ধ করার কুশিলবেরা।
এগুলো উদাহরণ কিন্তু বাস্তব। আসলে নিষিদ্ধ করার ভেতর যে আগ্রাসন তা যদি নিয়মমাফিক আর যৌক্তিক না হয় সেটা টেকে না। পনের ষোল বছর ধরে প্রবল প্রতাপে দেশ শাসন করা আওয়ামী লীগ জামাতকে নানা ভাবে নিষিদ্ধকরণের ভেতর রেখেছিল। বাস্তবতা এই তারা খোলা মাঠে রাজনীতি করতে পারে নি। যদি এমন হতো যে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা, দেশ বিরোধিতা আর একাত্তর নিয়ে ষড়যন্ত্র করা ব্যতীত তারা রাজনীতি করতে পারতো তা হলে কি আজকের বাস্তবতা দেখা যেতো? যতদূর মনে হয় দেখতে হতো না। বাম কট্টর বামেরা যেমন তাদের এককেন্দ্রিক আদর্শ বিতরণ করে বেড়ায় জামাত ও তাদের ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতির কথা বলে বেড়াতো। মানুষ নিতো কি নিতো না সেটাই হতো বিবেচনার বিষয় । কিন্তু তা হয় নি।
মূল কথা এই, নিষিদ্ধ করণের ভেতর দিয়ে কাউকে বা কোন মতকে বন্ধ করা যায় না। প্রায় ই দেখবেন অমুক লেখক তমুক লেখকের বই নিয়ে হৈ চৈ। সেসব লেখকদের মাথার মূল্য ঘোষণা করা হয় লাখ লাখ টাকা। দু একজন ছাড়া বাকীরা ঠিকই বেঁচে থাকেন। পড়ে দেখে আপনি হতাশ হলেও সে ব ইয়ের কাটতি হয় দুনিয়া মাতানো। অর্থাৎ ব ইটি যাই হোক লেখক হয়ে গেলেন সেলিব্রেটি আর বই পেয়ে গেলো কাঁচা বাজার। এসব জানার পর ও নিষিদ্ধ করার খেলা বা প্রবণতা যায় না। আইন করে বা নিষিদ্ধ করা ইতিহাস দিয়ে সময়ের গতিমুখ বন্ধ করা যায় না। ঠিক যেমন বড় বড় পাথর ফেলে দিলেই পানির স্রোত বা নদীর পথ রুদ্ধ করা যায় না।
আমি রাজনীতি করি না। কোন দল করি না। কিন্তু আমি আমার দেশর মুক্তিযুদ্ধ আর যুদ্ধে অর্জিত মাটি ও মানুষকে ভালোবাসি। সে কারণে আমার ইতিহাস আমার দলিল। এই গর্বের সাথে জড়িয়ে থাকা কোন কিছু কি চাইলেই কি নিষিদ্ধ করা সম্ভব? যদি সম্ভব হতো মাত্র দেড় বছরের পাওয়ার আর ফুলে ফেঁপে ওঠা নায়েকরা তাদের কথা ঘোরাতেন? এখন তারা যা বলছেন তার সারমর্ম পেছনে হাঁটা। এক এক করে দায়িত্ব অস্বীকার আর নিজেকে সাফ সুতোর বলা এই মানুষগুলোকে দেখলেই আপনি বুঝবেন সত্যের শক্তি কতটা প্রবল।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম আসিফ নজরুল ধানমন্ডি ৩২ ভাঙার বিষয়ে নিজের অপারগতার কথা বললেন, এটা না কি ঠিক ছিল না। একটা সরকারের সব লোকজন সিনেমা দেখলেন নাটক দেখলেন বুলডোজার দেখলেন ভাঙ্গা দেখলেন আর এখন বলছেন ঠিক হয় নি । এরপর আপনি বলবেন যে তারা আগের জায়গায় আছেন? অবাক বিস্ময়ে খেয়াল করলাম নিষিদ্ধ বলার পর থেকে সামাজিক মিডিয়ায় স্রোতের মতো পোস্ট। দেশের ভেতরে বাইরে সর্বত্র এক জোয়ার। সে জোয়ারে রাখঢাক ছাড়াই মানুষ লিখছে আমরা অমুকের বা তমুকের লোক। কেন জানি মনে হচ্ছে ভীমরুলের বাসায় ঢিল ছুঁড়েছে কেউ। অথবা ঢিল পড়েছে বন্ধ হয়ে থাকা স্রোতের মুখে। এখন এই অবিরল ধারা বন্ধ করবে কে? এই সমর্থন বা ভালোবাসা নিষিদ্ধ করবে কা‘রা?
নিষিদ্ধ করে সমাধান মেলে না। বরং সবাইকে সুযোগ দিলে যার যা প্রাপ্য তা দিতে পারলেই গণতন্ত্র কাজ করতে পারে। যেটা জিয়াউর রহমানের আমলেও হয়েছিল। বহুদলীয় গণতন্ত্রের নিয়মই হচ্ছে সবার মত ধারণ করা। অবশ্য ই খুনি পাপী বা চোরদের কথা আলাদা। তাদের শাস্তি হতেই হবে। আর নিষিদ্ধের বাইরে রাখতে হবে দেশ ও দেশের রাজনীতি। মঙ্গল হোক এ কথাও লিখতে পারছি না কারণ মঙ্গলও প্রায় নিষিদ্ধ হবার পথে। তবু পহেলা বৈশাখ ও পড়েছিল কি না মঙ্গলবারে। মানুষ কোনটা ফেলে কোনটা রেখেছিল সবাই জানেন। সত্যি এই, মানুষ ভুল করে না। তারা জানেন কখন কোনটা নেবেন কখন বর্জন করবেন।
লেখক : সিডনি প্রবাসী কবি, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।












