তিনদিন পর যাবো দেশে। গত দিন দশেক ধরেই করছিলাম তাই বহুদিন পর নিজেই করছিলাম ঈদ শপিং। করছিলাম একই সাথে স্যুটকেস গোছাগাছ। মানে প্রতি দুই তিন দিন পর পরই, এরই মধ্যে কেনা জিনিসপত্র ঢোকাই স্যুটকেসে। করছিলাম তাই আজো।
রোজার আগে মোহামেদ আল গার যে গিয়েছিল কায়রোতে, ছুটি কাটাতে, ফিরে আসার সময় সে আমাদের পুত্রদের জন্য, মিশরি ট্র্যাডিশনাল দুটো চমৎকার খেলনা লন্ঠন এনেছিল। রোজার সন্ধ্যায় নাকি ঐ লন্ঠনগুলো জ্বালিয়ে হাতে ঝুলিয়ে, পাড়া সরগরম করে ঘুরে বেড়ায় মিশরি বাচ্চারা। শৈশবে যেমন জ্বালাতাম আমরাও তারাবাতি, শবে বরাতের, শবে কদরের সন্ধ্যায় ও চাঁদ রাইতে; ঐরকম আর কি।
স্যুটকেসে ঐ লন্ঠন দুটোকে ভাল করে কাগজ মুড়িয়ে ঢোকাতে গিয়ে, লক্ষ করি জিনিষ চেহারায় মিশরি হলেও, মেইড ইন চায়না। হুম, বাচ্চাদের খেলনা বানাতে গিয়ে চায়নিজরা মিশরী সংস্কৃতিও দেখছি আত্মস্ত করেছে ভালই। এন্টিক ভাবের এ লন্ঠনগুলো দূর থেকে দেখলে তামা বা কাসার বলে ভ্রম হলেও, আসলে তৈরি এগুলো প্লাস্টিকে। চলে ব্যাটারিতে। দেখছি তাতে এগুলোর মধ্যে, মিশরের তাম্রযুগের ঐতিহ্য মিলিয়েছে হাত আধুনিক প্লাস্টিক যুগের বৈশ্বিকবাণিজ্য ব্যবস্থাপনার সাথে!
মোটামুটি সবার জন্যই কেনা হয়েছে নানান কিছু । তারপরও মনে হল এখন ছেলেদের জন্য, খেলনা আর জুতো কিনলেও, যুৎ মতো পাইনি ওদের পোশাক। ইফতারের পর রাস্তায় রাস্তায় যে রকম কার রেসিং শুরু হয়, প্রাণ বাঁচানোর তুমুল তাগিদে সন্ধ্যার পর রিয়াদ মল বা মামালাকা টাওয়ারমুখো হইনা তাই ভুলেও। কপাল ভাল যে হাতের কাছের সুবিশাল গ্রানাডা মলমুখি রাস্তাটা অতো ভয়ানক ব্যস্ত নয়।
গতকালও ইফতারের পর গিয়েছিলাম ঐ মলে। অনেক খুঁজে পেতে, অবশেষে এক দোকান থেকে লাজু আর হেলেনের জন্য যুৎ মতো দু জোড়া জুতো পেয়েছিলাম। সমস্যা হচ্ছে এই যে, দুজনেই ওরা পরে ফ্লাট জুতো। অথচ এখানটায় জয়জয়াকার হল হাইহিলের। তারচেয়েও বড় সমস্যা হল, লাজুর যে রকম বড় মাপের জুতো লাগে, সব ডিজাইনে ঐ সাইজ মিলে না।
গতকাল, আচমকা ঐ জুতোজোড়া পেয়ে যেতেই, দ্রুত পকেট থেকে ওদের জুতোর তলার মাপের দু টুকরো সুতো বের করে ঐ জুতোগুলোর তলায় ধরে গলদঘর্ম হয়ে ভাবছিলাম যখন, লাগবে তো ঠিক ঠিক পায়ে? হঠাৎ করেই সে সময় স্টোরের এক সেলসম্যান বলে উঠেছিল–
“কোন চিন্তা কইরেন না স্যার। লইয়া যান। দেশে গিয়া যদি দেখেন পায়ে লাগতেছে না, তবে ফেরত নিয়া আইসেন।”
অবাক হয়ে বলেছিলাম, দেশী নাকি? অনেক ধন্যবাদ ভাই। তা কতদিনের মধ্যে ফেরত দিতে হবে?
“নাহ,ফেরত নেয়ার কোন নিয়ম নাই। কিন্তু আপনি তো স্যার, দেশী। ঐটা আমি দেখমু । জুতায় লাগানো স্টিকারটা শুধু ঠিক থাকলেই হইব।”
ঐ জুতোজোড়া সুটকেসে ঢোকাতে ঢোকাতে মনে পড়ল এবার, লাজু আর হেলেন দুজনেই বলেছিল আব্বার রুমের জন্য সেফটি এলার্ম জাতীয় কিছু একটা যাতে নিয়ে যাই। আজকালে বেশীরভাগ সময়ই কাটে তার বিছানায়। এরই মধ্যে নাকি একবার বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে যাওয়ার সময় গিয়েছিলেন পড়ে। বাচ্চাদের স্কুল থেকে আনতে যাওয়ায় ছিল না লাজু সেসময় ঘরে। অন্যরুমে থাকা, হেলেনও তা পেয়েছে টের বেশ কিছুক্ষণ পর। ওরকম একটা এলার্ম জাতীয় কিছু একটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে, আব্বার রুমের জন্য!
ঈদ উপলক্ষে আব্বার জন্য মক্কা থেকে একটা তোব মানে সৌদি ড্রেস কিনেছিলাম। প্রায়ই তো দেখি হজ বা ওমরা করে ফিরে যাওয়ার সময়, বাঙ্গালী ঠিকই এক বা একাধিক তোব কিনে নিয়ে যান। আব্বা তো হজ বা ওমরাহ কোনটাই করেননি।
অথচ বছর কয়েক আগে ঢাকার যে পাড়ায় থাকতাম, সে পাড়ার জামে মসজিদের ইমাম কী করে যেন আব্বাকে পটিয়ে ওনার টাকাতেই বদলি হজ করে গেছেন। হজ থেকে ফিরে হুজুর ছোট এক প্যাকেট খেজুর, একটা তজবি আর টুপি হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন আব্বার হাতে। ভীষণ মেজাজ খারাপ হয়েছিল তাতে ঐ হুজুরের উপর। ক্ষেপে গিয়ে তাই বলেছিলাম আব্বাকে, আপনি নিজে গেলেন না কেন হজে?
উত্তরে বলেছিলেন, হুজুর বলেছেন ওনার যা শারীরিক সক্ষমতা, তাতে হজ করতে গিয়ে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর। সেজন্যই আব্বার উচিৎ নিজের বদলে তাঁকেই বদলি হজ করতে পাঠানো।
সেদিন আব্বার কথা শুনেই মনে হয়েছিল প্রথম, এ কার কথা শুনছি! আব্বা কি হঠাৎ করেই ছেলেমানুষ হয়ে গেলেন নাকি? যে হুজুরের কথায় এমন পটে গেলেন!
এখন আব্বার জন্য ঐ বিশেষ এলার্ম যেটা খুঁজেছি গত কয়েকদিন, সে কথা মনে পড়তেই মনে হল নাহ আব্বা আসলেই প্রবেশ করেছেন তাঁর দ্বিতীয় শৈশবে। ব্যাগ গোছাতে গোছাতে ঢেকে গেল এতক্ষইের রৌদ্রকরোজ্বল মন ঢেকে গেল মরু ঝড়ের ধুলোয়!
নাহ, যাই তবে এখন গ্রানাডা শপিং মল থেকে ফেরার পথের, হাতের বাঁয়ে যে একটা তিন না চার তলা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর আছে, ওটাতে। ওখানে তো ঢু মারিনি কখনো। দেখি তো গিয়ে, পাই কী না ওখানে আব্বার দ্বিতীয় শৈশবের জন্য ইদ উপহার, ঐ সিকিউরিটি এলার্ম!
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।











