ইয়াবা, সহিংসতা ও আমাদের সামাজিক সংকট

মো. শাহরিয়ার হোসেন শিমুল | রবিবার , ২৪ মে, ২০২৬ at ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ আজ এক অস্বস্তিকর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা উল্টালেই ভেসে ওঠে শিশু ধর্ষণের বিবরণ, নারী নির্যাতনের খবর, পারিবারিক হত্যাকাণ্ড কিংবা এমন সব নৃশংস ঘটনা, যা পড়তে গিয়ে মন আঁতকে ওঠে। বিবেকসম্পন্ন মানুষ মাত্রই প্রশ্ন করেনএই অবক্ষয়ের শিকড় কোথায়? এই সহিংসতার উৎস কী? এবং স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় ঘুরে আসে একটি নামইয়াবা। প্রশ্নটি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু উত্তরটি যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবতা ততটা সরলরৈখিক নয়।

ইয়াবা কী এবং এটি মানুষকে কীভাবে বদলে দেয় : ইয়াবা মূলত মেথঅ্যামফেটামিন ও ক্যাফেইনের সমন্বয়ে তৈরি একটি শক্তিশালী উত্তেজক মাদক, যা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বিশেষভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি সেবনের পরপরই মস্তিষ্কে ডোপামিনের অস্বাভাবিক ঢেউ তৈরি করে ব্যক্তি অনুভব করেন এক অলীক আনন্দ, অদম্য শক্তি এবং অতিমাত্রার আত্মবিশ্বাস। কিন্তু এই উত্তেজনার পেছনে লুকিয়ে থাকে ভয়াবহ ক্ষতি। ধীরে ধীরে ব্যক্তির বিচারশক্তি কমে আসে, আবেগের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয় এবং ক্রোধ, সন্দেহপ্রবণতা ও আগ্রাসন ভেতর থেকে জেগে ওঠে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, দীর্ঘ মেয়াদি মেথঅ্যামফেটামিন ব্যবহার মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এই অংশটিই মূলত নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সহানুভূতির কেন্দ্র। ফলে একজন নিয়মিত ইয়াবাসেবী ধীরে ধীরে সেই মানবিক বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেন, যা তাকে অন্যায় থেকে বিরত রাখত। অতিরিক্ত যৌন উত্তেজনা, প্যারানয়া, হিংস্র মেজাজএই লক্ষণগুলো ইয়াবাসেবীর মধ্যে অহরহ দেখা যায়। এই অবস্থায় যে ব্যক্তি আগে থেকেই নৈতিকভাবে দুর্বল বা অপরাধপ্রবণ, তার পক্ষে ভয়ংকর কিছু করে ফেলা অনেক সহজ হয়ে পড়ে।

তবু সরলীকরণ বিপজ্জনক : কিন্তু এখানেই থামা দরকার। সমাজে যত ধর্ষণ হচ্ছে, যত হত্যাকাণ্ড ঘটছে তার সবকিছুর দায় ইয়াবার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে সৎ নয়। কারণ অপরাধ কখনো একক কোনো উৎস থেকে জন্ম নেয় না। এর পেছনে থাকে সামাজিক বৈষম্যের দীর্ঘ ইতিহাস, পারিবারিক ভাঙন, শৈশবের ক্ষত, বেকারত্বের হতাশা, নৈতিক শিক্ষার অনুপস্থিতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার ছায়ায় লালিত অপরাধীদের দাপট। সমাজের ভেতরে যে নীরব ক্ষয় : আমাদের সমাজে আরও একটি উদ্বেগজনক পরিবর্তন ঘটছে, যেটি সংখ্যায় ধরা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায়। মানুষ ধীরে ধীরে সহিংসতার প্রতি অসংবেদনশীল হয়ে পড়ছেন। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন যে পরিমাণ বিকৃত বিনোদন, নারীর পণ্যায়ন এবং নৈতিকতাবিবর্জিত কন্টেন্ট ছড়িয়ে পড়ছে, তা নতুন প্রজন্মের একটি অংশের মূল্যবোধকে নিঃশব্দে ক্ষয় করছে। এই ক্ষয়িষ্ণু মানসিকতার মানুষটি যখন ইয়াবার সংস্পর্শে আসেন, তখন তার ভেতরের শেষ বাধাটুকুও ভেঙে পড়ে। পরিবারও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। যে পরিবারে সন্তানের কথা শোনার মানুষ নেই, যেখানে বাবামায়ের সম্পর্ক টানাপোড়েনে ভরা, যেখানে শিশু বড় হয় অবহেলা বা সহিংসতার মধ্যেসেখানে মাদকের দিকে হাত বাড়ানো অনেকটাই সময়ের ব্যাপার মাত্র। ইয়াবা তখন পলায়নের পথ হয়ে দাঁড়ায় এবং সেই পলায়ন শেষ পর্যন্ত গভীর সংকটে পরিণত হয়।

সমাধানের পথ : সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি : এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ তাই কেবল মাদকবিরোধী অভিযানে সীমাবদ্ধ নয়। অভিযান দরকার, কিন্তু শুধু অভিযানে মূল সমস্যার সমাধান হয় নাকারণ সরবরাহ বন্ধ হলেও চাহিদা তৈরির যে সামাজিক উপাদানগুলো রয়েছে, সেগুলো অক্ষত থাকে।

প্রয়োজন পরিবারের ভেতর থেকে সচেতনতা তৈরি, যেখানে অভিভাবকরা সন্তানের জীবনে সক্রিয় ও সংবেদনশীল উপস্থিতি রাখবেন। প্রয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার পুনরুজ্জীবন। প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ মানুষের নাগালে আনা, কারণ মাদকাসক্তির শিকড় প্রায়ই অমীমাংসিত মানসিক যন্ত্রণায়। প্রয়োজন দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, যাতে অপরাধী জানে যে কোনো পরিচয়ের আড়ালেই সে লুকিয়ে থাকুক, শাস্তি তার কাছে পৌঁছাবেই।

শেষ কথা : একটি সভ্য সমাজ কেবল আইনের জোরে টিকে থাকে না। টিকে থাকে মানুষের বিবেক, ন্যায়বোধ এবং একে অপরের প্রতি দায়িত্ববোধের ওপর ভর করে। ইয়াবার বিরুদ্ধে লড়াই তাই শুধু একটি মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়এটি আসলে আমাদের ভেতরের মানবতাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। এই লড়াইয়ে রাষ্ট্র একা যথেষ্ট নয়; পরিবার, সমাজ, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক সকলকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক: নেটওয়ার্ক অফিসার, বাংলাদেশ মাদকাসক্ত চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (বারাকা)

পূর্ববর্তী নিবন্ধশেষ কবে
পরবর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে