বাংলাদেশের চারদিকে হিংসার চাষ হচ্ছে! এ সময়ে করণীয় কী!

মেজর মোঃ এমদাদুল ইসলাম (অবঃ) | রবিবার , ১৭ মে, ২০২৬ at ৬:১১ পূর্বাহ্ণ

নাগরিক অধিকার আন্দোলনের পুরুধা পুরুষ মার্টিন লুথার কিং। ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটনের লিংকন মেমোরিয়ালের পাদদেশে দাঁড়িয়ে লক্ষ মানুষের সমাবেশে তার বিখ্যাত ড্রীম স্পীচ এ উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন

When we let freedom

When we let it ring from every village

and every hamlet, from every state and every city

We will be able to speed up that day

When all of God’s Children, black men and

White men,

Will be able to join hands

And sing in the words of the old Negro spiritual

Free at last, free at last.

Thank God almighty, we are free at last.

লুথার কিং এর এ বক্তব্যের সারর্মম, যখন আমরা মুক্তির আনন্দে উদ্ভাসিত হব, যখন স্বাধীনতার ধ্বনি বেজে উঠবে প্রতিটি শহর, বন্দর, জনপদে তখন ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে স্রষ্টার সব সৃষ্ট মানুষ উচ্চসিত উদ্ভেলিত কণ্ঠে গেয়ে উঠবে, অবশেষে আমরা মুক্ত স্বাধীন। স্রষ্টা তোমার কাছে আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা, আমরা অবশেষে স্বাধীন হলাম বলে।

আজ পৃথিবীর কোটি মানুষ আশা করে মার্টিন লুথারের দেখানো আলোর পথ ধরে এ পৃথিবীর সভ্য মননশীল মানুষেরা আরো এক কদম এগিয়ে গিয়ে ঘোষণা করবে, মুক্তির ধ্বনি বেজে উঠুক ইরাকে, আফগানিস্তাানে, ফিলিস্তিনে, আফ্রিকায়, এশিয়ায়, ল্যাটিন আমেরিকায়।

এ মুক্তি ক্ষুধা দারিদ্র্য থেকে, যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে, অশিক্ষা অস্বাস্থ্য থেকে, শোষণ আর বঞ্চনা থেকে।

কিন্ত্তু এত হয়নি বরং পৃথিবীর দিকে দিকে মানুষেরা এখন ক্ষুধায়, স্বাস্থ্যহীনতায়, যুদ্ধ বিগ্রহ, দুর্দশা, দুর্ভাবনার হতাশায় নিমজ্জিত। সামন্তবাদ, সাম্‌্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ এসব নানা বাদ মানুষকে নিষ্পেষণ করে এসেছে যুগে যুগে। দুর্ভাগ্য এমনকি আমেরিকার মত জ্ঞানে বিজ্ঞানে অগ্রসরমান একটি দেশ সে দেশের মানুষের প্রতিদিনের জীবন যাপনে অশেষ দুর্গতি সৃষ্টি করে যুদ্ধের পিছনে ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। ইউরোপ যুদ্ধের পিছনে সময় এবং অর্থ দুটিই ব্যয় করছে অকাতরে, চীন, রাশিয়া এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি অস্ত্রের পিছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে চলেছে যুদ্ধ প্রস্ত্তুতিতে। এসব প্রস্ত্তুতির সবচেয়ে বেশি খেসারত দিতে হয় আমোদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে, খাদ্য, জ্বালানী, উৎপাদন উপকরণের মূল্য বৃদ্ধিতে, কর্মসংস্থান হারানোর মত মানবিক দুর্গতিতে।

এসব বৈশ্বিক দুর্যোগ দুর্বিপাকের পাশাপাশি ধর্ম আশ্রিত এক ধরনের সাম্প্রদায়িক বিষ বাস্প ছড়ানো রাজনীতি এবং হিংসার মেঘ এখন আমাদের সীমান্তে। সাম্প্রতিকের পশ্চিম বঙ্গ এবং আসামের র্ন্বিাচন ঘিরে ক্ষমতা দখল এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার উদ্দেশ্য সাধনে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি যেভাবে ধর্মীয় উগ্রবাদের আশ্রয় গ্রহণ করেছে তা এক কথায় ভারতের মত একটি গণতান্ত্রিক দেশে অকল্পনীয় এবং অশ্রুতপূর্ব।

৬ ডিসেম্বর ১৯৯২ সালে অযোধ্যায় বাবরী মসজিদ ভাঙা এবং ২২ জানুয়ারি ২০২৪ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদি’র ঘটা করে অযোধ্যায় বাবরী মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির উদ্বোধন করার মাধ্যমে ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান।

এই উত্থানের বিরুদ্ধে পশ্চিম বঙ্গের তৎকালীন মুখ্য মন্ত্রী শ্রীমতি মমতা বন্দোপাধ্যায় রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। রাম মন্দিরের উদ্বোধনী দিনে অযোধ্যা থেকে প্রায় ৯২১ কিঃ মিঃ পূর্বে তিনি কলকাতায় সর্ব ধর্মীয় সম্প্রীতি শোভাযাত্রা বের করেছিলেন। আসামের এন আর সি উদ্ভূত পরিস্থিতিতেও সে সময়ে শ্রীমতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সোচ্চার কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন ‘অসমের অসভ্যতা বন্ধ করা হউক’। এখন দেখা যাচ্ছে শ্‌্রীমতি মমতা বন্দোপাধ্যায় তার সে প্রচেষ্টায় হেরে গেছেন। এ হারার পিছনে কলকাঠি নাড়া হয় বিজে পি’র কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক দিল্লী থেকে। কায়দা করে তারা পশ্চিম বঙ্গে চালু করে এস আই আর’ (স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন)। এই ‘এস আই আর’ এর উদ্দেশ্য ঘোষণা করা হয় মৃতদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া, ভুল থাকলে সংশোধন করা। এটা করতে গিয়ে এই ‘এস আই আর’ এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন প্রায় ৯০(নব্বই) লক্ষ ভোটারকে ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দেয়। বলাবাহুল্য এদের গরিষ্ঠ সংখ্যক তথা প্রায় সবাই মুসলমান। ভারতীয় লোকসভায় তৃণমূলের সদস্য শ্রী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী এদের মাঝে প্রায় ২৭ (সাতাশ) লক্ষ তাদের ভারতীয় পাসপোর্ট সহ ভোটার লিস্টে পুনঃতালিকাভুক্তির আবেদন করলেও কোন ফল হয়নি। তার বক্তব্য বি জে পি এবং তৃণমূলের ভোট পার্থক্য ৩২ (বত্রিশ) লক্ষ, পুন: ভোটার তালিকায় অন্তভুুর্ক্তির প্রতিকার চেয়ে আবেদন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে অপেক্ষমাণ ভোটার আছেন ৩৫(পঁয়ত্রিশ) লক্ষ। এসব বিষয় সুরাহা অবশ্য ভারতীয়দের।

তবে ভারতীয় ধর্মীয় উগ্রবাদ যে পশ্চিম বঙ্গতেও ছড়ানো হচ্ছে তা ৯ মে ২০২৬ শপথ নেওয়া মুখ্যমন্ত্রী বাবু শুভেন্দু অধিকারীর নির্বাচন প্রচারকালীন কিছু বক্তব্য বিচার করলে স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পায়। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত ভারতীয় প্রচার মাধ্যম ‘দি ওয়্যার’ যে প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন করেছে তার কয়েকটি উল্লেখ করলে পাঠক হতবাক হয়ে পড়বেন। যেমন তার এক বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশকে ইঙ্গিত করে বলেছেন ‘A lesson must be taught. Like Israel did in Gaza’. ইসরাইল গাজায় যা করছে বাংলাদেশকেও তেমন শিক্ষা দেওয়া উচিৎ। অপর এক বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেছেন ‘Every Hindu hosehold must put up a flag. Completely separate out these jihadi fundamentalists here’ এ বক্তব্যে মুসলিমদের জিহাদি উল্লেখ করে প্রতিটি হিন্দু বাড়িতে স্বতন্ত্র পতাকা উড়ানোর জন্য তিনি আহবান জানিয়েছেন। তিনি সাম্প্রদায়িকতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটান তার এই বক্তব্যের মাঝে, মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন ‘ধর্ম পরিবর্তন করতে হবে’। নির্বাচনী প্রচারণায় তার শ্লোগান ‘বাংলার হিন্দু এক হও এক হও’। এসব সচেতন মানুষকে কি বার্তা দেয়। ক্ষমতার মোহ কীভাবে মানুষকে অন্ধ করে, বিবেককে আচ্ছন্ন করে, মানুষকে হেয় করার, ছোট করার প্রবৃত্তি এসব বক্তৃতা বিবৃত পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সম্প্রতি আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর উপর ওয়াশিংটন পোস্ট’ এর সাংবাদিক মাইকেল কার্নিশ এবং মার্ক ফিশার রচিত বই TRUMP REVEALED পড়া শুরু করেছি, এ বই এর ভূমিকায় লেখা এ কথাগুলো একজন রাজনৈতিক নেতার মনোজগত বা তার ভবিষ্যৎ কার্যকলাপ নির্ণয়ে উল্লেখযোগ্য বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, the Washington Post explore the lives and careers of the presidential nominees, The idea is to learn as much as possible about how the candidates think, decide and act, to examine their past in order to glean how they might behave in the future. এর সারর্মম হল ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা প্রেসিডেন্ট পদ প্রার্থীদের জীবন এবং কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, যাতে যত সম্ভব তার অতীত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কীর্তিকলাপ পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ এ তিনি কি রকম আচরণ করবেন তা আঁচ করা যায়। এ বক্তব্যের আলোকে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্য মন্ত্রী বাবু শুভেন্দু অধিকারীর অতীত থেকে তার বর্তমান আচরণ একেবারে স্পষ্ট।

এক সময়ের ভারতীয় পররাষ্ট্র সচীব শ্রী স্যাম শরন, তিনি মায়ানমারে যখন রাষ্ট্রদূত তখন আমি ঐ দেশের সিটওয়েতে আমাদের মিশন প্রধান। সেই সূত্রে আমার শ্রী স্যাম শরন’ এর সাথে একটি উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ইতিমধ্যে তিনি চমৎকার একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম ‘How India Sees The World – Kautilya To 21st Century’ বইটির এক জায়গায় তিনি উল্লেখ করেছেন ‘In Creation India has spread colors sound and flavours and local genius in South East Asia created their own’ অর্থাৎ ‘সৃষ্টিতেনির্মাণে ভারত রং, সুর আর সুবাস ছড়িয়েছে, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রতিভাবানরা এ থেকে নিজ নিজ সৃষ্টি আর নির্মাণে নিজেদের যুক্ত করেছেন’। এ অভিজ্ঞানের আলোকে এখন হয়ত সময় এসেছে ভারতীয়দের অবস্থান বিবেচনার। শ্রী স্যাম শরন এখন এই ভেবে হয়ত কষ্ট পাবেন, ভারত এখন কী রঙ কী সুবাস ছড়াচ্ছে ভেবে!

ভারতীয় সাংবাদিক ইবঃধি ঝযধৎসধ’র রাম মন্দির নিয়ে লেখার একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি।

If you celebrate while some one else in pain, something is broken in our society. We feel hopeless and cheated’ এ কথার মর্মার্থ– ‘কারো বেদনার উপর তুমি যখন উৎসবে মত্ত তখন বুঝে নিতে হবে আমাদের সমাজের কোথাও ভাঙন ধরেছে। এ থেকে বঞ্চনা আর আশাহীনতা আমাদের পেয়ে বসেছে’। (চলবে)

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব; সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপিরিতি : মানবতা ও প্রকৃতির সেতুবন্ধন