যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার বড্ড বেকায়দায় আছেন। হাতি কাদায় পড়লে যে দশা হয়, স্টারমারের দশা তার চাইতে ভিন্ন নয়। দলের বাইরে তো বটেই ভেতরেও তার পদত্যাগ দাবি সোচ্চার হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যে দলের ৮৩ এমপি তার পদত্যাগ দাবি করেছেন। যারা তার এই পদত্যাগের দাবি করছেন তাদের অভিযোগ– কিয়ার স্টারমারের দুর্বল নেতৃত্বের কারণে সমপ্রতি অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি গো–হারা হেরেছে। তাদের মতে ক্ষমতাসীন দলের এই ঐতিহাসিক পরাজয় কিয়ার স্টারমারের মেয়াদের ক্রমবর্ধমান অজনপ্রিয়তার প্রতিফলন। বেচারা কিয়ার স্টারমারের ভাগ্য মন্দ। মাত্র দুই বছর আগে বিপুল ভোটে মধ্য–ডানপন্থী টোরি দলকে (কনজারভেটিভ পার্টি) হারিয়ে তিনি তার মধ্য–বামপন্থী, লেবার পার্টিকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে ক্ষমতায় আনেন। কিন্তু গত দুই বছরে দেশের দুর্বল অর্থনীতি, বহুল আলোচিত ও নিন্দিত জেফরি এপস্টেইনের সাথে সম্পর্কযুক্ত এক ব্রিটিশ রাজনীতিবিদকে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়া নিয়ে সৃষ্ট তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া, দেশে ইহুদি–বিদ্বেষের ব্যাপক বৃদ্ধি ইত্যাদি মিলে তিনি প্রচন্ড সমালোচনার ও আক্রমণের মধ্যে ছিলেন। আর তার খেসারত দিতে হয়েছে গোটা দলকে। গেল সপ্তাহের আঞ্চলিক নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি অন্য যে কোন দলের চাইতে বেশি আসন হেরেছে। এই নির্বাচনে লেবার পার্টি প্রায় ১৫০০ কাউন্সিলর–আসন হারায়। লেবার দল যখন পদে পদে হোঁচট খাচ্ছে তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরম মিত্র এবং ব্রেক্সিট আন্দোলনের মূল ব্যক্তি, নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী পপুলিস্ট দল, ‘রিফর্ম ইউকে‘ ভূমিধস বিজয় ছিনিয়ে আনে। পাশাপাশি অন্যান্য দল, বিশেষ করে বামপন্থী গ্রিন পার্টিও উল্লেখযোগ্য আসন জয় লাভ করে।
স্টারমারের বিরুদ্ধে দলের ভেতর–বাইরে অনেক আগে থেকেই অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। বেশ কয়েক মন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন। সমালোচনা যখন তুঙ্গে তখন তিনি কয়েক সরকারি কর্মকর্তাকে হয় পদত্যাগে বাধ্য করছেন, না হয় ছাঁটাই করেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে তিনি তাদের বলির পাঁঠা বানান। দলের ভেতরে তার পদত্যাগের যে–দাবি তা তীব্র রূপ ধারণ করে স্থানীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পর। তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা তাকে পদত্যাগের একটি সময়সূচি ঘোষণা করার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু স্টারমার ‘ডিফায়েন্ট‘- তার অবস্থান অনেকটা ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী‘। তিনি কোনোভাবেই হার মানতে রাজি নন এবং পদত্যাগ না করার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা দেন। নেতৃত্বের যে কোন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করারও ঘোষণা দেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি সরে না যাওয়ার এবং আমাদের দেশকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে না দেওয়ার দায় নিচ্ছি, যেমনটা টোরিরা (কনজারভেটিভ পার্টি) বারবার করেছে, যে বিশৃঙ্খলা এই দেশের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করেছে। কোনো লেবার সরকার যদি আমাদের দেশের ওপর আবারও এমনটা চাপিয়ে দেয়, তবে তাকে কখনোই ক্ষমা করা হবে না।‘ তিনি আরও বলেন, ‘আমি জানি যে ব্রিটেনের অবস্থা নিয়ে মানুষ হতাশ, রাজনীতি নিয়ে হতাশ, এবং কেউ কেউ আমার ওপরও হতাশ। আমি জানি আমার সমালোচক আছেন। তবে আমি জানি আমাকে তাদের ভুল প্রমাণ করতে হবে এবং আমি তা করব।‘
তিনি একহাত দেখে নিয়েছেন নাইজেল ফারাজকেও। স্থানীয় নির্বাচনে তার দলের শোচনীয় পরাজয়ের পর কিয়ার স্টারমার এক ‘বিস্ফোরক‘ ভাষণে ডানপন্থী নেতা নাইজেল ফারাজকে ‘একজন প্রতারক ও সুযোগ সন্ধানী‘ বলে তীব্র আক্রমণ করেন। স্যার স্টারমার বলেন, ‘আমি আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই নাইজেল ফারাজ ‘ব্রেক্সিট‘ নিয়ে কী বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ব্রেক্সিট আমাদের আরো ধনী করবে। ভুল, ব্রেক্সিট আমাদের আরো গরিব করছে। নাইজেল বলেছিলেন, ব্রেক্সিট ইমিগ্রেশন (অভিবাসন) কমাবে। ভুল। অভিবাসন আকাশচুম্বী হয়ে গিয়েছিল। নাইজেল বলেছিলেন, ব্রেক্সিট আমাদের আরো সুরক্ষিত করবে। আবারো ভুল। ব্রেক্সিট আমাদের দুর্বল করেছে।‘ নিজের অবস্থান নিয়ে তিনি এই প্রসঙ্গে বলেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে তিনি আরো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাবেন। বেচারা কিয়ার স্টারমার ! ক্ষমতা ধরে রাখতে তিনি যতটা মরীয়া হয়ে উঠেছেন, দলীয় নেতা ও এমপিদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন, ততই যেন ক্ষমতা তার হাত থেকে পিছলে যাচ্ছে। শেষ রক্ষা বোধকরি হবেনা। কেননা ১১ মে পর্যন্ত ৭০ দলীয় এমপি তার পদত্যাগ দাবি করে তিনি কখন পদত্যাগ করবেন এই ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট দিনতারিখ ঘোষণা দেবার দাবি জানিয়েছিলেন। আর আজ (১৩ মে) এই লেখা যখন লিখছি তখন বিবিসি–র সংবাদে দেখলাম আরো ১৩ এম পি অর্থাৎ এই পর্যন্ত মোট ৮৩ এম পি প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করছেন। ‘দ্য গার্ডিয়ান‘ পত্রিকার মতে, ইতিমধ্যে দলের যে সকল স্টলওয়ার্ড বা শক্তিশালী নেতা পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি এবং উপ প্রধানমন্ত্রীই ডেভিড ল্যামি। আজ দেখা গেল সেইফগার্ডিং মন্ত্রী মিস জেস ফিলিপস পদত্যাগ করেছেন। এর আগে পদত্যাগ করেছিলেন ধর্ম ও সমপ্রদায় বিষয়ক মন্ত্রী মিয়াট্টা ফানবুলেহ। মাত্র দুবছর আগে ২০২৪ সালে মন্ত্রিসভায় যোগদান করা জুনিয়র মন্ত্রী, মিয়াট্টা ফানবুলেহ সামাজিক মাধ্যমে পোস্টকরা তার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন, ‘সরকার ভোটারদের কাছে যে দৃষ্টিভঙ্গি, গতি এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণ আর বিশ্বাস করছে না যে স্টারমার দেশের প্রয়োজনীয়–পরিবর্তন আনতে পারবেন।‘ তাই তিনি প্রধানমন্ত্রীকে একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান, যাতে নতুন নেতৃত্ব লেবার পার্টির প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারে।
ব্রিটেনের মত সত্যিকার গণতান্ত্রিক চর্চার দেশে ক্ষমতা ও গদি বড় পিচ্ছিল। সামান্যতম এদিক–ওদিক হলে গদি নড়বড়ে হয়ে উঠে। স্টারমারের গদি এই প্রথম যে নড়বড়ে হয়ে উঠলো তা নয়। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে স্কটল্যান্ডে লেবার পার্টির নেতা আনাস সারওয়ার, স্টারমারকে পদত্যাগের আহ্বান জানালে মন্ত্রিসভার সদস্যরা একযোগে তার সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন। এখন সে পরিস্থিতি নেই। তার মিত্রের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। এখন ডাক উঠেছে লেবার দলে নুতন নেতৃত্বের। ইতিমধ্যে বেশ কটি নাম শোনা যাচ্ছে যারা স্টারমারের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ দেবেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। এরা হচ্ছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ, সশস্ত্র বাহিনী মন্ত্রী আল কার্নস। এর বাইরে যে নামটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে তা হলো, স্বাস্থ্য মন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং। বলা হচ্ছে যে, স্বাস্থ্য সচিব নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত এবং এই মুহূর্তে এই প্রতিযোগিতা থেকে তিনিই লাভবান হবেন। দলীয় নেতৃত্বের দৌড়ে আরো যে কটি নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন, প্রাক্তন উপনেতা এঞ্জেলা রেনার, যদিও বা তিনি এখনো তা নিশ্চিত করেননি। তাতে কী ! তার মিত্ররা বলছেন, তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র, অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যে দলের নেতৃত্বের চেষ্টা করছিলেন তা স্পষ্ট ছিল। কেননা লেবার পার্টির সম্মেলনের আগে তিনি সরকারের সমালোচনা করেন এবং নিশ্চিত করেন যে, যদি কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় তিনি স্টারমারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেন। তবে সেই জন্যে তাকে প্রথমে এমপি হিসাবে নির্বাচিত হতে হবে। ফলে তার প্রধান মন্ত্রী হবার সম্ভাবনা বর্তমানে কম। এছাড়া পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তরের প্রাক্তন সংসদীয় উপমন্ত্রী, ক্যাথরিন ওয়েস্ট প্রতিযোগিতায় নামতে পারেন বলে অনুমান করা হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় নির্বাচনে দলের শোচনীয় পরাজয়ের পর নিজের অবস্থানকে সুসংহত করার প্রচেষ্টায় প্রধান মন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন এবং সাবেক উপনেতা হ্যারিয়েট হারম্যানকে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার পদে নিয়োগ দিয়েছেন। ব্রাউনকে প্রধানমন্ত্রীর বৈশ্বিক অর্থবিষয়ক বিশেষ দূত পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং হারম্যানকে নারী ও বালিকা বিষয়ক উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তবে তার গদি–রক্ষার এই প্রচেষ্টা কতটুকু কাজ দেবে কিংবা আদৌ দেবে কিনা তা হলফ করে বলা যাচ্ছে না এই মুহূর্তে। ‘সামনে যাই থাকুক ট্রেন চলবেই‘- তেমনি স্টারমারের কথাবার্তা। তিনি শেষ লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। ‘দ্য গার্ডিয়ানে‘ প্রকাশিত এক নিবন্ধে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার লিখেছেন: ‘ভোটাররা আমাদের যে বার্তা দিয়েছেন, তার প্রতি আমাদের সাড়া দিতেই হবে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমাদের ডান বা বাম দিকে ঝুঁকতে হবে। এর অর্থ হলো, একটি ব্যাপক রাজনৈতিক আন্দোলনকে এক করা, আমাদের মূল্যবোধের বিষয়ে দৃঢ় থাকা, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সাহসী হওয়া এবং জনগণের দাবি পূরণ করা। বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্যবদ্ধ হওয়া– এটাই আমাদের দলের জন্য সঠিক পন্থা এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটাই আমাদের দেশের জন্য সঠিক পন্থা।‘ এখন দেখার বিষয় তার এই বার্তা দলের বিদ্রোহীদের মধ্যে কতটুকু সাড়া পায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে খুব একটা কাজ হবেনা। অবাক হবোনা যদি এই লেখা শনিবার ১৬ মে প্রকাশিত হবার আগেই স্যার কিয়ের স্টারমারকে ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট ত্যাগ করতে হয়। তবে এও মানতে হবে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কোন কিছু নেই। (১৩–০৫–২০২৬)
লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট।













