জুম’আর খুতবা

কুরআন ও হাদীসের আলোকে হজ ও ওমরা আদায়ের ফযীলত

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ১৫ মে, ২০২৬ at ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ

প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা! আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন! জেনে রাখুন, হজ একটি ফরজ ইবাদত ইসলামের বুনয়াদের একটি অন্যতম ভিত্তি। ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের মধ্যে হজ্ব হলো দৈহিক ও আর্থিক ইবাদত। হজ শব্দের আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা বা সংকল্প করা, শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহ ও তদীয় রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে শরীয়তের বিধান অনুসারে নিদ্দিষ্ট সময়ে নিদ্দিষ্ট স্থান তথা বায়তুল্লাহ শরীফ ও সংশ্লিষ্ট বরকতময় স্থান সমূহ যিয়ারত করার সংকল্প করাকে হজ্ব বলা হয়। (ফতোওয়ায়ে শামী, ২য় খন্ড)

পবিত্র কুরআনের আলোকে হজ্বের গুরুত্ব:

হজ্ব একটি ফরজ ইবাদত। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ আছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সে ঘরের হজ্ব করা তার উপর ফরজ এবং কেউ প্রত্যাখ্যান করলে সে জেনে রাখুক আল্লাহ বিশ্ব জগতের মুখাপেক্ষী নন। (আল কুরআন, :৯৭)

বিশ্বের মুসলমানদের ঈমান ইসলামের প্রানকেন্দ্র পবিত্র মক্কানগরীতে অবস্থিত আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহ শরীফ মুসলমানদের প্রধান আকর্ষন। পবিত্র মক্কার বরকত মন্ডিত ভূখন্ডে অবস্থিত কা’বা গৃহই পৃথিবীর সর্বপ্রথম নিমির্ত ঘর। সর্বপ্রথম মসজিদ “মসজিদুল হারাম”। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, মানব জাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর নির্মিত হয়েছিল তা মক্কায় যা বরকতময়। (বিশ্ব জগতের দিশারী, :৯৬)

ওমরা প্রসঙ্গ:

শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের উদ্দেশ্যে যিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত এই পাঁচদিন ব্যতীত বছরের যে কোন সময় অনির্দিষ্ট সময়কালে নির্দিষ্ট ক্রিয়াপদ্ধতি সহকারে মক্কা শরীফে গিয়ে বায়তুল্লাহ্‌ শরীফের যিয়ারতের সংকল্প করার নাম হলো ওমরা। মাসজিদুল হারামের চারদিকের নির্দিষ্ট সীমানা হলো হারামে মক্কা বা হারাম শরীফ।

হাদীস শরীফের আলোকে হজ্ব ও ওমরা আদায়ের গুরুত্ব: হজ্ব ও ওমরা আদায়ের ফযীলত সংক্রান্ত অসংখ্য হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে, নিম্নে কয়েকটি হাদীস শরীফ উপস্থাপন করার প্রয়াস পাচ্ছি।

হযরত আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা পরপর একত্রে হজ্ব ও ওমরা করো। কেননা হজ্ব ও ওমরা দারিদ্র্য ও গুনাহ্‌ দূরীভূত করে। যেমন হাপরের আগুনে লোহা ও সোনা রূপার ময়লা দূরীভূত হয়। মকবুল হজ্বের প্রতিদান জান্নাতি ছাড়া কিছু নয়। (তিরমিযী শরীফ, হাদীস৮১০)

হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন মকবুল হজ্বের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া কিছু নয়। আর দু’টি ওমরা তার মধ্যকার গুনাহ্‌সমূহের কাফফারা স্বরূপ। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস: ৯৯৪১)

মক্কার হারাম শরীফ ফযীলতমণ্ডিত হওয়ায় এখানে যা করা যাবে না: . হেরেম শরীফে অমুসলিমদের প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে নিষেধ। ২. অপবিত্র অবস্থায় হেরম শরীফে প্রবেশ নিষেধ, . এখানে যে কোনো প্রকার প্রাণী জীব জন্তু শিকার করা নিষেধ, . এখানকার বৃক্ষরাজির পাতা, তৃণলতা কাটা, এমনকি ছেঁড়াও নিষেধ এবং ৫. হেরম শরীফের সীমানায় ঝগড়া ফ্যাসাদ, বিবাদবিসম্বাদ করা যাবে না। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন। যে ব্যক্তি হজ্ব করে এবং পরে কোনরূপ অশ্লীল ও অন্যায় আচরণ না করে তবে তাঁর পূর্ববর্তী গুনাহ্‌সমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। (তিরমিযী শরীফ, হাদীস৮১১)

হজ্ব ও ওমরার সংশ্লিষ্ট প্রতিটি আমল ফযীলতপূর্ণ: তালবিয়া পাঠ করার ফযীলত প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে, হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন হজ্ব সর্বোত্তম? নবীজি বললেন, যে হজ্বে উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করা হয় ও কুরবানী করা হয়। সে হজ্ব উত্তম। (তিরমিযী, হাদীস৮২৭)

মক্কা মুআজ্জামায় পবিত্র ক্বা’বা শরীফ দেখা মাত্র এ তালবিয়া পাঠ করবেন। “আমি হাজির, হে আল্লাহ্‌ আমি হাজির, আমি হাজির, তোমার কোনো শরীক নেই, আমি হাজির, নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও নি’মাতরাজি তোমারই জন্য। সকল রাজত্ব তোমারই জন্য। তোমার কোনো অংশীদার নেই।”

জান্নাতী পাথর হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার ফযীলত: হাজরে আসওয়াদ অর্থ কালো পাথর, খানায়ে কা’বার পূর্ব দক্ষিণ কোণে বুক সমান উঁচু করে দেয়ালের সাথে এ পাথর সেঁটে দেয়া হয়েছে। চারদিকে রূপা দিয়ে মোড়ানো তাওয়াফের সময় একে চুম্বন করতে হয়। হাজরে আসওয়াদ মাতাফ (তাওয়াফের জায়গা) থেকে দেড় মিটার উপরে স্থাপিত এটি কা’বা শরীফ সাতবার চক্কর দেওয়ার শুরুর স্থান। প্রতিবার তাওয়াফ করার সময় এ হাজরে আসওয়াদে চুম্বন করতে হয়, ভীড়ের কারণে না পারলে চুমুর ইশারা করলেও আদায় হয়ে যাবে। হাজরে আসওয়াদ কিয়ামতের দিন কথা বলবে। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, হাজরে আসওয়াদ হলো জান্নাতের পাথর। পাথরটি দুধের চেয়েও বেশি সাদা ছিল। কিন্তু আদম সন্তানের গুনাহ্‌ একে কালো করে দিয়েছে। (তিরমিযী শরীফ: হাদীস৮৭৭)

হাজরে আসওয়াদের ফযীলত সম্পর্কে আরো এরশাদ হয়েছে, হযরত আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আল্লাহ্‌ অবশ্যই কিয়ামতের দিন হাজরে আসওয়াদকে উত্থিত করবেন, তার দু’টি চোখ থাকবে যা দিয়ে সে দেখতে পাবে, একটি জিহ্বা বা মুখ থাকবে যা দিয়ে সে কথা বলবে এবং যারা তাকে ন্যায় নিষ্ঠভাবে স্পর্শ করেছে তাদের পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। (তিরমিযী শরীফ, হাদীস৯৬১)

মক্কা মুকাররমার মর্যাদা: পবিত্র মক্কা মুকাররমায় রয়েছে ময়দানে আরাফাত। এখানে উপস্থিতির নামই হজ্ব। ৯ যিলহজ্বের সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে ১০ যিলহজ্ব সুবহি সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত যে কোনো সময় এক মুহূর্তের জন্য হলেও আরাফার ময়দানে অবস্থান করা হজ্বের দ্বিতীয় ফরজ। প্রথম ফরজ ইহরাম পরিধান করা।

তৃতীয় ফরজ হলো, তাওয়াফে যিয়ারত বা ফরজ তাওয়াফ করা ১০ যিলহজ্ব কুরবানি করার পর হতে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত যে কোন সময় এ তাওয়াফ করা যায়।

উপরোক্ত তিনটি ফরজের কোনে একটিও বাদ পড়লে হজ্ব সহীহ্‌ হবে না। মক্কা মুকাররমা হলো পবিত্র কুরআন অবতরণের পবিত্র পুণ্যভূমি, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে শুভাগমনের পদধূলিতে ধন্য বরকতময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম স্থান। অসংখ্য আম্বিয়া কেরাম ও সম্মানিত রাসূলগণ, খানায়ে কা’বা যিয়ারতের জন্য এ পবিত্র ভূমিতে তাশরীফ এনেছেন, কা’বা শরীফের চতুর্দিকে তিনশত আম্বিয়ায়ে কেরামের কবর শরীফ রয়েছে। রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যখানে সত্তর জন আম্বিয়া কেরামের কবর শরীফ রয়েছে। হাতীমের ভেতরে যেটি খানায়ে কা’বার অংশ এর মধ্যে মীজাবে রহমতের নীচে হযরত ইসমাইল আলায়হিস্‌ সালাম ও তাঁর আম্মাজান হযরত হাজেরা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার কবর শরীফ রয়েছে।

মক্কা শরীফের প্রসিদ্ধ কবরস্থান জান্নাতুল মুআল্লা শরীফ থেকে কিয়ামতের দিন এমন সত্তর হাজার লোকদের উঠানো হবে যাঁরা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাঁদের প্রতিজন সত্তর হাজার গুনাহ্‌গারকে সুপারিশ করবেন তাঁদের চেহারা মুবারক পূর্ণিমার রাতের চন্দ্রের মতো উজ্জ্বল চমৎকার হয়ে উঠবে। (তারিখে মক্কা, খণ্ড, পৃ. ৬৭, আনোয়ারুল বয়ান, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৭৯)

খানায়ে কা’বায় এক রাকাত নামাযে এক লক্ষ রাকাতের সওয়াব: হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, মদীনা মনোয়ারায় আমার মসজিদে এক রাকাতে পঞ্চাশ হাজারে সওয়াব, আর মক্কা মুকাররমার মসজিদুল হারামে এক রাকাতে এক লক্ষ রাকাতের সওয়াব। (ইবনে মাযাহ্‌, খণ্ড, পৃ. ১০২, আনোয়ারুল বয়ান, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৮২)

হজ্ব পালনকারী ও ওমরা আদায়কারীদের খানায়ে কা’বা দর্শনে অনন্য সাওয়াব: উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবীজি এরশাদ করেছেন

খানায়ে কা’বাকে দেখা ইবাদত। (কানযুল উম্মাল, খণ্ড, পৃ. ৪৫৮)

খানায়ে কা’বায় দৈনিক ১২০টি রহমত নাযিল হয়। তাওয়াফকারীদের জন্য ষাটটি, নামাযীদের জন্য চল্লিশটি, দর্শনার্থীদের জন্য বিশটি। আল্লাহ্‌ তা‘আলা প্রত্যেক মুসলমানকে হজ্ব ও ওমরা পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসাতৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী); খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইসলামী শাসন ব্যবস্থার পতন : কারণ ও প্রতিকার
পরবর্তী নিবন্ধএকা বসে আছে