ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এখন লাইফ সাপোর্টে : ট্রাম্প

আক্রান্ত হলে ৯০% ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার হুঁশিয়ারি দিল তেহরান হরমুজে নিয়ন্ত্রণ এলাকা বাড়ানোর ঘোষণা আইআরজিসির

আজাদী ডেস্ক | বুধবার , ১৩ মে, ২০২৬ at ৭:২৯ পূর্বাহ্ণ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। একই সময়ে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, আবারও হামলার শিকার হলে তারা ইউরেনিয়াম ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে পারে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রা হিসেবে বিবেচিত। এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ এলাকার পরিধি কয়েকগুণ বাড়ানোর ঘোষণাও দিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। পরে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হয়। যুদ্ধবিরতি চলার মধ্যেই ওয়াশিংটন, ইসলামাবাদের মাধ্যমে তেহরানের কাছে নতুন একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠায়। গত রোববার সেই প্রস্তাবের জবাব দেয় ইরান। ইরানের প্রস্তাবে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, যুদ্ধক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ, হরমুজ প্রণালিতে সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা এবং ইরানি তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানানো হয়। তবে ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে এই জবাবকে ‘আবর্জনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।

গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, তারা আমাদের কাছে যে আবর্জনা পাঠিয়েছে, সেটি পড়ার পর আমি বলব যুদ্ধবিরতি এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। আমি পুরো জবাবটাও পড়িনি। তিনি আরও বলেন, আমি বলব যুদ্ধবিরতি এখন বিশাল লাইফ সাপোর্টে। যেন চিকিৎসক এসে বলছেস্যার, আপনার প্রিয়জনের বাঁচার সম্ভাবনা মাত্র ১ শতাংশ। তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, তার প্রশাসন এখনও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না।

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাঙিওস জানিয়েছে, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন দুটি বিকল্প গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এর একটি হলো হরমুজ প্রণালিতে ইরানি অবরোধ ভেঙে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ পুনরায় চালু করা এবং অন্যটি নতুন সামরিক অভিযান শুরু করা। গতকাল ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলেও একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছে। বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক হেগসেথ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন, সিআইএ পরিচালক জন রেটক্লিফসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অ্যাঙিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন আগে শনাক্ত করা হলেও এখনো হামলা না হওয়া ইরানি লক্ষ্যবস্তুর প্রায় ২৫ শতাংশে আঘাত হানার পরিকল্পনাও বিবেচনা করছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার চাইছে, ট্রাম্প ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ উদ্ধারে বিশেষ সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিন। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের অনেকেই মনে করছেন, এমন অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ট্রাম্প হয়তো সে পথে হাঁটবেন না।

এই অচলাবস্থার মধ্যেই ইরান নতুন করে কড়া বার্তা দিয়েছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতি সংক্রান্ত সংসদীয় কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি এঙে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, আরেকবার হামলা হলে ইরানের হাতে থাকা বিকল্পগুলোর একটি হতে পারে ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণ। তিনি জানান, বিষয়টি দেশটির পার্লামেন্টে পর্যালোচনা করা হবে।

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্যমতে, ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছানো প্রযুক্তিগতভাবে তুলনামূলক সহজ। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর গত আট বছরে ইরান প্রায় ১১ হাজার কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ করেছে। ইরানের এই মজুদের বড় অংশ ইস্পাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে রয়েছে বলে ধারণা করছে আইএইএ। সংস্থাটির প্রধান রাফায়েল গ্রসি জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের জুনে শুরু হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ ওই কেন্দ্রেই ছিল বলে তাদের ধারণা।

এদিকে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণের পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে আইআরজিসি। ইরানি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আইআরজিসির নৌবাহিনীর রাজনৈতিক সহকারী মোহাম্মদ আকবরজাদেহ বলেন, আগে এই এলাকার ব্যাপ্তি ছিল ২০ থেকে ৩০ মাইল। এখন তা বাড়িয়ে ২০০ থেকে ৩০০ মাইল করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জাসিক ও সিরির উপকূল থেকে তুনববুজুর্গ দ্বীপের বাইরের এলাকা পর্যন্ত অঞ্চলকে এখন কৌশলগত সামরিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি আরও দাবি করেন, সমপ্রতি একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ওই এলাকা অতিক্রমের চেষ্টা করলে ইরানি বাহিনী সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ে এবং পরে জাহাজটি পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ওআইসির সমর্থন চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধভালো মানুষ হতে পারাই শিক্ষার সবচেয়ে বড় সাফল্য