ছোটোবেলার বৈশাখীমেলা ও বলীখেলা

সাইফুদ্দিন আহমদ সাকী | মঙ্গলবার , ১২ মে, ২০২৬ at ৮:০০ পূর্বাহ্ণ

বৈশাখ মাস আসলেই পুরো মাসজুড়ে বাংলার গ্রামেগঞ্জের বিভিন্নস্থানে বৈশাখী মেলা হত। কোথাও কোথাও এখনো হয়। একদিন, দুইদিন কোন কোন জায়গা এর চেয়ে বেশিও বৈশাখী মেলার আসর বসত। কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রা ও নগরায়ণের ফলে বাংলার সেই ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি ক্রমাগতভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে। বৈশাখ বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের এক প্রাচীন উৎসব। এই উৎসবে বাঙালির মৌলিক সত্তা ও কৃষ্টিকে খুঁজে পাওয়া যায়। পহেলা বৈশাখ বাঙালি নানা আয়োজনে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেয় ঠিকই তবে সারা বৈশাখ মাসব্যাপি বাংলার মাঠেপ্রান্তরে এই মেলার উৎসব চলমান ছিল।

বৈশাখ মাসে শুধু বাঙালি নয় পার্বত্যাঞ্চলের জাতিগোষ্ঠীও বৈসাবি উৎসবের আয়োজন করে। যদিও দেশজুড়ে খ্যাতি ও ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে চট্টগ্রামের লালদিঘির জব্বারের ১২ বৈশাখের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলার। লালদিঘির এই বলীখেলা ও মেলাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্নস্থান থেকে গ্রামীণ, লোকজ, মৃৎশিল্পসহ নানা জিনিসপত্র ও খাবারদাবার সওদা করতে বিক্রেতা আগেভাগে চট্টগ্রামের লালদিঘিতে চলে আসেন। লালদিঘির পুরো জায়গা থেকে শুরু করে আন্দরকিল্লা, কেসিদে রোড়, কোতোয়ালি মোড়, আমানতশাহ মাজার হয়ে পুরো ৩/৪ কিঃমিঃ জায়গাজুড়ে এই মেলা সপ্তাহব্যাপি চলে। লালদিঘির এই মেলার জন্য শহর ও গ্রামের মহিলারা প্রহর গুনে তাদের সাংসারিক ও পরিবারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং ছেলেমেয়েদের খেলনাগাড়ীসহ নানা রকমারি জিনিসপত্র কেনার জন্য।

আমার জন্মস্থান কাট্টলীতে বৈশাখ মাসে ভিন্ন ভিন্ন তারিখ ও স্থানে তিনটা বৈশাখী বলীখেলা ও মেলা হত। ছোটবেলায় আমি যখন ক্লাস সিক্স সেভেনে পড়তাম, তখন এই বৈশাখী মেলা ও বলীখেলার জন্য অধীর আগ্রহে দিন গুনতাম। যেন এই মেলা ছিল আমাদের শৈশবকৈশোরের সবচেয়ে খুশির এক আনন্দ উৎসব। বৈশাখ মাস আসার আগেই মেলার জন্য টাকাপয়সা জমাতাম। চট্টগ্রামের সবচেয়ে পরিচিত লালদিঘির জব্বারের বলীখেলা ও মেলায় ঐ বয়সে তখন যাওয়া সম্ভব ছিল না । তবে বাবা ঐ লালদিঘির জব্বারের মেলা থেকে খইমুড়ির মোয়া, চালের জিলাপি, চনামনার ট্যাং, ঘরের নানা সাংসারিক জিনিসপত্র নিয়ে আসতেন। তাতে খুশি হলেও এলাকার মেলায় জিনিসপত্র কেনার ও ছুটাছুটি করার আনন্দ ছিল অন্যরকম।

আগেই বলেছি আমার এলাকা উত্তর কাট্টলীতে সত্তর আশি দশক এমনকি নব্বই দশকেও বৈশাখ মাসে তিনটি স্থানে আলাদা দিনতারিখে বলীখেলা ও মেলা হত। আমার বাড়ির পাশে দক্ষিণ ভিটার বিশাল জায়গায় অলিমিয়া মিস্ত্রির নামে বলীখেলা ও মেলাটা বৈশাখের ৭ তারিখ, অপরটি হতো ১৬ বৈশাখ মুন্সীপাড়ার পশ্চিমে এবং পণ্ডিতবাড়ির সন্নিকটে, যা রুস্তমের বলীখেলা নামে পরিচিত ছিল আর অপরটি বেশ ধুমধাম জাঁকজমকের সাথে হত কর্ণেলহাট মাঠের বলীখেলা ও মেলা। এটি পুরো এলাকায় সর্বাধিক পরিচিত ছিল আর এই মেলা হত ২০ বৈশাখে।

এই তিনটা বলীখেলা ও মেলায় পুরো কাট্টলীসহ সরাইপাড়া, লতিফপুর, ফিরোজশাহ কলোনী, কালির হাট, তৎকালীন জোলার হাট ও তৎসংলগ্ন পুরো এলাকার মানুষ দেখতে আসত, বলীদের খেলা দেখত এবং ছেলেমেয়েদের নিয়ে মেলায় ঘুরে ঘুরে শখের ও পছন্দের জিনিসপত্র কিনতে।

কী আনন্দ আমাদের মাঝে, একদিকে বলীদের কুস্তির লড়াই চলছে অন্যদিকে আমরা দলবেঁধে মেলার চারিদিকে ঘুরছি আর নানা জিনিষপত্র দেখছি। ক্রেতারা বিক্রির জন্য কত রকমের পরসা সাজিয়ে বসেছে। তালপাতার হাত পাখা, ঝাড়ু, শীতলপাটি, মাদুর, বেতের ও মৃৎশিল্পের কত রকম জিনিস, মাটির রঙবেরঙের ছোটদের নানাসাইজের পুতুল ও খেলনা, তালাবাটি, চনামনার ট্যাং, ট্রপি, নানা পদের আচার, নাড়ু, চালের জিলাপি, খইমুড়ি মোয়া, মোটরগাড়ি, টমটম, মাটির তৈরি রং বেরঙের পতুল ও খেলনা, ফুলের টপ, লেইস ফিতা, কলসি, আসবাবপত্র ইত্যাদি কত কত জিনিসপত্র বিক্রি হত। আমরা চকরি ও দোলনায় চড়ে মজা করতাম।

আমার কাছে ছোটবেলার কাট্টলীর বৈশাখী মেলা ছিল আনন্দ আর খুশির এক বাধভাঙ্গা উৎসব। ছোটবেলায় এই তিনটি মেলার দিকে আমরা চেয়ে থাকতাম। বৈশাখ শেষ হবার পথে তবুও ছোটবেলার সেই বৈশাখী মেলার স্মৃতি বিজড়িত দিনগুলো যেন আজো হাতছানি দিয়ে ডাকে।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধমা দেখা হবে জান্নাতে!
পরবর্তী নিবন্ধহতাশা নয়, এগিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার ইচ্ছেশক্তি