শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষা-ব্যবস্থা

কুমুদিনী কলি | সোমবার , ১১ মে, ২০২৬ at ৬:৪৮ পূর্বাহ্ণ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিখ্যাত ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে বলেছিলেন – ‘গল্পটার এইখানে আরম্ভ। কিন্তু আরম্ভের পূর্বেও আরম্ভ আছে। সন্ধ্যাবেলায় দীপ জ্বালার আগে সকালবেলায় সলতে পাকানো।’

অর্থাৎ, যে কোনো বড় সাফল্যের বা কোনো বড় কাজ বা ঘটনার দৃশ্যমান শুরুর পেছনেও দীর্ঘ প্রস্তুতি, পরিকল্পনা বা পটভূমি থাকে। উৎসবের আয়োজনের আগে যেমন আগের থেকেই প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়, তেমনি জীবনের বড় মোড়গুলোর পেছনেও অনেক আগের থেকেই নেপথ্যে কাহিনি তৈরি হতে থাকে।

রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনাটুকুকে নিরন্তর শ্রদ্ধা। আমাদের দেশের প্রথম এবং প্রধান ভবিষ্যৎ কর্ণধার হলো শিক্ষার্থীরা। তাদের এগিয়ে চলার সাথেই দেশের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে ওতোপ্রোতভাবে। তাই এই শিক্ষার্থী সমাজের পুরো অংশটার সার্বিক বিকাশের ধারাকে অব্যাহত রেখে তাদের বিকাশকে ত্বরান্বিত করা, তাদের সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা অভিভাবক তথা শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

তাদেরকে দিয়ে দেশ গঠনের কাজে নিয়োজিত করার আগে তাদের সঠিকভাবে তৈরী করার বিষয়টা সেই সলতে পাকানোর মতোই। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে আমাদের দেশের সবচেয়ে জটিল এবং অবহেলিতউপেক্ষিত বিষয়ই যেনো হলো এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা খাত। শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষাব্যবস্থার একটা অসীম মতানৈক্য। শিক্ষার্থী বান্ধব শিক্ষা ব্যবস্থার বিপরীতে আমাদের যেনো কঠোর অবস্থান। পদে পদে ঠেকিয়ে তাদের শ্বাসরুদ্ধকর একটা অবস্থায় নিমজ্জিত করাটা হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।

শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকার বদলের সাথে সাথে শিক্ষা ব্যবস্থার ধারা পরিবর্তন যেনো এক আতংকের নাম। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পাঠ্যবই পরিবর্তন সাথে সুদীর্ঘ সময় ধরে প্রচলিত ইতিহাস বিকৃতিও এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য আতংক। বদলের ধারাবাহিকতায় এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম বড় হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাসের হাত ধরে। এক প্রজন্ম যা সত্যি বলে জানে, পরের প্রজন্ম জানতে পারছে তার সম্পূর্ণ বিপরীত ইতিহাস ও সংস্কৃতি। ফলে তাদের মধ্যে জানার ফারাক রয়ে যাচ্ছে প্রচুর। তাদের মধ্যে ইতিহাস নিয়ে মতানৈক্য তৈরী হচ্ছে। তারা সঠিক ইতিহাসের চর্চা থেকে দূরে সরে যাবে ধীরে ধীরে, স্বাভাবিকভাবেই।

পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন এনে একেক বছর একেক রকম পরীক্ষা পদ্ধতির মধ্যে আমরা আমাদের সন্তানদের ফেলে দিচ্ছি। কোনো প্রজন্ম হয়তো ‘অটো পাশ’ নামক ধারায় পরীক্ষা দিলো, আর কোনো প্রজন্ম হয়তো পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা দিচ্ছে। এতে করে মেধার কী মূল্যায়ন হচ্ছে তা আমরা সাধারণ জনগণ বুঝতে পারছি না, তবে ভোগান্তির শিকার আমাদের সন্তানেরা।

একটি দেশের সরকার পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার এমন নাজুক পরিণতি পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে হয় কিনা আমার জানা নেই। এছাড়াও নিত্য নতুন নিয়ম কানুনের দোহায় দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভয় ভীতি প্রদর্শনের বিষয় তো আছেই। কাগজে কলমে এত নিয়মের বাহার দেখে বুঝার উপায় নেই যে তার ভেতরে এমন ভূত লুকিয়ে আছে। বিভিন্ন বক্তব্য, সভা সমাবেশের অন্তরালে নানা অনিয়ম লুকিয়ে থাকে, তা সাধারণ শিক্ষার্থী ও সেসব অভিভাবক ছাড়া আর কেউ জানতেই পারে না।

সবচেয়ে দু:খজনক বিষয় হলো নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসব হয়রানি সবচেয়ে বেশি। সেখানে একটা নির্দিষ্ট সময়ের সুনামের অন্তরালে ঢাকা পড়ে যায় নিত্যনতুন সমস্যাগুলো। শিক্ষকরা জাতি গড়ার কারিগর। তাঁরা চাইলে সবটাই ঠিকঠাক হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে হয়, তাঁদের দায়ও কম নয়। একই শিক্ষক যদি ক্লাস ফাঁকি দিতে পারেন, সেই একই শিক্ষক তাঁর ব্যক্তিগত কোচিংএ বেশ সিরিয়াসলি পড়াচ্ছেন। সত্তার দ্বৈত রূপে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা উদ্বিগ্ন এই কারণে যে, এত এত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের যদি এত পক্ষপাতমূলক আচরণ থাকে, তবে গুটিকয়েক যে শিক্ষকরা এখনো ন্যায়ের পথে হাঁটছেন, তাঁরাও আর কতদিন এই সত্য ও সুন্দর পথে হাঁটবেন।

কোচিং সেন্টারের করাল থাবা থেকে শিক্ষা খাতকে মুক্ত করার যে প্রয়াস যুগ যুগ ধরে প্রতিটি সরকার দেখিয়ে এসেছে, তাতে করে একটা কথা স্বীকার করতেই হয় যে, কোচিং সেন্টারের ভূমিকা ও অত কম নয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি তার নির্দিষ্ট সময়ের কাজ সময়ের মধ্যে করতো, তবে শিক্ষার্থীদের কোচিং সেন্টারে দৌঁড়াতে হতো না। কোচিং সেন্টার এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জীবনকে অনেকটা দায়মুক্ত করেছে। কোচিং সেন্টার এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সফলতার জন্য নিরলস শ্রম দেয়া একজন অদৃশ্য অভিভাবক হয়ে উঠেছে, সে কথা স্বীকার করতেই হয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত ব্যবস্থার একটি সমস্যা তো আছেই। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পৌঁছাতে পারা এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযাত্রা। পরিবহন সমস্যা ও তার ঘাটতি এর জন্য দায়ী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা থাকলে এই সমস্যা রোধ করা সম্ভবপর হতো বলে মনে করি। বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা নেই। আর তাতে ভোগান্তির শিকার সেই শিক্ষার্থীরাই।

খুব সামপ্রতিক সময়ের একটি চরম দুর্ভোগের কথা আমাদের জানা। চলমান এস এস সির মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে। বাংলাদেশ ভৌগোলিক ভাবে এমন একটা অবস্থানে আছে যেখানে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, কালবৈশাখী এসব খুব প্রাসঙ্গিক একটি বিষয়। তাহলে আমাদের সবকটি জনদুর্ভোগের বিষয় মাথায় রেখে পাবলিক পরীক্ষার মতো একটি বিষয়ের সময়সূচি নির্ধারণ করা উচিত। আমরা জানি সামান্য পরিমাণ বৃষ্টিতেও এদেশে জলাবদ্ধতা হয়। সুতরাং জনদুর্ভোগ এড়াতে বিশেষ করে পরীক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে পরীক্ষার সময়সূচি এগোনো বা পেছানোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হাঁটু পরিমাণ পানিতে বসে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেবার বিষয়টি কতটা দুর্ভোগের সেটা সহজেই অনুমেয়।

লোডশেডিং এর মতো মহা বিপর্যয় তো লেগেই থাকে। যদিও বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা এর জন্য অনেকাংশে দায়ী, তবুও শিক্ষা সংক্রান্ত সকল বিষয়ের দায় তো সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপরেই বর্তায়। প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রশ্নপত্রের ভুল, বিগত সালের প্রশ্ন নিয়ে চলমান বছরের পরীক্ষা দেয়া ইত্যাদি ইত্যাদি তো আছেই।

মোটকথা, যত প্রকার বিপর্যয় সব শিক্ষার্থীদের সাথেই। যাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপত্তা ও শিক্ষাবান্ধব দেশ প্রয়োজন তাদের সাথেই সমস্ত অনিয়ম। তাদেরকে তিলতিল করে যত্নে লালন করার বিকল্প যদি এমন একটা শিক্ষাব্যবস্থা হয়, তবে তা দুর্ভাগ্যজনক। এছাড়াও স্কুল ভিত্তিক যে পরীক্ষাগুলো নেয়া হয়ে থাকে, সেখানে এক এক স্কুলে এক এক নিয়ম।

কিছু স্কুল কলেজ সরকারি বিধিনিষেধের আওতাভুক্ত। সব রকমের সরকারি বিধিনিষেধ মেনে চলে। আবার কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের নিয়ম কানুনের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে সুদীর্ঘকাল ধরে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সাথে সরকার পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক অমিল। ফলশ্রুতিতে যা হচ্ছে তা হলো একই দেশে দুই ভিন্ন ধর্মী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার কারণে একটা বিভেদ বিভাজন তৈরী হচ্ছে। কোথাও বছরে দুইটি পরীক্ষা সরকারি বিধিনিষেধ অনুযায়ী, কোথাও ছয়টা।

এতে করে সামগ্রিকভাবে পুরো পরীক্ষা পদ্ধতির ভিন্নতার কারণে দুই ক্যাটাগরির শিক্ষার্থী তৈরী হচ্ছে সারাদেশে। একই দেশে অভিন্ন পরীক্ষা পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষাগুলো নেয়া হলে সেটার জন্য পর্যাপ্ত সময় এবং প্রস্তুতি দুটোই পাওয়া যায়। শুধু পরীক্ষার পেছনে দৌড়ানোই যদি হয় মূল লক্ষ্য, তবে তাদের শেখার সময়টা কোথায়?

এস এস সি, এইচ এস সির মতো পাবলিক পরীক্ষায় বোর্ড ভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে জটিলতা বাড়ছে বৈ কমছে না। তার চেয়ে সারাদেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের যে উদ্যোগ নেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে, তাকে কার্যকরী করা হোক। তাতে পক্ষপাতমুক্ত পরীক্ষা সংঘটিত হবে আশা করি। স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বেড়াজাল থেকে আগামী প্রজন্ম মুক্তি পাবে। এত এত অনিয়মের মাঝেও আমরা আমাদের সন্তানদের নিয়ে আশার আলো খুঁজে বেড়াই। কারণ, দেশটা আমাদের। এই দেশে শিক্ষার্থী বান্ধব একটি শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরী হোক নতুন কর্তাব্যক্তিদের হাত ধরে। আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আনন্দের মধ্যে শিক্ষা লাভ করুক। আমরা সন্ধ্যেবেলার জন্য সকাল থেকেই প্রদীপের সলতে তৈরী করে রাখি, যাতে অন্ধকার আমাদের গ্রাস করার আগেই উজ্জ্বল আলোয় চারদিকের অন্ধকার দূরীভূত হয়। একটি সুষ্ঠ সুন্দর শিক্ষাব্যবস্থা যদি আমাদের সন্তানদের জন্য আমরা তৈরী করে যেতে পারি, তবে তা হবে অনাগত আগামীর জন্য উজ্জ্বল একটি আলো। সে আলোয় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পথ চিনে নেবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসৈয়দা করিমুননেসার তৃতীয় কাব্য ‘ইশ যদি পাখি হতাম’
পরবর্তী নিবন্ধস্মরণ : মানবিকতার অনন্য প্রতীক ইউসুফ গনি চৌধুরী