পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে হামলা–পাল্টা হামলার ঘটনায় আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। গোলাগুলি, নৌ–অভিযান, ট্যাংকার জব্দ এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে–যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখনো যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করার মতো কাছাকাছি অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। যুদ্ধবিরতির এক মাস পরও দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক সংঘাত সমানতালে চলতে থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর–আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগে বাহরাইনে ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া যুদ্ধ–সমাপ্তির প্রস্তাব নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি তেহরান। ওয়াশিংটন আশা করেছিল শুক্রবারের মধ্যেই ইরান তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, প্রস্তাবটি এখনো বিবেচনার মধ্যে রয়েছে এবং জবাব প্রস্তুতের প্রক্রিয়া চলছে। এদিকে যুদ্ধবিরতির মধ্যেই শুক্রবার হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বাহিনী ও মার্কিন যুদ্ধজাহাজের মধ্যে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের খবর দিয়েছে ইরানের আধা–স্বায়ত্তশাসিত বার্তা সংস্থা ফারস। পরে তাসনিম নিউজ এজেন্সি ইরানের এক সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, পরিস্থিতি আপাতত শান্ত থাকলেও নতুন সংঘর্ষের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইরানি বন্দরে প্রবেশের চেষ্টা করা ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত দুটি জাহাজে আঘাত হেনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধবিমান জাহাজ দুটির চিমনিতে আঘাত করলে সেগুলো ফিরে যেতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে ইরানের বার্তা সংস্থা মেহর জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে মার্কিন নৌবাহিনীর হামলায় ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে এক নাবিক নিহত হয়েছেন, ছয়জন নিখোঁজ রয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১০ জন।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হলেও যুদ্ধবিরতি বহাল আছে। তবে ইরান অভিযোগ করেছে, যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘন করছে যুক্তরাষ্ট্রই। শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় অভিযোগ তুলে বলেন, প্রত্যেকবার একটি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা সামনে আসে আর যুক্তরাষ্ট্র একটি বেপরোয়া সামরিক অভিযানের পথ বেছে নেয়। এঙে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আরও বলেন, ইরানিরা কখনোই চাপে মাথা নত করবে না। আরাঘচি প্রশ্ন তুলে বলেন, এটা কি অপরিণত চাপের কৌশল? নাকি ফের একবার আগে থেকে ফল জানিয়ে দেওয়া, যা পোটাসকে (মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প) আরেকটি বিপজ্জনক ফাঁদে ফেলে দিচ্ছে?।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে যুদ্ধের সূচনা হওয়ার পর থেকেই ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। কিন্তু চলমান সংঘাতের কারণে জলপথটি প্রায় অচল হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। ইরান শুধু হরমুজে নিয়ন্ত্রণই জোরদার করেনি, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনাতেও পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ–অবরোধ আরোপ করে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) শুক্রবার জানিয়েছে, চলমান মার্কিন নৌ অবরোধ লঙ্ঘন করে ওমান উপসাগরে একটি ইরানি বন্দরে ঢোকার চেষ্টা করা ইরানি পতাকাবাহী দুটি খালি তেলের ট্যাংকারকে তারা নিষ্ক্রিয় করেছে। সেন্টকমের দাবি, এ পর্যন্ত ৭০টির বেশি ট্যাংকারকে ইরানি বন্দরগুলোতে ঢুকতে বা সেখান থেকে বের হতে বাধা দিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
এর আগে বৃহস্পতিবার দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ আনে। সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান ‘বিনা উসকানিতে’ মার্কিন তিনটি জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌযান পাঠিয়েছিল। অন্যদিকে ইরানের যুদ্ধকালীন শীর্ষ কমান্ড খাতামুল আম্বিয়া দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজের দিকে যাওয়া একটি ইরানি তেলের ট্যাংকার ও আরেকটি নৌযানকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং উপকূলের একাধিক এলাকায় আকাশপথেও আঘাত হেনেছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমুজগান প্রদেশের কর্মকর্তা মোহাম্মাদ রাদমেহের জানান, মিনাবের কাছে হামলার শিকার হওয়া কার্গো জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। তিনি মেহর নিউজকে বলেন, আহত ১০ নাবিককে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন গোষ্ঠী ও উদ্ধারকারী দলগুলো বাকি নাবিকদের ভাগ্য জানার চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প ট্রুথ সোশালে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী একাধিক ছোট নৌযান, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করেছে এবং ইরানি হামলাকারীদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আজকে আমরা যেমন তাদের ফের উড়িয়ে দিয়েছি, তেমনই ভবিষ্যতেও আরও শক্তভাবে, আরও সহিংসভাবে উড়িয়ে দেবো, যদি না তারা দ্রুত চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
এরই মধ্যে ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছে, ওমান উপসাগরে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তারা ‘ওশান কই’ নামের একটি ট্যাংকার জব্দ করেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেল রপ্তানি ও ইরানের স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটানোর অভিযোগে বার্বাডোজে নিবন্ধিত ট্যাংকারটি আটক করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রেস টিভি জাহাজটিতে সেনাদের ওঠা এবং জব্দের ভিডিও প্রকাশ করেছে।
যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে যুদ্ধ শেষের জন্য আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছে, অন্যদিকে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। শুক্রবার মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় চীন ও হংকংয়ের কয়েকজন ব্যক্তি এবং ১০টি কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইরানের শাহেদ ড্রোন তৈরির কাঁচামাল সরবরাহ করছে। এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর আরোপিত নৌ–অবরোধের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে তেহরানকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে ফেলবে না। মূল্যায়নে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আরও অন্তত চার মাস পর্যন্ত ইরান গুরুতর অর্থনৈতিক চাপ ছাড়াই পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হতে পারে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ কতোটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কয়েকদিন আগে ট্রাম্প ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি সামরিক অভিযানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়া প্রায় ২ হাজার নৌযানকে নিরাপদে পার হতে সহায়তা করা। তবে পরে তিনি এ অভিযান ৪৮ ঘণ্টার জন্য স্থগিত করেন।
এদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাহরাইন। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শনিবার জানিয়েছে, আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগে ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে তাদের অনেককে ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে পাওয়া গেছে এবং বাহরাইনে ইরানি হামলার প্রতি সমর্থন জানানোর তথ্যও মিলেছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামপ্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক আছে–এমন অভিযোগে ব্যাপক ধরপাকড় চালাচ্ছে বাহরাইন। একই সঙ্গে ইরানের হামলাকে সমর্থন করার অভিযোগে বহু ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিলের ঘোষণাও দিয়েছে মানামা।
উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বাহরাইনসহ উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছিল ইরান। এতে বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তর ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির কারণে ওই সদরদপ্তরের কার্যক্রম পরবর্তীতে ফ্লোরিডার একটি বিমানঘাঁটিতে সরিয়ে নেওয়া হয়।













