শরীয়ত-ত্বরীক্বতের মহান পথ প্রদর্শক সৈয়্যদ আহমদ শাহ্‌ সিরিকোটি (রহ.)

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান | বৃহস্পতিবার , ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ

সিলসিলাহ্‌ই আলিয়া ক্বাদেরিয়া সিরিকোটিয়ার মহান শায়খ পীরে কামিল, মুর্শিদই বরহক হযরতুল আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্‌ সিরিকোটি আলায়হির রাহমাহ্‌ শরীয়ততরীক্বতের এক মহান পথপ্রদর্শক। যিনি একাধারে সুন্নী আক্বীদার প্রবাদ পুরুষ, শরীয়তের এক দক্ষ আলিমে দ্বীন ও দ্বীনী শিক্ষা প্রসারের পথিকৃৎ, পীরই ত্বরীক্বত এবং আল্লাহ্‌র এক মহান ওলী। তিনি শরীয়ত ও ত্বরীক্বতের অনন্য সমন্বিত ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠায় এক যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। যাঁরা তাঁর সান্নিধ্যে গেছেন এবং তাঁর তরীক্বতের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অকল্পনীয় আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ ও পার্থিব উন্নতি আজ সর্বজন স্বীকৃত। হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্‌ সিরিকোটি আলায়হির রাহমাহ্‌ একদিকে আল্লাহর হাবীবই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামএর বংশধর, নজীবুত্ব তরফাঈন হয়ে বেলায়তের উচ্চাসনে সমাসীন হয়েছেন, অন্যদিকে তিনি যেই ত্বরীক্বায় সম্পৃক্ত সেটার ‘শাজরা’ও নিখুঁতভাবে নবীই আক্‌রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছেছে।

জন্ম : হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্‌ সিরিকোটি আলায়হির রাহমাহ ১৮৫৬ সালে পাকিস্তানের উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের হাজারা জিলার সিরিকোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতার দিক দিয়ে হাসানী এবং মাতার দিক দিয়ে হোসাঈনী। সে হিসেবে তিনি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামএর ৩৮তম অধস্তন বংশধর।

শিক্ষা : অতি অল্প বয়সে তিনি পবিত্র ক্বোরআন হিফয (মুখস্থ) করে নেন। এরপর তিনি ইল্‌মে ক্বিরাআত, ফিক্বহ্‌, আক্বাইদ, দর্শন (মানত্বিক), তাফসীর এবং হাদীস শরীফ ইত্যাদি বিষয়ে বুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি ১৮৮০ ইংরেজি সালে প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি স্বরূপ ‘ফাযিল সনদ’ লাভ করেন। তারপর তিনি ভারতে গিয়ে সেখানকার প্রসিদ্ধ মাদ্‌রাসাগুলো থেকে দ্বীনী বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন।

দাম্পত্য জীবন : শাহানশাহে সিরিকোট ১৮৮০ থেকে ১৯১১ ইংরেজির মধ্যবর্তী এক শুভ মুহূর্তে মাশওয়ানী সৈয়দ বংশে এক মহীয়সী মহিলাকে শাদী করেন। শাহানশাহে সিরিকোটের ঔরশে দু’মহান ওলী সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন। হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ সালেহ্‌ শাহ্‌ এবং হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্‌ আলায়হির রাহ্‌মাহ।

বায়’আত গ্রহণ ও পীরের দরবারে নজিরবিহীন খিদমত : আফ্রিকা থেকে ফিরে এসে ১৯১২ ইংরেজিতে হযরত সিরিকোটি আলায়হির রাহমাহ্‌ প্রখ্যাত ওলীই কামিল উলূমই ইলাহিয়্যার ধারক, মা‘আরিফই লাদুন্নিয়ার প্রসবণ হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির বরকতময় হাতে বায়‘আত গ্রহণ করেন।

বায়’আত গ্রহণের পর থেকে তিনি আপন মুর্শিদের খিদমতে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯১২ ইংরেজি সনে তিনি হযরত চৌহরভীর মসজিদ নির্মাণের কাজে আর্থিকসহ বিভিন্ন বিষয়ে অংশ গ্রহণ করেন। মুর্শিদে বরহক্ব হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী আলায়হির রাহমার বরকতমণ্ডিত দরবার শরীফের লঙ্গরখানা এবং এ রহমানিয়া মাদরাসার হোস্টেলের রান্নাবান্নার জন্য লাকড়ির স্বল্পতা ছিলো। হযরত সিরিকোটি আলায়হির রাহমাহ্‌ নিজ বাড়ি সিরিকোটের পাহাড় থেকে সারাদিন লাকড়ি যোগাড় করতেন এবং দিনশেষে ১৮ মাইল দূরের চৌহর শরীফে নিয়ে যেতেন নিজের কাঁধে বহন করে।

দ্বীন, মাযহাব ও তরীক্বতের খিদমতের উদ্দেশ্যে বার্মার রেঙ্গুনে গমন : ১৯২০ ইংরেজিতে হযরত সিরিকোটি আলায়হির রাহমাহ স্বদেশের মায়া ত্যাগ করে সুদূর রেঙ্গুনে চলে যান। তখন তাঁর বয়স অন্তত তেষট্টি বছর। সেখানে তিনি ১৯৪১ ইংরেজির ডিসেম্বর পর্যন্ত সদয় অবস্থান করেন। সেখানে তিনি সর্বমোট ২১/২২ বছর যাবৎ নিরলসভাবে দ্বীন ও মাযহাবের খিদমত আন্‌জাম দেন।

১৯২৪ ইংরেজি সালে, অর্থাৎ হযরত সিরিকোটি আলায়হির রাহমাহ্‌ রেঙ্গুন জীবনের প্রায় শুরুতে হযরত চৌহরভী আলায়হির রাহমাহ্‌ তাঁকে খিলাফত প্রদান করে শরীয়ত ও তরীক্বতের বিশাল দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনিও আপন পীরমুর্শিদের প্রদত্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন।

হযরত সিরিকোটি আলায়হির রাহমাহ্‌ ১৯২০ ইংরেজী থেকে ১৯৪১ ইংরেজি পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ বছরে হাজার হাজার বার্মিজ নাগরিক এবং বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের মধ্যে দ্বীনইসলাম ও ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জমা‘আত’এর আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি রেঙ্গুনে যাওয়ার পর প্রথমে ক্যাম্পবেলে এবং এরপরে মাওলানা সুলতানের মাদ্‌রাসায় শিক্ষকতা এবং এর পরবর্তীতে রেঙ্গুনের বিখ্যাত বাঙালি সুন্নী জামে মসজিদের খতীব ও ইমামের দায়িত্ব পালন করেন। এ মসজিদই ছিলো সেখানে তাঁর দ্বীন ও সুন্নিয়াত প্রচারের কেন্দ্রস্থল। তাঁর এ দ্বীনপ্রচার ও দ্বীনী অসাধারণ খিদমত ১৯৪১ ইংরেজির ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো।

চট্টগ্রামের সংবাদপত্র শিল্পের পুরোধা ‘দৈনিক আজাদী’র প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব মুহাম্মদ আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার এবং মাস্টার মুহাম্মদ আবদুল জলীলসহ চট্টগ্রামের প্রবাসী মুরীদগণ হুজুর ক্বেবলাকে চট্টগ্রামে তাশরীফ নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। সিরিকোটি হুজুর তাতে সম্মতি জানান। তিনি ১৯৩৫/৩৬ খ্রিস্টাব্দে রেঙ্গুন থেকে পাকিস্তান যাবার পথে চট্টগ্রামে কিছুদিনের জন্য যাত্রা বিরতি করেছিলেন। এ কয়েকদিনের যাত্রা বিরতির ফলে এখানকার ধর্মপ্রাণ মানুষ এ মহান ওলীর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ লাভ করেন। তাঁর ওলী সুলভ আখলাক্ব ও বিভিন্ন কারামতের কারণে দলে দলে মানুষ তাঁর হাতে বায়‘আত গ্রহণ করে ধন্য হতে থাকে। ক্রমশঃ তাঁর মুরীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এভাবে ১৯৪১ ইংরেজি সালের শেষের দিকে তিনি রেঙ্গুন থেকে স্থায়ীভাবে এ মিশনের কেন্দ্রস্থল বাংলাদেশের চট্টগ্রামে স্থানান্তর ও স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের অগণিত মানুষ হুজুরক্বেবলার পরিচয় লাভ করেন এবং তাঁর বরকতময় হাতে বায়‘আত গ্রহণ করে সিলসিলাহএ আলিয়া ক্বাদেরিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়ে ধন্য হতে থাকেন।

আনজুমান প্রতিষ্ঠা : শাহানশাহে সিরিকোট ১৯২৫ ইংরেজী সালে বার্মায় (রেঙ্গুন) আপন মুর্শিদের নামে ‘আনজুমানএ শূরাই রহমানিয়া’ নামক একটি সংস্থা গঠন করেন। দ্বীন, মাযহাব ও সিলসিলার যাবতীয় কার্যাদি এ সংস্থার মাধ্যমেই তখন সম্পন্ন হতো। এ দ্বীনি সংস্থা ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রাম সফরকালে ‘আনজুমানএ শূরাএ রহমানিয়া’র নাম পরিবর্তন করে ‘আনজুমানএ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া’ রাখা হয়। এ আনজুমান গঠনকাল থেকে বড় বড় দ্বীনি খিদমত আনজাম দিতে থাকে। বর্তমানে ওই ‘আনজুমান’এর নাম ‘আনজুমানএ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট’। এ ‘আনজুমান’এর কর্ম পরিধি এখন চট্টগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে অনেক দূর বিস্তার লাভ করেছে। বর্তমানে এ আনজুমান বিশাল মহীরূহে পরিণত হয়েছে। এশিয়াখ্যাত দ্বীনী এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্‌রাসাসহ সারা দেশে দু’শতাধিক দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ, মাসিক ‘তরজুমানএ আহলে সুন্নাত ওয়াল জমা‘আত’ নিয়মিতভাবে প্রকাশ, ‘আনজুমান রিসার্চ সেন্টার’ নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে বিভিন্ন অতীব প্রয়োজনীয় গ্রন্থপুস্তকাদি প্রণয়ন ও প্রকাশ করছে।

শাহানশাহে সিরিকোট যেভাবে যুগশ্রেষ্ঠ আলিমে দ্বীন ছিলেন তেমনি ছিলেন এক মহান ওলীই কামিল। তাই তাঁর প্রতিষ্ঠিত সিলসিলায় রয়েছে শরীয়ত ও ত্বরীক্বতের অপূর্ব সমন্বয়। তিনি বলেছেন, ‘কাম করো, দ্বীনকো বাঁচাও, ইসলাম কো বাঁচাও, সাচ্ছা আলিম তৈয়্যার করো।’ অর্থাৎ কাজ করো, দ্বীনকে রক্ষা করো, ইসলাম বাঁচাও, সাচ্ছা আলিম তৈয়ার করো। যেমন কথা তেমন কাজ। তিনি ‘জামেয়া’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাচ্ছা আলিম তৈরীর এবং দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার শুভ সূচনা করেন। সুতরাং তাঁরই প্রতিষ্ঠিত ‘জামেয়া’ এখন সত্যিকার অর্থে ‘জামেয়া’ বা ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হয়েছে। এ জামেয়া প্রতিষ্ঠারও একটি ইতিবৃত্তান্ত ও পটভূমিকা রয়েছে।

ওফাত শরীফ: হযরত সাইয়্যেদ আহমদ শাহ্‌ সিরিকোটি আলায়হির রাহমাহ্‌ ১১ই যিলক্বদ ১৩৮০ হিজরী, মোতাবেক ২৫ মে ১৯৬১ ইংরেজি একশ’ বছরের বেশি বয়স অতিবাহিত করে ওফাত বরণ করেছেন।

লেখক : মহাপরিচালক, আনজুমান রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমে দিবসের আলোকে নারীর শ্রম ও কিছু কথা
পরবর্তী নিবন্ধডিগ্রিধারী ভোটার নিবন্ধনে এসএসসির সনদ সার্ভারে আপলোড বাধ্যতামূলক