বুদ্ধ পূর্ণিমা ও বৌদ্ধ ধর্ম

প্রীতিশ রঞ্জন বড়ুয়া | মঙ্গলবার , ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ at ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ

বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথি সৌন্দর্য, পবিত্রতা ও আলোয় ভরপুর এক মহিমান্বিত দিন। এই পূর্ণিমাতেই জন্মগ্রহণ করেন সিদ্ধার্থ গৌতম, এই তিথিতেই বুদ্ধত্ব লাভ করেন এবং একই দিনে মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত হন। বুদ্ধের জীবনের এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা একই দিনে সংঘটিত হওয়ায় এই পূর্ণিমা ‘বুদ্ধ পূর্ণিমা’ নামে খ্যাত। আবার বৈশাখ মাসে হওয়ায় একে ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’ও বলা হয়। বিশ্বের সকল বৌদ্ধ এই দিনটি গভীর শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালন করেন, তাই এটি ‘বৌদ্ধ পূর্ণিমা’ নামেও সুপরিচিত। জাতিসংঘও দিনটিকে ‘ইন্টারন্যাশনাল ভেসাক ডে’ হিসেবে পালন করে।

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত কপিলাবস্তু রাজ্যে রাজা শুদ্ধোধন ও রাণী মহামায়ার ঘরে খ্রিষ্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে লুম্বিনী উদ্যানে সিদ্ধার্থের জন্ম হয়। তাঁর জন্মের সময় নানা অলৌকিক লক্ষণের কথা বর্ণিত আছেসাতটি পদক্ষেপ, পদ্মফুলের উদ্ভব এবং সিংহনিনাদ। এইসব প্রতীকী বর্ণনা তাঁর ভবিষ্যৎ মহিমার ইঙ্গিত বহন করে। সিদ্ধার্থের জন্মের পূর্বে রাণী মহামায়া এক অলৌকিক স্বপ্ন দেখেছিলেনএকটি শ্বেত হস্তী শুঁড়ে শ্বেতপদ্ম নিয়ে তাঁর পেটের ডানদিক বিদীর্ণ করে প্রবেশ করছে। পুরোহিতেরা এ স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বলেন, তিনি এক মহান সন্তানের জননী হতে চলেছেন। জন্মের সাতদিন পর মহামায়া মারা যান এবং মহাপ্রজাপতি গৌতমী সিদ্ধার্থকে লালনপালন করেন। এই কারণেই তিনি ‘গৌতম বুদ্ধ’ নামে পরিচিত হন।

রাজকীয় বিলাসিতার মধ্যেই সিদ্ধার্থ বড় হতে থাকেন। যৌবনে তিনি যশোধরার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তাঁদের এক পুত্র সন্তান রাহুলের জন্ম হয়। কিন্তু জীবনের দুঃখ, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। অবশেষে ২৯ বছর বয়সে এক গভীর রাতে তিনি সংসার ত্যাগ করেনপরমা সুন্দরী স্ত্রী, সদ্যোজাত সন্তান ও রাজকীয় ঐশ্বর্য সবকিছু পেছনে ফেলে তিনি বেরিয়ে পড়েন দুঃখমুক্তির সন্ধানে।

এরপর শুরু হয় তাঁর কঠোর সাধনার পথ। বহু গুরুর কাছে শিক্ষা নিয়েও তিনি পরম সত্যের সন্ধান পাননি। দীর্ঘ ছয় বছরের তপস্যার পর গয়ার বোধিবৃক্ষের নিচে ধ্যানমগ্ন হয়ে তিনি ৩৫ বছর বয়সে বোধিজ্ঞান লাভ করেন। সেই দিনটিও ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা।

বুদ্ধত্ব লাভের পর তিনি প্রায় ৪৫ বছর ধরে মানবজাতির কল্যাণে ধর্ম প্রচার করেন। তিনি যুক্তি, বিশ্লেষণ ও উপমার মাধ্যমে মানুষকে সত্য উপলব্ধির পথ দেখান। তাঁর বাণীর মূল ছিলদুঃখ থেকে মুক্তি, সাম্য, মৈত্রী ও মানবতা। অসংখ্য মানুষ তাঁর শিক্ষা গ্রহণ করে মুক্তির পথ লাভ করেন। ৮০ বছর বয়সে কুশীনগরে শালবনের সুশীতল ছায়াতলে তিনি মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন, এবং সেটিও ছিল বৈশাখী পূর্ণিমার দিন।

এই তিনটি ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য ‘বুদ্ধ পূর্ণিমা’ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ববহ প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিন। গৌতম বুদ্ধ যে সত্য উপলব্ধি করেছিলেন, তাই ‘বৌদ্ধ ধর্ম’ নামে পরিচিত। তিনি নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গৃহত্যাগ করেননি; বরং জীবনের দুঃখের কারণ, দুঃখ মুক্তির উপায় ও নৈতিক জীবনের পথ খুঁজেছিলেন। তাঁর আবিষ্কৃত চারটি মহান সত্য হলো. দুঃখ আছে, . দুঃখের কারণ আছে, . দুঃখের নিরোধ আছে, . দুঃখ নিরোধের উপায় আছেএই দুঃখমুক্তির উপায় হিসেবে তিনি ‘আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ পথের কথা বলেনম্যক দৃষ্টি, সংকল্প, বাক্য, কর্ম, জীবিকা, ব্যায়াম, স্মৃতি ও সমাধি। আত্মোপলব্দি ও আত্মশুদ্ধির জন্য সম্যক পথে চলাই হচ্ছে ‘বুদ্ধ ধর্ম’।

তাই বুদ্ধের ধর্মকে একবাক্যে বলা হয়েছে -‘সব পাপ থেকে বিরত থাকা, সৎকর্ম সম্পাদন করা এবং মনকে পরিশুদ্ধ করা্তএই হলো বুদ্ধের অনুশাসন’। এই শিক্ষার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে তিনটি প্রধান অনুশীলনশীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা।

শীল: নৈতিক জীবনযাপন। প্রাণী হত্যা, চুরি, অসৎ আচরণ, মিথ্যা বলা ও নেশা থেকে বিরত থাকা।

সমাধি: মনকে একাগ্র ও সংযত রাখা, ধ্যানের মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জন।

প্রজ্ঞা: সত্য উপলব্ধি করা্তজগতের অনিত্যতা, দুঃখ ও অনাত্ম স্বরূপ বুঝতে পারা।

এই তিনের সমন্বয়ে মানুষ আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে পারে এবং দুঃখমুক্তির পথে এগিয়ে যায়।

বৌদ্ধ ধর্মের মূল লক্ষ্য হলো মানবকল্যাণ। মৈত্রী (সদ্ভাব), করুণা (সহানুভূতি), মুদিতা (পরের সুখে আনন্দ) এবং উপেক্ষা (সমবিকার) চর্চার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিজের এবং সমাজের কল্যাণ সাধন করতে পারে।

যিনি বোধিজ্ঞান লাভ করেন তিনিই ‘বুদ্ধ’, আর যিনি সেই জ্ঞান লাভের সাধনায় নিয়োজিত, তিনি ‘বৌদ্ধ’। যেই ‘সত্য বা ধর্মকে’ ধারণ করে মানুষ সাধনা করেন, সেই ধর্মই হল ‘বৌদ্ধ ধর্ম’। জাতি, বর্ণ বা দেশের ভেদাভেদ এখানে কোনো বাধা নয়সত্য অনুসন্ধানই মুখ্য। বুদ্ধ পূর্ণিমা তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য শান্তি, সমপ্রীতি ও মানবতার এক সর্বজনীন বার্তা। এই দিনে বিশ্বের সকল প্রাণীর সুখ, শান্তি ও কল্যাণ কামনা করছি। ধর্ম যার যার, উৎসব হোক সবার।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

পূর্ববর্তী নিবন্ধ২৯ শে এপ্রিলের ভয়াবহ এক স্মৃতি
পরবর্তী নিবন্ধসৌরবিদ্যুৎ এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের দিকে নজর দিতে হবে