বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ও শিল্পায়নের গতি বিবেচনায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি এখন আর শুধু মানবিক দায় নয়, বরং একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক প্রয়োজন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)-Giএর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গীকার। কিন্তু বাস্তবে নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ, দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা শ্রমিকদের ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহিতার একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
এমন এক বাস্তবতায় কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার নিয়ে প্রতি বছর ২৮ এপ্রিল বাংলাদেশে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস পালিত হয়। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হল শিল্পখাতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে, শ্রমিকরা আহত হচ্ছেন, আর আইনি সুরক্ষার সীমাবদ্ধতায় অনেকেই দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তায় পড়ে যাচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে ‘জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য নীতিমালা ২০১৩’ আমাদের একটি দিকনির্দেশনা দিলেও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে।
জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য নীতিমালা ২০১৩: এই নীতিমালাটি বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শ্রমিকের মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ভিত্তি প্রদান করে। এতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে– কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা নিয়োগকর্তা ও রাষ্ট্রের যৌথ দায়িত্ব–র্ঘটনার পর চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও পুনঃকর্মসংস্থানকে একটি ধারাবাহিক ও সমন্বিত প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ রয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ খাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আইনের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব– বর্তমান শ্রম আইনে– সাধারণত ১ বছর পর্যন্ত চিকিৎসা ও মজুরির বিধান রয়েছে, এর পরবর্তী করণীয় স্পষ্ট নয়, পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় না।
এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম: একটি কার্যকর সমাধানের পথ। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জাতীয়ভাবে Employment Injury Scheme (EIS) চালু করা সময়ের দাবি।
করণীয়: নীতিমালা ও বাস্তবতার সমন্বিত প্রয়োগ : ১. আইন সংশোধন ও স্পষ্টতা আনা– এক বছরের পর সম্পূর্ণভাবে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিকের চিকিৎসা, মজুরি ও পুনর্বাসনের বিষয়টি আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ২. জাতীয় Employment Injury Scheme চালু করা– ILO-এর মডেল অনুসরণ করে সকল শিল্পখাতে বাধ্যতামূলকভাবে চালু করতে হবে। ৩. পুনর্বাসন ও পুনঃকর্মসংস্থান নিশ্চিত করা– শ্রমিকের সক্ষমতা অনুযায়ী বিকল্প কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। ৪. স্থায়ী অক্ষমতা ভাতা চালু করা– যেসব শ্রমিক আর কাজে ফিরতে পারবেন না, তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ভাতা নিশ্চিত করতে হবে। ৫. শ্রমিক বীমা বাধ্যতামূলক করা– প্রতিটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা বীমা চালু করা জরুরি।
উপসংহার : জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস আমাদেরকে গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়– শ্রমিকের নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি তার মৌলিক অধিকার। প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু নৈতিক দায়িত্বই নয়, বরং এটি রাষ্ট্র, মালিক এবং সমাজের প্রতি একটি আইনি ও মানবিক বাধ্যবাধকতা।
রিফাতের মতো হাজারো শ্রমিক প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের এই কঠিন বাস্তবতা বদলাতে হলে শুধু সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। এজন্য–বিদ্যমান নীতিমালাগুলোকে বাস্তব অর্থে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, শ্রম আইনকে যুগোপযোগী ও শ্রমিকবান্ধব করে সংস্কার করতে হবে, জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ও সর্বজনীন এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম চালু করতে হবে, যাতে দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিকরা দ্রুত ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা পায়– একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা কোনো একক পক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ, মালিকদের দায়বদ্ধতা এবং সমাজের সচেতনতা–এই তিনের সম্মিলিত উদ্যোগেই আমরা শ্রমিকদের জন্য একটি সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারি।
লেখক : কোঅর্ডিনেটর, পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক তথ্য কেন্দ্র, বিলস–ডিটিডিএ প্রকল্প এবং টিইউসি কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক












