চট্টগ্রাম থেকে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের চ্যালেঞ্জ ও বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ

সৈয়দ কামরুল হাবীব | সোমবার , ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ at ৮:১২ পূর্বাহ্ণ

স্বাধীনতার পাঁচ দশক অতিক্রম করেও বন্দর নগরী চট্টগ্রাম উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্ত হতে পারেনি। গুরুত্বপূর্ণ প্রধান বন্দর, বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত তিন পার্বত্য জেলার অপরূপ পর্যটন সম্ভাবনা বৃহৎ শিল্পাঞ্চলের পরও শাসক গোষ্ঠীর আন্তরিকতার অভাবে চট্টগ্রাম এখনো ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত। এই চট্টগ্রাম থেকে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করা রীতিমত অসাধ্য সাধন। কারণ একটা দৈনিক পত্রিকার মূল আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন। চট্টগ্রামে বিজ্ঞাপনের বাজার বলতে এখন আর কিছু নেই। ব্যবসাবাণিজ্যের মন্দা ও পুরানো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান দপ্তর চট্টগ্রাম থেকে গুটিয়ে ঢাকায় স্থানান্তর সহ নানা কারণে চট্টগ্রামের বিজ্ঞাপনের বাজার এখন মৃত প্রায়। সরকারি বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্রের বরাদ্দেও চট্টগ্রামের দৈনিকগুলো বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর অতিক্রম করে প্রতিদিন পাঠকের হাতে যাচ্ছে। পত্রিকাটির সম্পাদক সৈয়দ উমর ফারুক আগে ৪ বছর সাপ্তাহিক আকারে প্রকাশ করে অনেকের নজর কেড়েছেন। ২০০১ সালে আমি ব্যক্তিগতভাবে পারিবারিক সিদ্ধান্তে এই পত্রিকায় যোগদান করি। এর আগে সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাকলিয়া শহীদ এন.এম.এম.জে কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলাম। প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রায় তিন বছর আমি অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করি। কলেজ ছেড়ে ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে অর্থনীতি বিষয়ে কাজ করার সুযোগও পাই। কিন্তু আমার মরহুম পিতা সাহিত্যিক সৈয়দ মোহাম্মদ হাশেমের অনুরোধ রক্ষায় আমি সাংবাদিক পেশায় যোগদান করি অনিচ্ছা সত্ত্বেও। দীর্ঘ ২৫ বছর শুধু এই পত্রিকা নয় চট্টগ্রামের সংবাদপত্রের দুঃখবেদনার সাথী হয়েছি।

বাংলা হোটেলের দু’টি ছোট রুমে দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ’র প্রথম যাত্রা। আমাদের মাথার উপর ছায়া হয়ে এসেছিলেন শিল্পপতি মাহবুব আলী। যদিও তিনি আমাদের সাথে খুব বেশি সময় ছিলেন না, তবুও তাঁর আর্থিক সমর্থন ছাড়া দৈনিক যাত্রা সম্ভব নয়। মাহবুব আলীর অমায়িক ব্যবহার ও উদার মানসিকতা আমাদের সকলকে আকৃষ্ট করেছেন।

বাংলা হোটেলের সেই ছোট্ট পরিসরে মঞ্চ সম্পাদক সৈয়দ উমর ফারুকের টেবিল ঘিরে এক ঝাঁক মেধাবী ও তেজোদীপ্ত কলম যোদ্ধার মেলা। প্রথম সংখ্যা ঘিরে তুমুল উত্তেজনা। অধিকাংশই এই পেশায় নতুন। চট্টগ্রামের চেনাজানা সব সাংবাদিক সন্ধ্যার পর আসছেন সেই ছোট্ট পরিসরে। সম্পাদক ফারুক ভাই নানা দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। মফস্বলে যারা কাজ করবেন তারাও আসছেন নতুন দৈনিকের এই আগমনী আড্ডায়। আজ পঁচিশ বছর পর পুরনো সেই ছবিগুলোর দিকে তাকালে চেনা যায় না। আমাদের সহযোদ্ধারা এখন স্বমহিমায় নানা মিডিয়া হাউস আলোকিত করেছেন। এখানে কাজ করে সাংবাদিকতার প্রথম দীক্ষা নিয়েছেন এমন অনেক মুখ আজ ঢাকাচট্টগ্রামের মিডিয়ায় উজ্জ্বল ভূমিকা রাখছেন।

মঞ্চ সম্পাদক দুঃসাহসিক সাংবাদিকতাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ যখন সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত তখন বেশ কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নতুন এই দৈনিককে জনপ্রিয় করে তোলে। তখনকার দিনে আজকের মত প্রযুক্তি না থাকায় হাতে লেখা প্রতিবেদন অফিসে কম্পোজ করতে হতো। ফলে আমাদের কম্পোজ রুমটি ছিল জমজমাট। অল্প দিনেই আমরা মোমিন রোডে বড় পরিসরে আধুনিক সাজসজ্জার অফিসে চলে আসি। চট্টগ্রামে আমরাই প্রথম রঙিন পত্রিকা প্রকাশ করি। ট্রেসিং থেকে রঙিন পত্রিকা প্রকাশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আজকের মুদ্রণ শিল্প যে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর তা তখন কল্পনাই করিনি। ফলে প্রতিদিন সর্বশেষ সংবাদ নিয়ে ট্রেসিং প্লেট পর্যন্ত এক অনিশ্চিত পথ পাড়ি দেয়া। আমরা মফস্বল সাংবাদিকতাকে এতো বেশি প্রাধান্য দিয়েছি যে শহরের চেয়ে আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠক প্রিয়তা বেশি পেয়েছি। উন্নয়ন বঞ্চিত এলাকার সুখদুঃখের উপাখ্যান আমরা নিয়মিত প্রকাশ করেছি।

ফিচার পাতাগুলো সাজাতে গিয়ে নতুন লেখকদের স্থান দিতে আমি ‘খোলা আকাশ’ নামে সাপ্তাহিক পাতা চালু করি। প্রতি মাসে নতুন লেখকদের নিয়ে সাহিত্য আড্ডা করে লেখার মান উন্নয়নে কাজ করি। প্রয়াত রম্য সাহিত্যিক সত্যব্রত বড়ুয়া এই ‘খোলা আকাশ’ পাতায় প্রথম লিখে আত্ম প্রকাশ করেন। পরে তিনি নিয়মিত ‘বাকা চোখে’ নামে একটি কলাম লিখেন। অনেকে ‘খোলা আকাশ’এ লিখতে লিখতে সাহিত্যাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

২৫ বছর এই দৈনিকের সাথে জড়িত থেকে যতটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে এটাই বুঝতে পেরেছি যে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিকগুলো বেঁচে থাকার দারুণ সংগ্রামে। মুদ্রণ শিল্পের সমস্ত উপকরণের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। অথচ পত্রিকার আয়ের পথ সঙ্কুচিত। পত্রিকা বিক্রি করে নিউজ প্রিন্টের দামও উঠে না। কালি, কাগজ, প্লেট, অফিস ভাড়া, সাংবাদিক ও কর্মচারীদের বেতন ইত্যাদি হিসেব করলে বিরাট এক অঙ্ক। রাজধানীর দৈনিকগুলো যে বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র পায় তা আমাদের মত চট্টগ্রামে জোটে না। ফলে চটগ্রাম থেকে দৈনিক পত্রিকা টিকিয়ে রাখা এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা আজ রজতজয়ন্তী পালন করছি। এই দীর্ঘ পথ চলায় যারা আমাদের সাথে ছিলেন তাদের সাধুবাদ জানাই। চট্টগ্রামের প্রাচীন পত্রিকা দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক সব সময় আমাদের সম্পাদককে সাহস যুগিয়ে খোঁজখবর রেখেছেন, পূর্বকোণের সম্পাদক ড. . রমিজ উদ্দিন চৌধুরীও প্রকাশনা অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়ে ধন্য করেছেন।

এই রজত জয়ন্তীতে সরকারের প্রতি অনুরোধ চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাগুলোর জন্য সরকারি বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র বরাদ্দ যেন ন্যায় সঙ্গত হয়। কারণ চট্টগ্রাম বন্দর এদেশের প্রাণ। বন্দরের রাজস্ব ছাড়া দেশ এগিয়ে যাবে না। আমরা এই চট্টগ্রামের উন্নয়ন, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার কথা বলি। তাই চট্টগ্রামের দৈনিকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস
পরবর্তী নিবন্ধজ্ঞান- সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমের এক প্রাণবন্ত সাহিত্য উৎসব