ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনাকে ঘিরে ইসলামাবাদে প্রস্তুতি চললেও, ওয়াশিংটনের অংশগ্রহণ নিয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই। ফলে বহুল প্রতীক্ষিত এই আলোচনার অগ্রগতি অনিশ্চয়তায় আটকে আছে।
প্রথম দফার ব্যর্থ আলোচনার পর নতুন করে আলোচনায় বসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদে এসে আলোচনায় অংশ নেবেন এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বহনকারী ‘এয়ার ফোর্স টু’ পাকিস্তানের উদ্দেশে যাত্রা করেনি। ফলে নির্ধারিত সময়েও কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক শুরু হয়নি। এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির সময়সীমা অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এই সিদ্ধান্তে তা স্থগিত হয়। যদিও এটি সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমিয়েছে, তবে শান্তি আলোচনার অনিশ্চয়তা দূর করতে পারেনি।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ইসলামাবাদ সফরের ঘোষণা দিয়ে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন। গতকাল শুক্রবার রাতে তার পাকিস্তান সফরের কথা নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ইরান থেকে যে বার্তা পাওয়া গেছে, তাতে বলা হচ্ছে–এই সফরে মূলত পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকই অগ্রাধিকার পাবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো শান্তি আলোচনা নয়। এই অবস্থান পুরো প্রক্রিয়াকে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কারণ, ইসলামাবাদে সম্ভাব্য বৈঠকটি তিন পক্ষের মধ্যে সরাসরি সংলাপের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকার ইঙ্গিত কূটনৈতিক জটিলতা বাড়িয়েছে।
এদিকে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। ইসলামাবাদে গত এক সপ্তাহ ধরে নিরাপত্তা জোরদার, কূটনৈতিক প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের আগমন–সবকিছু মিলিয়ে একটি বড় ধরনের বৈঠকের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও এতে কিছুটা ব্যাহত হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে আলোচনার অনিশ্চয়তা সেই প্রস্তুতিকে অনেকটাই অনিশ্চিত করে তুলেছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র আপাতত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধির পরিবর্তে বিশেষ দূত পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার ইসলামাবাদে আসতে পারেন। তারা পূর্ববর্তী আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট পর্যায়ের অংশগ্রহণ না থাকায় আলোচনার গুরুত্ব ও সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে বলা হচ্ছে, ইরানের প্রতিনিধিদলে সমমর্যাদার কোনো নেতা অংশ না নেওয়ায় ভ্যান্সের সফর আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। যদিও প্রয়োজন হলে তিনি যেকোনো সময় ইসলামাবাদে যেতে প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সফরকে বৃহত্তর আঞ্চলিক কূটনীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আরাকচি ইসলামাবাদের পাশাপাশি মাস্কাট ও মস্কো সফর করবেন বলে জানিয়েছেন। তার ভাষায়, প্রতিবেশীরাই আমাদের অগ্রাধিকার। যা ইঙ্গিত দেয় যে ইরান আপাতত সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করতে চাইছে।
এই প্রেক্ষাপটে সামপ্রতিক সংঘাত পরিস্থিতি আলোচনার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে যে সংঘাত শুরু হয়, তা দ্রুত বিস্তৃত হয়ে পড়ে। পাল্টা হামলায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। এতে জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক দেশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সংঘাতের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মধ্যপ্রাচ্যের বিমান পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর প্রায় ৪০ দিন পর, গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুই পক্ষ। এর তিন দিন পর প্রথমবারের মতো সরাসরি বৈঠকে বসে তেহরান ও ওয়াশিংটন। ইসলামাবাদের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে অনুষ্ঠিত সেই বৈঠক প্রায় ২১ ঘণ্টা স্থায়ী হলেও কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনার দরজা খোলা রাখার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ইরানের সামনে এখনো একটি ‘বিচক্ষণ চুক্তি’ করার সুযোগ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকবে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ইসলামাবাদে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা এখনো অনিশ্চয়তার ঘোরে রয়েছে। পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয় থাকলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানগত পার্থক্য, প্রতিনিধিত্বের স্তর এবং কৌশলগত অগ্রাধিকারের ভিন্নতা–সবকিছু মিলিয়ে এই আলোচনার ভবিষ্যৎ এখনও ঝুলে আছে। তবে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সত্ত্বেও সংলাপের চ্যানেল খোলা থাকাটাই বড় বিষয়। ইসলামাবাদে সরাসরি তিন পক্ষের বৈঠক না হলেও, দ্বিপক্ষীয় ও পরোক্ষ আলোচনার ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে একটি বৃহত্তর সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারে।














