পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যতের নগর গড়ে তুলতে হবে

বিদ্যুৎ সংকট কমাতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিন

| শুক্রবার , ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:০০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখন জ্বালানি সংকটের তীব্র চাপে পড়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় দেশের বড় একটি অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র কার্যত পূর্ণমাত্রায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে, যেখানে গ্রামাঞ্চলের লোডশেডিং এখন রাজধানী ঢাকাতেও স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই তিন মাস দেশে গরম যেমন বাড়ে, তেমনি বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। তবে এবার জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির সংকট তৈরি হওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয় রোধে অফিসের সময় কমানো, শপিং মল দ্রুত বন্ধ করাসহ নানা প্রচেষ্টা শুরু করেছে সরকার। কিন্তু লোডশেডিং পরিস্থিতির কারণে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেসব ব্যবস্থা কতটা কাজে লাগছে। যদিও এই সংকট কাটাতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কিছুটা কমছে। সেটি রক্ষণাবেক্ষণ করে দ্রুত পুরোদমে উৎপাদন শুরুর চেষ্টা করছে সরকার। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ বা পিজিসিবি এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বা পিডিবির গত কয়েক দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পিক আওয়ারে (সর্বোচ্চ চাহিদার সময়) সারা দেশে লোডশেডিং এক হাজার ৮০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পিডিবির গত কয়েক দিনের তথ্য বলছে, এই মাসের প্রথমার্ধে দেশে দিনে ও রাতে গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ১৪ই এপ্রিল সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ১৪ হাজার ৮০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। সেই হিসেবে এই সময়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৬৮৮ মেগাওয়াট। পরদিন অর্থাৎ বুধবার বিকাল তিনটায় সারাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে এই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৬৭০ মেগাওয়াট। পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে সারাদেশে লোড শেডিংয়ের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৮৪৩ মেগাওয়াট।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক সদস্য বলেন, ‘গত কয়েকদিনে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হচ্ছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কিছু মেশিন রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। তাছাড়া জ্বালানি সংকটও রয়েছে। যে কারণে চাহিদা থাকলে সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না’। পিজিসিবির ওয়েব সাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে সারাদেশের লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়। সেটা গরম বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে শুরু করেছে।

পিডিবি ও পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বর্তমানে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আমদানিসহ) রয়েছে। এগুলোর সর্বমোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। পিডিবির ওয়েবসাইট বলছে, এর বিপরীতে প্রতিদিন দিন গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাকি অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না মূলত জ্বালানি সংকটের কারণে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত সময়ের বকেয়া পরিশোধ, জ্বালানি তেলের সংকটসহ নানা কারণে এবার গরমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বেশ খারাপের দিকে যেতে পারে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান ড. সজল চৌধুরী সম্প্রতি এক লেখায় বলেছেন, বিশ্বের অনেক দেশে বাধ্যতামূলক ‘বিল্ডিং এনার্জি রেটিং সিস্টেম’ চালু রয়েছে, যেখানে একটি ভবনের শক্তি দক্ষতা নির্দিষ্ট মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের রেটিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি, যাতে ভবন অনুমোদনের সময়ই শক্তি দক্ষতা একটি বাধ্যতামূলক শর্ত হয়। এতে করে ভবনের নকশা থেকেই প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল, সূর্যালোক নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তি সাশ্রয়ের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হবে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সংকট সাময়িকভাবে কমাতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান হলো ভবনের নকশা, প্রযুক্তি এবং নীতিমালায় মৌলিক পরিবর্তন আনা। প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল নিশ্চিত করে এমন স্থাপত্যই হতে পারে ভবিষ্যতের পথ। অতএব, এখনই সময় আমাদের উন্নয়ন ধারণা পুনর্বিবেচনা করার। শুধু আধুনিকতার মোহে নয়; বরং টেকসই, শক্তিদক্ষ এবং পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যতের নগর গড়ে তুলতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে