বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলেন, বাজারে গেলেই বোঝা যায়–যে টাকায় আগে এক সপ্তাহের বাজার করা যেত, এখন তা দিয়ে দুদিনও চলা দায়। যদিও মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিবিএসের তথ্য কমার কথা বললেও বাজারের চিত্র উল্টো। বরাবরই সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির তথ্য নিয়ে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করে থাকেন। তাঁরা বলেন, চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস–প্রতিটি পণ্যের দাম যেন লাগামহীনভাবে বাড়ছে। ঊর্ধ্বগতির বাজারে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। একদিকে আয় স্থির, অন্যদিকে ব্যয় বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ফলে সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকেই হিমশিম খাচ্ছেন। নিম্নবিত্তের অবস্থা আরও করুণ; তাদের প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় সরকারের ‘নরম’ অবস্থান বর্তমানে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরছে–সরকার কি বাজার ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব দিচ্ছে? এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যার ফলে সরকারের ওপর মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে; যা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের সরকারগুলোর ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে লোক–দেখানো কিছু উদ্যোগ নিতে। এসব ক্ষেত্রে বরাবরই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থকে। অনেক সময় পণ্যের দাম বেঁধেও দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো সময়ই বাঁধা দামে ‘পণ্য বাধা’ পড়েনি। এসব যেন ছিল জনগণের সঙ্গে রসিকতা! বর্তমানে সবজির দাম আকাশছোঁয়া–যা আগে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য সহজলভ্য ছিল, এখন তা বিলাসদ্রব্যের মতো মনে হচ্ছে।
পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে নানা অজুহাত অসাধু ব্যবসায়ীদের। তারা কখনো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কথা বলেছে, কখনো বলেছে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের কথা। আবার ডলার সংকট, ব্যাংকে এলসি খোলা নিয়ে জটিলতা–এ ধরনের নানা অজুহাত দেখিয়ে পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। আসলে বাজার এক ধরনের সিন্ডিকেটের হাতেই জিম্মি। জিম্মি সাধারণ ক্রেতারা। খবরে প্রকাশ, গত কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি সবজির দাম বেড়েছে ১০টাকা পর্যন্ত। সবজি ছাড়াও উর্ধ্বমুখী রয়েছে ব্রয়লার মুরগি ও মাছের বাজারও। সবজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, সহিংসতার কারণে সবজির সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে। সত্যিকার অর্থে বাজারে স্বস্তি মিলছে না। চালের দাম বেড়ে যাওয়ার পর কাঁচাবাজারেও মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। শাকসবজি, মাছ সব কিছুরই দাম চড়া। শুধু ছাত্রদের আন্দোলনের কারণে নয়, বন্যা এবং সরকারের মজুদে টান পড়ার পর সব ধরনের চালের দাম বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে নানা কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা–এসব বড় ভূমিকা রাখে। তবে এর পাশাপাশি বাজারে সিন্ডিকেট ও অস্বচ্ছতার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে পণ্যের দাম বেড়ে যায়; যা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করে। নিম্নবিত্ত শ্রেণি আগে থেকেই টিকে থাকার লড়াইয়ে অভ্যস্ত, কিন্তু মধ্যবিত্তের আয় সীমিত অথচ ব্যয় বহুমুখী। তাদের জন্য এ মূল্যস্ফীতি এক ধরনের নীরব সংকট তৈরি করেছে।
সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাসাভাড়া–সবকিছু মিলিয়ে তারা এক ধরনের অর্থনৈতিক চাপে আছে। সঞ্চয় কমে যাচ্ছে, জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হচ্ছে পাশাপাশি বাড়ছে মানসিক চাপ। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ ও দিনমজুর শ্রেণি। তাদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই। ফলে তারা বাধ্য হচ্ছে খাবারের পরিমাণ কমাতে বা কম পুষ্টিকর খাবারে অভ্যস্ত হতে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্য ও জীবনের মানের ওপর। সবচেয়ে বড় কথা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান হয়নি। অথচ সরকারকে এসব ব্যাপারে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। সংকটকালে অবৈধ সিন্ডিকেট, মুনাফাখোর ও লোভী ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা বন্ধে কঠোর হতে হবে।









