২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দক্ষিণ ইরানের হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরের “শাহজারেহ তৈয়বা” এলিমেন্টারী স্কুলের ফুলের মত পবিত্র ছাত্রীরা তাদের পড়ালেখায় ব্যস্ত ছিল। যুদ্ধের সাথে তাদের দূরতম কোন সম্পর্কও ছিল না। তবুও আমেরিকান যুদ্ধ বিমান থেকে “টমাহক মিসাইল” এর প্রচণ্ড আঘাত তাদের উপর নেমে আসে। ১৬৮ জন নিরপরাধ অবোধ শিশু কন্যা সেই আঘাতে জীবন হারায়। এ ঘটনায় আমেরিকা দোষীদের কোন বিচারের সম্মুখীন করেছে তা বিশ্ববাসী জানেনি, বা আমেরিকা এ ঘটনায় অনুতপ্ত বা দুঃখ প্রকাশ করেছে বিশ্ব তাও জানেনি।
মিনাব শহরের এই ঘটনা আমাকে ১৬ মার্চ ১৯৬৮ সালে দক্ষিণ ভিয়েৎনামের “কোয়াং নাই” প্রদেশের মাই লাই গ্রামে ৫০৪ জন গ্রামবাসী যাদের মাঝে ৩৪৭ জন ছিলেন নারী এবং শিশু তাদের নির্বিচারে হত্যার কথা মনে করিয়ে দেয়। ঐ দিন ভিয়েৎকং গেরিলাদের খোঁজে আমেরিকান সেনাবাহিনীর ২৩ ইনফেন্ট্রি ডিভিশনের ২০ ইনফেন্ট্রি রেজিমেন্টের সি কোম্পানী, ৩ ইনফেন্ট্রি রেজিমেন্টের বি কোম্পানী মাই লাই গ্রামে হত্যাযজ্ঞের মহোৎসব চালায়। তারা দলবদ্ধভাবে উলঙ্গ উৎসবে নারীদের অবাধে ধর্ষণ করে। অবশেষে পুরা গ্রাম অগ্নিসংযোগে বিধ্বস্ত করে।
মানব ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস এ হত্যাযজ্ঞ প্রাথমিকভাবে আমেরিকান কর্তৃপক্ষ ধামাচাপা দেয়। রোনাল্ড র্যাইডেনহোর’ তখন ভিয়েতনামে আমেরিকান সেনাবাহিনীর ১১ ব্রিগেডে রিকোনোসেন্স তথা তল্লাসী হেলিকপ্টারে গানম্যান হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ঘটনার আদ্যপান্ত জেনে নেন, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা শুনেন। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের নভেম্বরে যুদ্ধফেরত অবসরপ্রাপ্ত রোনাল্ড র্যাইডেনহোর’ এর বিবেকের তাড়নায় তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনসহ প্রভাবশালী সিনেটর এবং কংগ্রেসম্যানদের চিঠি লিখে এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিয়ে এর প্রতিকার চান। এ প্রচেষ্টায় র্যাইডেনহোর’ সাথে যোগ দেন সাংবাদিক স্যামুর হারশও। বিষয়টি জনসম্মুখে আসলে আমেরিকা এবং বিশ্বব্যাপী তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়।
প্রতিবাদের প্রাবাল্যে অবশেষে মাই লাই হত্যাকাণ্ডের প্রহসনের বিচার আয়োজন এবং অনুষ্ঠিত হয়। বিচারে আদালত একজন মাত্র লেফটেন্যান্ট কেলি’কে ২২ জনকে হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। সেই শাস্তিও মওকূফ করে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন লেফটেন্যান্ট কেলি’র যাবজ্জীবনকে তিন বছরের গৃহান্তরীনে নামিয়ে আনেন। ঘটনা ধামা চাপা দেওয়ার জন্য কাউকে দায়ী করা হয়নি। এই হল ৫০৪ জন নিরীহ নিরপাধ গ্রামবাসীর হত্যার, ধর্ষণের বিচার! এই হল আমেরিকার বিচারের নৈতিকতার মানদণ্ড।
সেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমেরিকা কম্বোডিয়া, পানামা, কিউবা, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ভেনেজুয়েলা এবং বর্তমানে ইরান সবখানে প্রতিষ্ঠা করে চলেছে।
প্রসঙ্গক্রমে ফিলিস্তিনি লেখক সামি আরিয়ানের সাম্প্রতিক হরমুজ প্রণালী নিয়ে একটি লেখা থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার লোভ সম্বরণ করতে পারছি না। সামি লিখেছেন “সাম্রাজ্য হঠাৎ করে ভেঙে পড়ে না। ধীরে ধীরে ভাঙে। যখন সামরিক বিস্তার রাজনৈতিক কৌশলকে ছাপিয়ে যায়, যখন অর্থনীতির ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে, আর যাদের দমিয়ে রাখতে চাওয়া হয় তারা যখন সময়ের অপেক্ষায় টিকে থাকে, তখনই দমনকারী শক্তির পতনের সূচনা হয়”।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণগ্রস্ত আমেরিকা বর্তমান ইরানযুদ্ধের প্রথম ধাক্কাতেই, অর্থাৎ প্রথম দুই সপ্তায় ইরানে বোমবর্ষণ খাতে ১৬ বিলিয়ন ডলার খরচ করেও ভূ–কৌশলগত এক নাজুক অবস্থায় পতিত এবং যেখানে সময়ের অপেক্ষায় ইরান দাঁড়িয়ে গেছে, ইরানী প্রতি আক্রমণে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার মিত্ররা এবং তার ঘাঁটি সমূহ বিপর্যস্ত প্রায় তখন সামির মন্তব্য অনুয়ায়ী আমরা কি বলতে পারি না আমেরিকার পতন সময় শুরু হয়ে গেছে!
যুদ্ধের ক্রম বিস্তৃতি এধরনের সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে কেবল। ২৭ মার্চ ২০২৬ ঘোষণা দিয়ে ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধারা ইরানের হয়ে যুদ্ধে নেমেছে। তারা অবিলম্বে ইরানের উপর আক্রমণ বন্ধ করা না হলে “বাব আল মান্দেব” প্রণালীতে চলাচলকারী জাহাজ সমূহকে তাদের হামলার লক্ষ্যবস্ত্তুতে পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছে। “বাব আল মান্দেব” ৩২ কিঃ মিঃ প্রস্থের এ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বা এ পথে চলাচলে বিপর্যস্ততা সৃষ্টি হলে বিশ্ব অর্থনীতি এক চরম বিপাকে পড়বে নিশ্চিতভাবে। ২০২৪–২৫ এ ফিলিস্তিন তথা গাজায় ইসরাইলী গণহত্যার সময় হুতিরা “বাব আল মান্দেব” প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিল। তখন হরমুজ প্রণালী অবারিত থাকাতে বিশ্ব অর্থনীতি সেই উত্তাপ খুব বেশি অনুভব করেনি একই সাথে হুতিরা তাদের গৃহীত ব্যবস্থা তখন খুব একটা প্রলম্বিতও করেনি। এবার হরমুজ বন্ধ থাকাতে সৌদি আরব বিকল্প পথ হিসাবে “বাব আল মান্দেব” হয়ে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানী রপ্তানী করে যাচ্ছে। সৌদি আরবের আমেরিকা তাবেদারী থেকে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে ইরান চাইবে না সৌদি আরবের জন্য এই পথ অবারিত থাকুক। সে রকম কিছু ঘটলে তখন “বাব আল মান্দেব” বাদ দিয়ে ভাস্কোডা গামার দেখানো পথ “উত্তমাশা অন্তরীপ” ঘুরে এশিয়া ইউরোপের সাথে সংযুক্ত হতে হবে। এ পথে একেকটি জাহাজকে গুনতে হবে ১০ লক্ষ ডলারেরও অতিরিক্ত ব্যয়। ফলশ্রুতিতে বিশ্ব অর্থনীতি এক ধরনের টালমাটাল অবস্থায় হাবুডুবু খাবে। সাধারণ মানুষ পড়বে চরম বিপাকে মূল্যস্ফীতির কারণে।
আমেরিকা ইসরাইল, ইরান আক্রমণের মাধ্যমে শুধু বিশ্ব অর্থনীতিতে নয় অন্যান্য ক্ষেত্রেও বহুমাত্রিক নানা সমস্যার জন্ম দিয়ে চলেছে। এর মধ্যে গণহত্যা, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের মত গুরুতর অপরাধও রয়েছে। মিনাব শহরের এলিমেন্টারী স্কুলের ১৬৮ স্কুল ছাত্রীর হত্যার বাইরেও ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৫০০০ এর অধিক সাধারণ মানুষ হত্যা। মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করে ইরানে প্রায় ৩৫ লক্ষ মানুষের বাস্ত্তুচ্যুতি, লেবাননে ১০ লক্ষ মানুষকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ, এই যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশের ক্ষতিগ্রস্ততার সম্মুখীন হওয়া, আমেরিকা ইসরাইলের ক্রমাগত নির্বিচার বোমাবর্ষণে ইরানের ৬০০ স্কুল, ২৮২ টি স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং প্রায় ৬৬০০০ হাজার বাড়ি ঘর ধ্বংস হওয়া অন্যতম।
আমেরিকানদের তথ্য অনুযায়ী ইতিমধ্যে তারা ইরানের ১০ হাজার লক্ষ্যবস্ত্তুর উপর আক্রমণ পরিচালনা করেছে। এই আক্রমণে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সর্বশেষ আমেরিকা ইসরাইল তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ পরিচালনার মাধ্যমে মধ্যযুগীয় যে বর্বরতার দৃষ্টান্ত করেছে তা এই আধুনিক সভ্য সমাজে এক অমার্জনীয় অপরাধ। এটি মানুষকে শিক্ষার আলো বিমুখ করে বঞ্চিত করে মুর্খতার পথে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে এই আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ইরান ঘোষণা করেছে তারা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আমেরিকা – ইসরাইল সংশ্লিষ্ট যত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে সবগুলোকে তাদের লক্ষ্যবস্ত্তুতে পরিণত করবে। ইরান ইতিমধ্যে ঐ সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্র ছাত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সরে যেতে বলেছে।
অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, রীতি নীতি সব কিছুর উপর আমেরিকা –ইসরাইল এক ধরনের তাচ্ছিল্য প্রদর্শনের মহড়ায় নেমেছে যেন।
এরই ফলশ্রুতি, এ ধরনের মনোভাবের প্রতিবাদে আমেরিকা জুড়ে “নো কিং” আন্দোলনে লক্ষ মানুষ এখন পথে নেমেছে। এরপরও একসময়ের মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী’র উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োজিত থাকা কর্নেল ম্যাক গ্রেগর’এর কথা যদি সত্যি বলে ধরে নিই তাহলে “নো কিং” আন্দোলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম যে গা করবেন না তা নিশ্চিত। ম্যাক গ্রেগর’এর ভাষ্য ডোনাল্ড ট্রাম তার নির্বাচনের সময় ইসরাইলী ইহুদি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থকরী নিয়েছেন। নির্বাচিত হওয়ার পর ঐ সব ইহুদি ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম’এর ঘাড়ে চেপে তাকে ইরান আক্রমণে নিশ্চিতভাবে প্রভাবিত করে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটেই হয়ত ন্যাটো বা অন্যান্য মিত্র যেমন বৃটেন, জার্মানী, জাপান, ই ইউ’ কারো সাথে পরামর্শ না করে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও’র ভাষ্য অনুযায়ী “ইসরাইল ইরান আক্রমণ করতে যাচ্ছে জেনে ইরান আমেরিকার স্বার্থের উপর আঘাত হানতে পারে সেই আশঙ্কায় আমেরিকা ইরানের উপর আক্রমণ করে’। আসল ঘটনা ইরানের আমেরিকা আক্রমণের সম্ভাবনা নয় বরং ইসরাইলের লক্ষ্য অর্জনে ইসরাইলী স্বার্থান্বেষীদের প্রবল প্রভাবে আমেরিকা ইরান আক্রমণ করে। আমেরিকার কাউন্টার টেরোরিজম ডিপার্টমেন্টের পরিচালক জো কান্ট তার পদত্যাগ পত্রে উল্লেখ করেছেন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের কাছে এখন ইসরাইলই প্রথম, আমেরিকা নয়।
আর এখন আমেরিকা বেকায়দায় পড়ে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করতে যখন মিত্রদের কাছ থেকে আশায় হাত পাতছেন, তখন প্রত্যেকের একই উত্তর, এ যুদ্ধ আমাদের নয় এ যুদ্ধ শুরুর ব্যাপারে আমাদের সাথে সামান্য আলোচনাও করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানী প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর একটি দারুণ রসালো ঠাট্টাময় মন্তব্য উদ্ধৃত করে আজকের লেখার ইতি টানছি, তার মন্তব্য “The war goal now appears to be reopening the Stait of Hormuz which was open before fighting started ”. অর্থাৎ “ এখন মনে হচ্ছে ইরান যুদ্ধের মূল লক্ষ্য হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা অথচ ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে হরমুজ তো উন্মুক্তই ছিল”।
ইতিমধ্যে আমেরিকার উদ্যোগে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রীরা যুদ্ধ বন্ধে এবং শান্তি উদ্যোগে ২৯ মার্চ ২০২৬ ইসলামাবাদে বৈঠক করেছেন। যুদ্ধ বিরতির জন্য উত্থাপিত দু পক্ষের শর্ত সমূহের অমিল বিস্তর। এ পটভূমিতে ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনা হবে কঠিন। তারপরও বিশ্বের শান্তিকামী মানুষেরা আশায় আছেন শান্তির। এদিকে ভিতরে ভিতরে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে তার বর্তমান সৈন্যসংখ্যা ৫০০০০ (পঞ্চাশ হাজার) থেকে বাড়ানোর উদ্যোগে তৎপর। এ থেকে অনুমিত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ইরানে স্থল আক্রমণ পরিচালনায় ফন্দি আঁটছেন। ১৩ জুন ২০২৫ এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আলোচনা চলাকালীন আমেরিকার বিশ্বাসঘাতকতা সেই সাক্ষাই দেয়। এ রকম কিছু যদি হয় তবে ভারতীয় বিখ্যাত সামরিক বিশ্লেষক “দি ফোর্স” ম্যাগাজিনের সম্পাদক প্রবীণ সোয়ানীর ভাষ্য অনুযায়ী “ In Iran a humiliating defeat is awaiting for America” এর অর্থ হল ইরানে আমেরিকার জন্য লজ্জাজনক এক পরাজয় অপেক্ষা করে আছে। এ প্রসঙ্গে পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোকপাত করার আশা রাখি।
লেখক: কথা সাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।














