পাঠের অবারিত উৎসের সঙ্গে পাঠককে যুক্ত রাখা জরুরি

রাশেদ রউফ | মঙ্গলবার , ৩ মার্চ, ২০২৬ at ৬:৪৬ পূর্বাহ্ণ

বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন, ‘অন্য সবকিছুর মতো সাহিত্যেরও প্রতিপক্ষ আছে, থাকতেই হবে। সাহিত্য তার প্রতিপক্ষকে চেনে, এবং দায় নেয় তার মোকাবিলা করবার।’ লেখালেখি একটি সৃষ্টিশীল কাজ। সৃজনপ্রক্রিয়ায় মেতে থাকার অনিন্দ্য প্রয়াস। এদের কেউ আনন্দের জন্য লেখেন, কেউ লেখেন সমাজের প্রতি তাঁর দায়বোধ থেকে। তবে সবাই চান তাঁদের লেখায় সমাজে কিছুটা কাজ হোক, প্রভাব পড়ুক। তাঁরা প্রত্যাশা করেন পাঠকমহলে তাঁদের লেখা সমাদৃত হোক। বলা যায়, তাঁরা সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য লেখেন। মানুষকে সত্য, ন্যায়পরায়ণতা ও কল্যাণের দিকে ফেরানোর জন্য তাঁরা তাঁদের লিখনিশক্তি ব্যবহার করেন। সত্য উচ্চারণে তাঁরা নির্ভীক। অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস নিয়ে তাঁরা এগিয়ে চলেন। সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাটি মাথায় রেখে সাহসিকতার সঙ্গে তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কলম ধরেন। তাঁরা কারো বিরূপ সমালোচনার ধার ধারেন না। অনবরত পিছু লেগে থাকা অন্ধকারের কীটকে তাঁরা ভয় পান না। তাঁদের লেখায় অন্যায়, অত্যাচার, নির্যাতন ও মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ ধ্বনিত হয়। পাঠকমন জাগ্রত হয়। তাঁরা মানুষকে সত্য ও সুন্দরের পথ দেখান। তাঁরা সংখ্যায় কম হলেও সাহসিকতার দিক থেকে তুলনাহীন।

লেখালেখির প্রধান কাজ হলো চিন্তার বিস্তার। লেখক তাঁর আবেগ, অনুভব ও কৌতুহলকে ফুটিয়ে তোলেন তাঁর লেখায়। তাই একজন লেখকের চাই পর্যাপ্ত স্বাধীনতা ও সময়। দীপংকর গৌতম তাঁর এক লেখায় বলেছেন, ‘একজন সাহিত্যিকের কাজ শুধু সাহিত্য সৃষ্টি নয়। তাঁর ওপর সামাজিক দায়ও বিশাল। এই দায়দায়িত্বের প্রসঙ্গ আসলে প্রশ্ন জাগে একজন লেখক আসলে কেন লিখবেন? কার জন্য লিখবেন? কোন দায়বদ্ধতা থেকে লিখবেন? আমরা বুঝি লেখক যেহেতু সামাজিক জীব এবং মননশীলতার মধ্যে তার বিচরণ, তাই সামাজিক দায় তার অন্যান্যদের চেয়ে আলাদা। যে কারণে সে সময়কে মাথায় ধরেই লিখতে বসেন। একজন লেখক মুক্তবুদ্ধির চর্চা করেন। তিনি মুক্তমনা। তার মানেটা কি দাঁড়ায়? দাঁড়ায় তিনি মানুষের বুদ্ধির মুক্তির জন্য লেখালেখি করেন। যুক্তিবাদকে প্রতিষ্ঠার জন্য লেখালেখি করেন, বিজ্ঞানমনস্কতার জন্য লেখালেখি করেন। সমাজ যদি শোষণ বঞ্চনামুক্ত না হয় তাহলে একজন লেখকও মুক্তির স্বাদ বঞ্চিত হন।’

অনেককে বলতে শুনি, লেখকরা সমাজের আয়না। সত্য লিখতে, বাস্তব সময়ে যা ঘটছে তা রেকর্ড করার জন্য এবং বোঝার জন্য কিছু কিছু কাজ লেখকদের করতে হয়। ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে তাঁরা দায়বদ্ধ। লেখকদের ভূমিকা সব সময় স্পষ্ট রাখা উচিৎ। লেখকরা জনগণের কণ্ঠস্বর এবং সেই কণ্ঠকে কখনই দমিয়ে রাখা উচিত নয়। লেখকের আরো কিছু দায়িত্বের মধ্যে পড়বে, পাঠককে পাঠের অবারিত উৎসের সঙ্গে যোগ করে দেওয়া। লেখকের একটা বই পড়ে যদি পাঠক আরেকটা বই পড়ার উৎসাহ পায়, নতুন লেখকের বইয়ের সন্ধানে উৎসাহিত হয়, তাহলেই মঙ্গল। তাহলেই সাহিত্যের সেচ কাজ চলতে পারে। এই শুভ বোধ সব লেখকের থাকা জরুরি। লেখকরা সময়ের দাবি মেটাতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে কবি মোহাম্মদ রফিক লিখেছিলেন ‘সব শালা কবি হবে/ পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে উড়বেই/ দাঁতাল শুয়োর এসে রাজাসনে বসবেই।’ এটা ছিল সময়ের সাহসী উচ্চারণ। ছড়াকার আবু সালেহ অনেক আগে লিখেছিলেন, ‘ধরা যাবে না ছোঁয়া যাবে না বলা যাবে না কথা/ রক্ত দিয়ে পেলাম শালার এমন স্বাধীনতা।’ কিংবা কবি রফিক আজাদের স্পর্ধিত উচ্চারণ– ‘আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ, ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো।’ যুগ যুগ ধরে কবিরা লিখে গেছেন সাহসিকতায় অমোঘ বাণী। এসব পংক্তি সাহিত্যের পাঠককে জাগিয়ে রাখে। এগুলো কতোটা শৈল্পিক, কতোটা রুচিবোধসম্পন্ন, সেসব কথাও পাশাপাশি উচ্চারিত হয়। তবু প্রজন্মকে জাগিয়ে তোলার জন্য এমন শক্তিশালী পংক্তির প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যায় না। এসব লেখা সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে।

লেখালেখির অনুষঙ্গ হিসেবে দুটি বিষয় কখনো পুরনো হবে না, ফুরিয়ে যাবে না। তার একটা হলো প্রকৃতি, অন্যটা হলো প্রেম। কবিছড়াকাররা ফুলপাখিলতাগাছপালা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকন করে থাকেন এবং মনের মাধুরী মিশিয়ে তা তুলে ধরেন শৈল্পিকভাবে তাঁদের ছড়াকবিতায়। প্রেমের কবিতা লিখতেও তাঁরা সিদ্ধহস্ত। কিন্তু সমাজের মধ্যে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা, অসংগতিকেও চিত্রায়িত করতে তাঁরা পিছিয়ে নেই। প্রকাশ করেন শিল্পসম্মতভাবে, স্পষ্ট উচ্চারণে। তখনই তিনি হয়ে ওঠেন মানুষের কবি। এখানেই তাঁর দায়বদ্ধতা। সমাজের প্রতি, সমাজের মানুষের প্রতি। তখনই তিনি সমাজের কবি, মানবতার কবি।

সাহিত্য সমালোচকদের মতে, একজন সৃষ্টিশীল লেখকের দায়ভার থাকে। কারণ, তিনি তাঁর মেধা, সততা, স্বচ্ছতা, কল্পনা বিবেক দিয়ে শব্দের যে গাঁথুনি তৈরি করেন তা তাঁর অন্তর থেকে লাখোকোটি অন্তরে গিয়ে বসত করে। লেখকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সত্যের পক্ষে থাকা, সত্য লেখা। লেখকের উচিত দায়িত্বটা পালন করা। স্পর্ধিত উচ্চারণের অধিকারী এইসব লেখকের শত্রু আছে, তাঁর প্রতিপক্ষ আছে, কিন্তু এসব যেন কোনো ক্রমেই তাঁর মাথায় না থাকে। কোনো দল, সরকার তার প্রতিপক্ষ নয়। সাধারণ পাঠক তাঁর লেখার সঙ্গী। পাঠকই তাঁর শক্তি।

.

প্রজন্মকে বইমুখী করতে শৈলী প্রকাশন ও বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমির উদ্যোগে আগামী ২৭ ও ২৮ মার্চ ২০২৬ (শুক্রবার ও শনিবার) চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হবে স্বাধীনতার বই উৎসব। এতে থাকছে : বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, স্বরচিত কবিতা ও ছড়া পাঠ, আবৃত্তি, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, বইয়ের পৃষ্ঠপোষক সম্মাননা, নতুন বইয়ের প্রদর্শনী। সবার অংশগ্রহণে সার্থক হোক বই উৎসব। পাঠের অবারিত উৎসের সঙ্গে পাঠককে যুক্ত রাখা জরুরি।

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী;

ফেলো, বাংলা একাডেমি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনতুন সম্ভাবনা নিয়ে নতুন সরকারের যাত্রা ও নতুন পরিপ্রেক্ষিত
পরবর্তী নিবন্ধ‘ইমরান-শো : বকুল ও চন্দনে, গানের বন্ধনে’