কাপ্তাই প্রজেক্টে অবস্থিত কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত ৬৪ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু দীর্ঘ ৬ দশক পার হলেও প্রতিষ্ঠানটিকে একবারের জন্যও লোকসানে পড়তে হয়নি। বরং প্রতি বছর মুনাফা করে আসছে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
জানা গেছে, ১৯৬২ সালে কাপ্তাই প্রজেক্টে ৩টি ইউনিট দিয়ে প্রথমবারের মত কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর পর ১৯৮২ সালে কেন্দ্রে আরো ২টি ইউনিট সংযোগ করা হয়। বর্তমানে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ১, ২, ৩, ৪ এবং ৫টি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সচল রয়েছে। এই কেন্দ্র থেকে ২৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে যার পুরোটাই যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে।
কাপ্তাইয়ে অবস্থিত কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র। সম্পূর্ণ পানির সাহায্যে এই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হচ্ছে। ২০২৫–২০২৬ অর্থ বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ে মাত্র ৪৫ পয়সা। একই পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের অন্যান্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ছে ১১ টাকা ৮৩ পয়সা। উৎপাদন খরচ কম পড়ায় কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র কখনো লোকসানের মুখে পড়েনি বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীবৃন্দ।
একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বাংলাদেশের প্রতিটি কলকারখানা বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে আসছে। দেশের রেলখাত অনবরত লোকসান দিচ্ছে। বিমান লোকসান দিচ্ছে। লোকসান দিতে দিতে দেশের সর্ববৃহত পাট শিল্প প্রতিষ্ঠান ‘আদমজী’ শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের প্রায় সব কয়টি শিল্প কারখানা হয় লোকসান না হয় ‘না লোকসান না লাভ’ ভিত্তিতে চলমান রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র যেভাবে সারাদেশকে আলোকিত করে চলেছে তা অত্যন্ত প্রশংসার বিষয়।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান আজাদীকে বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনো লোকসান না দিয়ে আমরা অবশ্যই এটিকে গর্ববোধ করতে পারি। আমাদের প্রকৌশলী, কর্মকর্তা এবং শ্রমিকরা নিয়মিত আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ত্রুটি বিচ্যুতি দেখা দিলে আমাদের প্রকৌশলীরাই সমাধান দিচ্ছেন। আরো কয়েক দশক ধরে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যেতে পারবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জানা গেছে, কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এই হ্রদে সর্বোচ্চ ১০৯ ফুট মিন সি লেভেল (এসএসএল) পানি ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। কাপ্তাই হ্রদে পানি ধরে রাখার জন্য বক্রাকার আকর্ষণীয় একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। সকলের কাছে বক্রাকার এই বাঁধ ‘কাপ্তাই বাঁধ’ নামে পরিচিত। হ্রদে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে কাপ্তাই বাঁধের ঝুঁকি কমাতে হ্রদের পানি নিষ্কাশনের জন্য ১৬টি জল কপাট (স্পিলওয়ে) রয়েছে। হ্রদের পানি ৬৬ ফুট মিন সি লেভেল এর নিচে নামলে পানি স্বল্পতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই পর্যন্ত পানি স্বল্পতার কারণে কখনো বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়নি। তবে পানি স্বল্পতার কারণে ৫টি ইউনিটের বদলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সর্বনিম্ন ১টি ইউনিট সচল ছিল। তিনি বলেন ২০২৪–২৫ অর্থ বছরে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে মোট ৯৫.৭ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছিল। ২০২৫–২৬ অর্থ বছরে গড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। এই অর্থ বছরে ৯৯.৩ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছিল। কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালন করা হয়ে থাকে। কাপ্তাইয়ের বিদ্যুৎ সমগ্র দেশকে আলোকিত করছে।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, প্রতি বছর অতি বৃষ্টিতে কাপ্তাই হ্রদে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে স্পিলের ১৬টি গেট খুলে অতিরিক্ত পানি কর্ণফুলী নদীতে নিষ্কাশন করা হয়। এই নিষ্কাশনে কোটি কোটি কিউসেক পানি অযথা ফেলে দেওয়া হয়। ফেলে দেওয়া পানিকে কাজে লাগিয়ে অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধমে পানি নিষ্কাশন করার জন্য ২০০৪ সালে কাপ্তাইয়ে ৬ ও ৭ নম্বর ইউনিট বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে লেক পরিচালনা কমিটির কয়েকটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি প্রভাবশালী মহলের চাপে ঐ পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। পরিকল্পনাটি ভবিষ্যতে বাস্তবায়ন হবে কিনা এ বিষয়ে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক স্পষ্ট করে কিছু জানাতে পারেননি।












