চট্টগ্রাম মহানগর ও উপজেলার ৩ হাজার ২২৫টি সরকারি ভবন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদ, আঙিনা এবং আশপাশের জায়গায় জমে থাকা ১৩৫ টন ময়লা–আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গতকাল শনিবার একযোগে পরিচালিত পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা অভিযানে এসব বর্জ্য অপসারণ করা হয়।
‘পরিচ্ছন্ন করি নগর–গ্রাম, গড়ি নান্দনিক চট্টগ্রাম’ প্রতিপাদ্যে গতকাল শনিবার সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণ থেকে বর্ণাঢ্য র্যালির মাধ্যমে এ কর্মসূচির সূচনা হয়। র্যালিতে অংশ নেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি (অতিরিক্ত আইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মো. মনিরুজ্জামান, সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
র্যালি শেষে কোর্ট হিলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আঙিনা থেকে শুরু করে আইনজীবী ভবন হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদ পর্যন্ত সরাসরি পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এ সময় নিজের হাতে ঝাড়ু তুলে নিয়ে কার্যক্রমে অংশ নেন মেয়র, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও সিডিএ চেয়ারম্যান। প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের স্বতঃস্ফূর্ত এই অংশগ্রহণ দিয়ে গেল একটি বার্তা : নিজের শহর ও নিজের এলাকাকে পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব সবার।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি উপজেলায়ও দিনব্যাপী এ পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ১৩১টি সরকারি দপ্তরের ৪১৬টি ভবন, ৮টি সরকারি আবাসিক এলাকার ১০৮টি ভবন, উপজেলা পর্যায়ের ৪০৬টি ভবন ও ২ হাজার ২৯৫টি বিদ্যালয়সহ মোট ৩ হাজার ২২৫টি সরকারি ভবন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ কর্মসূচি পালিত হয়। অভিযানে অংশ নেন ৬ হাজার ২০০ কর্মকর্তা–কর্মচারী।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। মাসজুড়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, সরকারি আবাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রতি শনিবার অপসারণ করা বর্জ্যের পরিমাণ এবং পরিচ্ছন্নতার আগে–পরের ছবি সংগ্রহের মাধ্যমে কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হবে।
এদিকে কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ একটি পরিচ্ছন্ন, ডেঙ্গুমুক্ত, সবুজ ও নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ে তোলার মূল শক্তি বলে মন্তব্য করেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়, এটি একটি জীবনাচরণ। তাই প্রতি শনিবার নিজের বাসা, ছাদ, আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি পরিবার ও বিদ্যালয় থেকেই শুরু করতে হবে।
তিনি বলেন, একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয় ব্যক্তি ও পরিবার থেকে। তাই প্রতিটি নাগরিক যদি সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজের বাসা, আঙিনা, ছাদ ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে তোলেন, তাহলে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর নগর গড়ে তোলা অনেক সহজ হবে। পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস শিশুদের মধ্যে গড়ে তুলতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের স্কুলগুলোতে ‘স্কুল হেলথ স্কিম’ চালু করা হয়েছে। এর আওতায় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার অভ্যাস তৈরি এবং পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ রোগ প্রতিরোধে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে সাধারণ জনগণের সচেতনতা সৃষ্টি ও সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ বাসাবাড়ি, কর্মস্থল ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ জমে থাকা পানিতেই এডিস মশা বংশবিস্তার করে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা, জনগণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের কর্মসূচি শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিতভাবে চালিয়ে যেতে হবে।
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, জেলার সরকারি দপ্তর, সরকারি আবাসিক এলাকা, উপজেলা পর্যায়ের ভবন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে চলে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। কর্মকর্তা–কর্মচারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ এতে অংশ নেন। তিনি বলেন, ভবনগুলোর ছাদ ও আঙিনায় এই পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম মাসব্যাপী চলবে। আমরা প্রতিদিন এবং প্রতি শনিবার কী পরিমাণে ময়লা সেখান থেকে আসল ও কালেক্ট করা হলো, সেই তথ্যসহ ভবনের আগের ও পরের চিত্র সংগ্রহ করছি। সেভাবেই কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী একটি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, সুস্থ চিন্তার জন্য সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন প্রয়োজন। কিন্তু পরিবেশ যদি অস্বস্তিকর বা অসুস্থ থাকে, সেখানে সুস্থ চিন্তা কিংবা সুস্থ শরীর কোনোটাই সম্ভব নয়। তাই আগামী প্রজন্মের জন্য একটা সুস্থ বাংলাদেশ ও সমাজ গঠনে আমরা এই কার্যক্রম শুরু করেছি।
তিনি বলেন, আমরা কারো ওপর চাপ সৃষ্টি করে বা জোরপূর্বক এটি করাতে চাই না; বরং পরিচ্ছন্নতাকে একটি স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত করতে চাই। আমরা একটি পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ চাই। আমরা বাংলাদেশকে পরিবর্তন করতে চাই।











