অবশেষে পুরোদমে চালু হয়েছে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল)। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ক্রুডের অভাবে টানা ২৬ দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল সকাল ৮টায় রিফাইনারির মূল ইউনিট চালু করা হয়। যান্ত্রিক প্রসেস শেষে বিকাল থেকে রিফাইনারিতে ডিজেল, পেট্রোল, ফার্নেস অয়েলসহ ১৩ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন শুরু হয়েছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার শরীফ হাসনাত জানিয়েছেন, কুতুবদিয়া উপকূলে নোঙর করা ক্রুড অয়েলবাহী জাহাজ থেকে লাইটারিংয়ের মাধ্যমে ছোট ট্যাংকারে তেল এনে রিফাইনারিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। ট্যাংকে ক্রুড পৌঁছার পর রিফাইনারি পুরোদমে চালু করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) ক্রুড পরিবহনের দায়িত্বে নিয়োজিত বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, ভাড়া করা ছয়টি অয়েল ট্যাংকারে এমটি নিনেমিয়া মাদার ট্যাংকার থেকে ক্রুড লাইটারিং করা হচ্ছে। এক লাখ টন ক্রুড লাইটারিং করতে ১১ দিন সময় লাগবে। ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার টন ক্রুড পরিশোধন করার সক্ষমতা রয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশে সর্বশেষ ক্রুড অয়েলের চালান পৌঁছেছিল। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় নতুন চালান আনতে বিলম্ব হয়। এতে ইস্টার্ন রিফাইনারির মজুত কমতে কমতে শেষ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ১২ এপ্রিল রাতে প্রতিষ্ঠানটির ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিট বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। তবে এই সময় রিফাইনারির দুটি ইউনিট সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রেখেছিল।
নতুন করে এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে এমটি নিনেমিয়া নামের ট্যাংকারটি বুধবার কুতুবদিয়া চ্যানেলে পৌঁছায়। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই দেশে আসা প্রথম ক্রুড অয়েলের চালান। প্রায় ২৫০ মিটার দীর্ঘ জাহাজটি আকারে বড় হওয়ায় কর্ণফুলী নদী হয়ে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরের ডলফিন জেটিতে ভিড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে গভীর সমুদ্রে অবস্থান করে ছোট ছোট ট্যাংকারে ক্রুড খালাস করে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আনা হচ্ছে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, সৌদি আরবের লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দর থেকে গত ২১ এপ্রিল জাহাজটি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। যুদ্ধঝুঁকিপূর্ণ রেড জোন অতিক্রম করে নির্ধারিত সময়ে এটি বাংলাদেশে পৌঁছেছে। কাস্টমস ও সার্ভেয়ার কার্যক্রম শেষে লাইটারিং কার্যক্রম শুরু হয়।
তিনি জানান, ফুজাইরা থেকে আরও এক লাখ টন ক্রুড অয়েল আনতে ‘এমটি ফসিল’ নামে আরেকটি ট্যাংকার পাঠানো হয়েছে। সেটি আজ বন্দরে পৌঁছে আগামীকাল ক্রুড লোড করার পর বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বিপিসির জন্য ক্রুড বোঝাই করেও এমটি নর্ডিকস পলাঙ নামের আরেকটি জাহাজ বর্তমানে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকা রয়েছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় জাহাজটি যাত্রা করতে পারছে না।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইস্টার্ন রিফাইনারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টনের বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করে থাকে, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করে। বাকি জ্বালানি তেলের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বর্তমানে দেশের বার্ষিক জ্বালানি চাহিদা প্রায় ৭২ লাখ টন। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। এছাড়া ফার্নেস অয়েল, অকটেন, পেট্রোল, কেরোসিন ও বিমান চলাচলে ব্যবহৃত জেট ফুয়েলেরও বড় চাহিদা রয়েছে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ টন জ্বালানি তেল বিক্রি করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে নিয়মিত ক্রুড অয়েল সরবরাহ বজায় রাখা এখন বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।














