সীতাকুণ্ডে পাহাড়ে গলায় ছুরি চালিয়ে শ্বাসনালি কেটে ৭ বছর বয়সী শিশু ইরা খুনের দায়ে একমাত্র আসামি বাবু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল–৪ এর বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস এ রায় ঘোষণা করেছেন। এসময় আসামি কাঠগড়ায় হাজির ছিলেন। পরে তাকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী আব্বাস হোসেন দৈনিক আজাদীকে এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, বাবু শেখকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড ও অনাদায়ে আরো এক বছরের কারাদণ্ড এবং একই আইনের ৯ এর ৪(খ) ধারায় তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড ও অনাদায়ে আরো ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মোট ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষে বিচারক এ রায় ঘোষণা করেছেন বলেও জানিয়েছেন বেঞ্চ সহকারী। গত ১ মার্চ সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাশের পাহাড়ে শিশু ইরার গলায় ছুরি চালিয়েছিলেন বাবু শেখ। সেদিন তিনি প্রথমে ভিকটিমকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন। ভিকটিম চিৎকার করলে তিনি উক্ত কাজে ব্যর্থ হন। এক পর্যায়ে খুনের উদ্দেশ্যে তিনি শিশুটির গলায় ছুরি চালান এবং মৃত ভেবে শিশুটিকে পাহাড়ের খাদে ফেলে চলে যান।
পুলিশ জানায়, বাবু শেখ শিশুটিকে মৃত ভাবলেও তখনো শিশুটির মৃত্যু হয়নি। শিশুটি গলা কাটা অবস্থায় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে থাকা চন্দ্রনাথ মন্দির সড়কে উঠে আসে। উক্ত সড়কের সংস্কার কাজে থাকা শ্রমিকেরা শিশুটিকে উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, পরে চমেক হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। তবে শিশুটিকে বাঁচানো যায়নি। ঘটনার পরদিন ২ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
ইরা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানায় একটি মামলা করেন। তদন্ত শেষে গত ১১ জুন ইরা হত্যা মামলায় বাবু শেখের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা ও সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক মো. কামরুজ্জামান। এতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭/৯(৪)(খ) এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। পুলিশ জানায়, ঘটনার দুদিন পর ৩ মার্চ বাবু শেখকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর ৪ মার্চ পুলিশ তাকে আদালতে সোপর্দ করে। সেখানে তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। শিশু ইরা খুনের পর পুলিশ সুপার বলেছিলেন, শিশুটির পরিবার ও বাবু শেখের পরিবার প্রতিবেশী। পাশাপাশি থাকার কারণে তাদের মধ্যে প্রায় বিরোধ লেগে থাকত। বিরোধকে কেন্দ্র করে শিশুটিকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বাবু শেখ। এরই ধারাবাহিকতায় শিশুটিকে চকলেটের লোভ দেখিয়ে পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। চিৎকার দিলে নিজের কাছে থাকা ছুরি দিয়ে খুনের উদ্দেশ্যে শিশুটির গলায় ছুরি চালানো হয়।
ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী আব্বাস হোসেন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ইরা খুনের মামলাটি গত ১৬ জুন আমাদের ট্রাইব্যুনালে বদলি হয়ে আসে। ১৭ জুন পুলিশের দেওয়া চার্জশিট গ্রহণ করে অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়। এরপর ১৮ জুন আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন বিচারক। সেদিন সাক্ষীদের প্রতি সমনও ইস্যু করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, পরবর্তীতে ২১ জুন, ২২ জুন, ২৩ জুন, ২৪ জুন, ২৫ জুন ও ২৮ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৬ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য রেকর্ড করা হয়। এরপর ২৯ জুন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিকে পরীক্ষা (আত্মপক্ষ সমর্থন) করা হয়। পরদিন ৩০ জুন আসামি আদালতের কাছে সাফাই সাক্ষ্য দেন। এক পর্যায়ে ২ জুলাই যুক্তিতর্ক শুনানি সমাপ্ত করে বিচারক রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য্য করেন। সবমিলে বিচার শুরুর ১৫ কার্যদিবসের মাথায় ইরা খুনের মামলার রায় হয়েছে বলেও জানান বেঞ্চ সহকারী। এদিকে রায়ের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ভিকটিম ইরার মা ও মামলার বাদী রোকেয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার মেয়েকে আর কোনোদিন ফিরে পাব না। কিন্তু যারা এমন নিষ্ঠুরতা করবে, তাদের যেন একই পরিণতি হয়। আদালত যে বিচার করেছেন, তাতে আমি খুবই সন্তুষ্ট। আল্লাহর কাছে শুধু দোয়া করি, আর যেন কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি হয়ে না যায়।












