আনোয়ারায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ছয় বছরের শিশু মোহাম্মদ আয়ানের চিকিৎসা–পরবর্তী মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের বিরুদ্ধে ওঠা ‘ভুল’ চিকিৎসার অভিযোগের ঘটনা ১৩ লাখ টাকায় ‘সমঝোতা’ হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে শিশুটির পরিবার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় কোনো পক্ষ থানায় লিখিত অভিযোগ বা মামলা করেনি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
‘সমঝোতা’র শর্ত অনুযায়ী শুক্রবার নগদ ২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আগামী সোমবার ইসলামী ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে আরও ৩ লাখ এবং বাকি ৮ লাখ টাকা ২০ অক্টোবর পরিশোধ করার কথা রয়েছে।
এদিকে ‘ভুল’ চিকিৎসার অভিযোগের মতো গুরুতর একটি ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়ে অর্থের বিনিময়ে ‘সমঝোতা’র বিষয়টি নিয়ে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি যে প্রাইভেট কারের ধাক্কায় শিশুটি আহত হয়েছিল, রহস্যজনক কারণে সেই গাড়ির চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে নিহতের পরিবারের কোনো অভিযোগ না থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, গত ৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আনোয়ারার বটতলী ইউনিয়নের গুন্দ্বীপ পাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয় মোহাম্মদ আয়ান (৬)। পরে তাকে বটতলী রুস্তমহাটে অবস্থিত সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর শিশুটিকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা–নিরীক্ষা না করেই আয়ানকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে স্বজনরা তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এরপর আয়ানের মরদেহ নিয়ে স্বজন ও স্থানীয় লোকজন সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়ে ‘ভুল’ চিকিৎসার অভিযোগে বিক্ষোভ করেন। এ সময় হাসপাতালে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।
নিহতের পরিবারের দাবি, হাসপাতালে যথাযথ পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও চিকিৎসা দেওয়া হলে আয়ানকে হয়তো বাঁচানো সম্ভব হতো।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের বক্তব্য, দুর্ঘটনায় আহত শিশুটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল; সে হাসপাতালে ভর্তি রোগী ছিল না। ফলে ‘ভুল’ চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি তাদের।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে বুধবার রাত থেকে দফায় দফায় আলোচনা চলে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। প্রায় ৩০ ঘণ্টার টানাপোড়েন ও আলোচনার পর শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ৩০০ টাকার জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ১৩ লাখ টাকায় উভয়পক্ষের মধ্যে ‘সমঝোতা’ হয়। এরপর শুক্রবার রাত ৮টার দিকে জানাজা শেষে আয়ানকে দাফন করা হয়।
‘সমঝোতা’ বৈঠকে নিহত শিশুর পক্ষে তার মামা মো. সাইফুল ইসলামসহ স্থানীয় গিয়াস উদ্দিন, নুরুল আবছার, মোহাম্মদ কাইয়ূম, আলী আব্বাস, ইলিয়াছ ও কাসেম খান আকাশসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে দুর্ঘটনায় জড়িত প্রাইভেট কারের চালক ও মালিক আবদুল মান্নানও উপস্থিত থেকে ‘সমঝোতা’পত্রে স্বাক্ষর করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষে ম্যানেজার মোহাম্মদ ইসমাঈল, পরিচালক হারুন ইবনে গনিসহ পাঁচজন প্রতিনিধি এবং পুলিশের একজন সদস্য বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
‘সমঝোতা’র শর্ত অনুযায়ী শুক্রবার ভোরে হাসপাতালের ম্যানেজার মো. ইসমাঈল তার ডাচ্–বাংলা ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা তুলে নিহত শিশুর স্বজনদের হাতে নগদ ২ লাখ টাকা দেন বলে জানা গেছে। আগামী সোমবার ইসলামী ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে ৩ লাখ এবং বাকি ৮ লাখ টাকা ২০ অক্টোবর দেওয়ার কথা রয়েছে।
‘সমঝোতা’র বিষয়টি স্বীকার করে নিহত শিশুর মামা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভুল চিকিৎসার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৩ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। শুক্রবার নগদ ২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা দুই দফায় ২০ অক্টোবরের মধ্যে দেওয়ার কথা। সমঝোতা হওয়ায় আমরা কারও বিরুদ্ধে মামলা করিনি।’
ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করা এসআই মোমেন কান্তি দে বলেন, ‘বটতলীর সাঙ্গু হাসপাতালে আহত শিশুর চিকিৎসা–পরবর্তী মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনরা মরদেহ নিয়ে বিক্ষোভ করেন। উভয়পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। দিন ও রাতভর আলোচনা শেষে উভয়পক্ষ সমঝোতায় গেলেও পুলিশের কাছে কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। পরে জানতে পারি, নিহতের স্বজনরা আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে লিখিত সমঝোতাপত্রে স্বাক্ষর করে হাসপাতাল থেকে মরদেহ নিয়ে যান।’
এদিকে ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ সত্য হলে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে অর্থের বিনিময়ে সমঝোতার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা–সমালোচনা চলছে। সচেতন মহলের কয়েকজনের মতে, এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে চিকিৎসাসেবার মান, রোগীর নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার দায় নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।
আজ ঘটনাস্থলে যাবে তদন্ত কমিটি : এদিকে শিশুটির মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান ডা. জামশেদ গিয়াস উদ্দিন জানান, রোববার তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও নিহত শিশুর স্বজনদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলব। এরপর তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে।’
সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল (পিএলসি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘যে ব্যক্তির গাড়ির ধাক্কায় শিশুটি গুরুতর আহত হয়েছে, তার বিরুদ্ধে নিহত শিশুর পরিবারের কোনো অভিযোগ নেই। অথচ অভিযুক্ত গাড়িচালকসহ একটি বিশেষ মহলের সহায়তায় হাসপাতালের সামনে লোকজন জড়ো করে আমাদের কাছে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘টাকা না দেওয়া পর্যন্ত হাসপাতাল ভাঙচুর ও কর্মচারীদের মারধরের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে আমরা নিরুপায় হয়ে ১৩ লাখ টাকার সমঝোতায় যেতে বাধ্য হয়েছি।’ তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই অভিযোগের বিষয়ে নিহত শিশুর পরিবারের পৃথক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, নিহত আয়ান সাতকানিয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ আরফাত ও আনোয়ারার বটতলী ইউনিয়নের দক্ষিণ চাপাতলী সাদেক আলী তালুকদার বাড়ির কুমকুম আকতার দম্পতির একমাত্র ছেলে। পোশাকশ্রমিক কুমকুম আকতার দীর্ঘদিন ধরে একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে বসবাস করছিলেন।











