যুদ্ধ তো অনেক হলো। এবার শান্তিকে একটা সুযোগ দেয়া যায় কি! হ্যা, ‘শান্তিকে সুযোগ দেওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে শান্ত থাকারও আহ্বান জানানো হয়েছে। কারণ এ ধরনের পরিস্থিতি কেবল ধ্বংসযজ্ঞ নয়, পাশাপাশি অনেক উদ্বেগ ও আচরণগত সমস্যাও ডেকে আনে। বিশেষ করে আগামী দিনের চালক শিশুমনে খুব নেতিবাচকতা নিয়ে আসে, কোমল চিত্তে বড়সড় আঘাত নিয়ে আসে।
বিশ্বব্যাপী আমরা এখন এক অস্থির ও সংঘাতময় সময়ে। যুদ্ধ–সংঘাতের খবর এখন টেলিভিশন ও মোবাইল স্ক্রিনে সবসময় উপস্থিত। পরিবারের শিশুদের সামনেও এসব সংবাদ ও কনটেন্ট উন্মুক্ত। এসব দেখে শিশুদের মনে অনেক ধরনের প্রশ্ন ও অনুভূতি জন্মায়। দেখা দিচ্ছে ভয়, দুঃখ, ক্ষোভ বা উদ্বেগ।
এটি কিভাবে ঘটছে? জানার জন্য শুরুতে রয়টার্স এর একটি প্রতিবেদন পড়ি। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের একটি স্কুল। এখানে বেজে উঠে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কসংকেত। আট বছরের শিশুদের একটি দল দ্রুত তাদের শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে বেজমেন্টে নেমে যায়। বই–খাতা হাতে নিয়ে তারা সেখানেই ক্লাস চালিয়ে যেতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যেই আশ্রয়কেন্দ্রটি আবারও শিশুদের কোলাহলে ভরে ওঠে। কেউ হাতের লেখা অনুশীলন করছে। কেউ বই পড়ছে। আবার মাঝখানে শুরু হয়েছে নাচের ক্লাস। স্কুলের শিক্ষক লিউদমিলা ইয়ারোস্লাভৎসেভা বলেন, এই যুদ্ধই তাদের পরিণত করেছে। যুদ্ধের প্রথম বছরে যখন সাইরেন বাজত, তখন শিশুরা আতঙ্কে কাঁদতে শুরু করত। এখন তারা অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এর জন্য চড়া মূল্যও দিতে হচ্ছে–অবিরাম মানসিক চাপ। রাশিয়া ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ হামলা চালানোর পর চার বছর কেটে গেছে। এই সময়ে যুদ্ধ থামেনি, বরং শিশুদের মনে ভয় ও উদ্বেগ স্থায়ী ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। ইউক্রেনের শিক্ষা ও বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথম নয় মাসেই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য ৫০ হাজারের বেশি শিশু পেশাদার সহায়তা চেয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় তিন গুণ বেশি। ইউক্রেনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধকালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা চরম মানসিক আঘাতের শিকার হয়। তারা নিরাপত্তাহীনতা, বোমা হামলার ভয়, প্রিয়জন হারানো কিংবা বাড়িঘর হারানোর মতো কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিয়েভের শিশুরা বোমা হামলার সতর্কসংকেতে মাঝে মাঝে ক্লাস বন্ধ করতে বাধ্য হলেও, ফ্রন্টলাইনের কাছাকাছি বসবাসরত শিশুরা প্রায়ই স্কুলে যেতে পারে না। ফলে তারা তাদের সহপাঠীদের সঙ্গে মেশার বা শেখার সুযোগও পাচ্ছে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ ও আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা দ্রুত শনাক্ত করে যথাযথ সহায়তা দেওয়া জরুরি। কিয়েভের এক স্কুলের ছবি আঁকা শেখানোর শিক্ষক ভ্যালেন্টিনা মারুনিয়াক বলেন, ২০২২ সালের তুলনায় শিশুদের আঁকা ছবিতে পরিবর্তন এসেছে। আগে তারা ট্যাংক, বিমান, বোমা বিস্ফোরণের ছবি আঁকত। এখন তারা সূর্য, রংধনু, ফুল এবং সুন্দর দৃশ্য আঁকছে। কারণ তারা বিজয়, আনন্দ, বসন্ত আর শান্তি চায়।
আমরা বুঝতে পারছি শিশুর মনোজগতে এক বিশাল পরিবর্তন এনে দেয় ভয়াবহ সংঘাত কিংবা যুদ্ধজনিত অভিজ্ঞতা। পোস্ট–ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার ও ক্লিনিকাল বিষণ্ণতা হলো যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া মানসিক ব্যাধিসমূহের মাঝে সর্বাধিক পরিলক্ষিত। যুদ্ধের তিক্ত পরিস্থিতি অবলোকনের দরুন শিশুদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলোর দৃঢ়তা হারায়, শিক্ষাক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়ে এবং সার্বিকভাবে ব্যক্তিগত জীবনে সন্তুষ্টির সংজ্ঞা পাল্টে যায়।
শিশুদের বেড়ে ওঠার বিভিন্ন স্তরে, জীবনের কম–বেশি সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই সময়ে দাঁড়িয়ে সন্তানের সঙ্গে সংঘাত ও যুদ্ধ নিয়ে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছে ইউনিসেফ। জাতিসংঘের সংস্থাটির মতে, এমন সময়ে তাদের নিরাপদ বোধ করানো অভিভাবকের দায়িত্ব। সেই সঙ্গে পৃথিবীর এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের জানানোও জরুরি।
কিন্তু এমন একটি জটিল বিষয় নিয়ে কীভাবে শিশুর সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করবেন? এই প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছে ইউনিসেফ। চলুন কিছু টিপস্ জেনে নেওয়া যাক ইউনিসেফ প্যারেন্টিং সূত্রে।
১. প্রথমে জানুন তারা কী জানে ও কেমন অনুভব করছে:
যুদ্ধ বা সংঘাতের বিষয়ে কথা বলার জন্য পরিবারে সবার জন্য স্বস্তির জায়গা বেছে নিন, যেমন ্তখাবারের সময় বা পারিবারিক আড্ডা। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করুন, ‘তুমি কি এই বিষয়টিতে কিছু শুনেছো?’ বা ‘এটা জেনে তুমি কেমন অনুভব করছ?’
বাচ্চারা অনেক সময় অনলাইন, টিভি, বন্ধুদের কথা থেকে ভুল তথ্য পেতে পারে। তাই এসময় তাদের শোনা ভুল তথ্য ঠিক করে দেয়া দরকার।
২. শান্ত ও বয়স উপযোগী ভাষা ব্যবহার করুন:
শিশুরা জগতের খবর জানতে পারে, তবে অতিরিক্ত ভয় দেখানো বা জটিল তথ্য তাদের উদ্বিগ্ন করতে পারে। তাই সহজ ভাষায় কথা বলুন। আপনার সন্তানের বয়স অনুযায়ী তার বোঝার মতো করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করুন।
মনে রাখবেন, শিশু আপনার অনুভুতি খেয়াল করে নিজের অজান্তেই সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা ওই বিষয়ে কেমন অনুভব করবে। তাই নিজের ভয় বা দুশ্চিন্তা প্রকাশ কম করুন।
৩. সহানুভূতি ছড়ান, বিদ্বেষ নয়:
সমস্যা যখন বড় দেশের বা দূরের ঘটনার, তখন ভাল বা খারাপ জাতীয় লেবেল না দিয়ে শিশুদের শেখান অন্যদের প্রতি সহানুভুতি দেখাতে। যারা যুদ্ধের কারণে নিজ ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছে বা কষ্টে আছে তাদের জন্য সহানুভূতি প্রকাশ করুন।
৪. সহায়তা ও ইতিবাচক গল্প শোনান:
এমন কঠিন সময়ে যারা ভুক্তভোগীদের জন্য কাজ করছে, সাহায্য করার চেষ্টা করছে তাদের গল্প শিশুদের জানান। এটা তাদের মানসিক শক্তি বাড়ায়। বলুন, অনেক মানুষ, ডাক্তার ও সহায়তাকারীরা শান্তি ও সহায়তায় কাজ করছে। এসব গল্প শুনে সন্তানের মনে যে অনুভূতি হয়, তা ছবি একে প্রকাশ করতে উৎসাহ দিতে পারেন।
৫. কথা শেষ করুন যত্ন নিয়ে:
আলোচনা শেষ করার সময় তাদের মনের অবস্থা খেয়াল করুন। স্বাভাবিক কণ্ঠে কথা বলছে কি না দেখুন। সন্তানকে জানান যে, তারা যেকোনো সময় আপনার কাছে এসে কথা বলতে পারে।
৬. নিয়মিত খেয়াল রাখুন:
এটি একটি আলোচনায় শেষ হওয়ার বিষয় না। সন্তানের সঙ্গে সময়মতো আবার কথা বলুন। জিজ্ঞেস করুন – নতুন কোনো প্রশ্ন আছে কিনা? তারা কি উদ্বিগ্ন? তাদের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করবেন, যেমন – ঘুমে সমস্যা, মাথাব্যথা বা দুশ্চিন্তা। যদি দীর্ঘমেয়াদে এসব সমস্যা লক্ষ করেন, তাহলে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
৭. খবরের প্রবাহ সীমিত করুন:
নির্দিষ্ট বয়সের শিশুদের সংবাদ ও ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট সীমিত করুন। আর যদি বড় বাচ্চারা দেখে, তাদের সঙ্গে কথা বলুন কোন তথ্য নেয়া উচিত ও কোনটা ভুল হতে পারে।
সন্তানের সঙ্গে এমন জটিল বিষয়ে আলোচনা করার আগে আপনার সঙ্গীর সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলে নিন। অভিভাবকরা একই টোনে কথা বললে সন্তান আশ্বস্ত অনুভব করবে।
বড়দের পৃথিবীতে এখন গুলি–বোমার ছোবলে বিপন্ন শৈশব। হানাহানি, দ্বন্দ্ব–সংঘাত, ন্যায়–অন্যায়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ–বিগ্রহে বহু দেশ ও জাতি ধ্বংসের পথে। টিভি কিংবা অনলাইন, গল্পে–আড্ডায় সব জায়গায়ই যুদ্ধের খবর। আর সবখানেই বীভৎস ভয়াবহতার ছবি কিংবা ভিডিও বড়দেরই মানসিকভাবে ভাঙ্গছে। তাহলে একবার শিশুসনের কথাই ভেবে দেখুন! প্রাপ্তবয়স্করা হয়তো সহজেই মানিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু ৫ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের মানসিক অবস্থা একবার ভেবে দেখুন তো!
চাইলেই তো আর পৃথিবী থেকে সব যুদ্ধ–হানাহানি–রক্তপাত চিরতরে হটিয়ে দেওয়া যাবে না। তাই শিশু মনোবিজ্ঞানী ও বিকাশ বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছেন শিশুদের খোঁজ নিতে, বয়োপযোগী আলোচনার সময় বের করতে এবং ভুল তথ্য সংশোধন করে দিতে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন অতিরিক্ত বীভৎস তথ্য শিশুদের সামনে না আসে।
লেখক: উপ–পরিচালক (জনসংযোগ), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)













