লিটনের লড়াইয়ে প্রথম দিন শেষে স্বস্তিতে বাংলাদেশ

সিলেট টেস্ট

ক্রীড়া প্রতিবেদক | রবিবার , ১৭ মে, ২০২৬ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ

সিলেট টেস্টের আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস স্বস্তি দিচ্ছিল না। প্রথম দিনেই শঙ্কা ছিল বৃষ্টি নামবে। তার কারণ, গত কয়েকদিন ধরেই সিলেটের আকাশে ছিল মেঘের আনাগোনা। তবে শেষ পর্যন্ত সেই শঙ্কা কাটিয়ে পুরো দিনই মাঠে গড়িয়েছে খেলা। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিনটা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। সকালের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া, নতুন বলের মুভমেন্ট আর পাকিস্তানি পেসারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং মিলিয়ে বাংলাদেশের নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছিল। টপ অর্ডার ব্যর্থতার পর মিডল অর্ডারও ভেঙে পড়ে দ্রুত।

১১৬ রানেই ৬ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল স্বাগতিকরা। তখন মনে হচ্ছিল, প্রথম ইনিংসে দেড়শ পার করাটাও কঠিন হয়ে যাবে। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে গেলেন উইকেটরক্ষকব্যাটার লিটন দাস। এক প্রান্ত আগলে রেখে খেললেন দায়িত্বশীল, পরিণত এবং একই সঙ্গে আক্রমণাত্মক এক ইনিংস। তার দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে ভর করে প্রথম দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশ গড়ে তোলে ২৭৮ রানের লড়াকু সংগ্রহ। ফলে প্রথম দিনে অনেকটা স্বস্তিতেই মাঠ ত্যাগ করেছে টাইগাররা।

দিনের শুরুটা অবশ্য ছিল পুরোপুরি পাকিস্তানের। নতুন বলে ধারাবাহিকভাবে উইকেট তুলে নিয়ে চাপে ফেলে দেয় সফরকারীরা। ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয় আবারও ব্যর্থ হন। তানজিদ হাসান তামিম আক্রমণাত্মক শুরু করলেও ইনিংস বড় করতে পারেননি। মিডল অর্ডারেও কেউ থিতু হতে পারেননি। প্রত্যাশা করা হচ্ছিল, অভিষিক্ত তানজিদ হাসান তামিম দারুণ কিছু করবেন। শুরুটা অবশ্য সেভাবেই করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২৬ রানের মাথায় তানজিদকেও ফিরতে হয়। এর পরের ব্যাটাররা ভালো শুরুর পরও নিজেদের ইনিংসটাকে লম্বা করতে পারেননি। শুরুর ধাক্কা সামলে ইনিংস গড়ার দায়িত্ব ছিল অধিনায়ক শান্তর কাঁধে। কিন্তু সেট হতে না হতেই উইকেট ছুঁড়ে দেন তিনি। অফ স্টাম্পের বাইরের বলে খেলবেন কি খেলবেন না এমন কনফিউশনের মধ্যেই শান্তর ব্যাটে বল লেগে চলে যায় উইকেটকিপার রিজওয়ানের গ্লাভসে। মুশফিকুর রহিমের উইকেটটাও ছিল বেশ অপ্রত্যাশিত। পাকিস্তানি পেসারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের বিপক্ষে খুব একটা স্বস্তিতে ছিলেন না তিনি। জায়গায় দাঁড়িয়ে বল খেলার চেষ্টায় সফল হননি মুশফিক। ব্যাটের কানা এড়িয়ে আঘাত হানে প্যাডে। জোরাল আবেদনে আম্পায়ার সাড়া দিলে রিভিউ নেন অভিজ্ঞ মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি মুশফিক। ৬৪ বলে ২ চারে ২৩ রান করেন তিনি।

মুশফিকের বিদায়ের পর লিটন দাস তখনও ইনিংস গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। মিরাজ কিছুটা সময় নিয়ে খেললেও বড় জুটি গড়তে পারেননি। অপ্রয়োজনীয় শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দিলে ১১৬ রানেই ষষ্ঠ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। তখন মনে হচ্ছিল, খুব দ্রুতই গুঁটিয়ে যেতে পারে স্বাগতিকরা। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ যখন বিপদে, তখন ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন লিটন। শুরুর দিকে ধৈর্য ধরেই খেলেছেন এই উইকেটকিপার ব্যাটার। তবে সেট হয়ে যাওয়ার পর বদলে যায় দৃশ্যপট। পাকিস্তানি বোলারদের বিপক্ষে পাল্টা আক্রমণে যান তিনি। কভার ড্রাইভ, পুল, ফ্লিকসব ধরনের শটেই ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ। ফিল্ড ছড়িয়ে দিয়েও তাকে থামানো যাচ্ছিল না। পাকিস্তানের ৮ জন ফিল্ডার বাউন্ডারি লাইনে ফিল্ডিং করেছেন কেবল লিটনকে আটকাতে।

লিটনের ইনিংসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল লেজের ব্যাটারদের নিয়ে গড়ে তোলা জুটিগুলো। সপ্তম উইকেটে তাইজুল ইসলামের সঙ্গে তিনি যোগ করেন ৬০ রান। এরপর তাসকিন আহমেদের সাথে অষ্টম উইকেটে ৩৮ রান যোগ করে বাংলাদেশের স্কোর ২শ পার করেন লিটন। এই জুটিতে লিটনের অবদান ৩০ রান। তাসকিন ৭ রানে ফেরার পর ক্রিজে লিটনের সঙ্গী হন শরিফুল ইসলাম। নবম উইকেটে শরিফুলকে নিয়ে ৭৩ বলে ৬৪ রান যোগ করে দলের স্কোর আড়াইশ পার করেন লিটন। নিজের সেঞ্চুরিটাও পূর্ণ করেন দারুণ স্টাইলে। খুররম শাহজাদের করা ওভারে কভার দিয়ে চার মেরে শতক ছোঁয়ার পরের বলেই ফাইন লেগের ওপর দিয়ে হাঁকান বিশাল ছক্কা।

টেস্ট ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ও পাকিস্তানের বিপক্ষে তৃতীয় সেঞ্চুরির স্বাদ নেন লিটন ১৩৫ বল খেলে। পুরো ইনিংসজুড়েই তার ব্যাটিংয়ে ছিল আত্মবিশ্বাস আর নিয়ন্ত্রণের মিশেল। অবশেষে ১০০ পেরিয়ে আরও দ্রুত খেলতে গিয়ে হাসান আলীর বলে আউট হন লিটন। ডিপ স্কয়ার লেগে ক্যাচ দেওয়ার আগে খেলেন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসটি। তার নামের পাশে ছিল তখন ১২৬ রান। ১৬টি চার ও ২টি ছক্কায় ১৫৯ বল খেলেন লিটন। তার ব্যাটের ছোঁয়াতেই বিপর্যয়ের দিনে বাংলাদেশের ২৭৮ রানের সংগ্রহ আসে।

এরপর শেষ বিকালে পাকিস্তান ব্যাটিংয়ে নেমে ৬ ওভার ব্যাটিং করে। প্রবল চাপ নিয়ে আধ ঘণ্টা সময় কাটিয়ে দেয় সফরকারীরা। বিনা উইকেটে ২১ রানে দিন শেষ করে পাকিস্তান। ১৬ বলে এক চারে ৮ রান করেছেন আব্দুল্লাহ ফজল। তিন চারে ২০ বলে ১৩ রান করেছেন আজান আওয়াইজ। আজ রোববার ২৫৭ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় দিন শুরু করবে পাকিস্তান। পাকিস্তানের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন তাদের পেসাররা। নতুন বলে দারুণ নিয়ন্ত্রণ দেখিয়ে শুরু থেকেই চাপে রেখেছিলেন বাংলাদেশের ব্যাটারদের। খুররম শাহজাদের সর্বোচ্চ চারটি উইকেট শিকার করেন। মোহাম্মদ আব্বাস নেন তিনটি উইকেট। এছাড়া হাসান আলী নেন দুটি উইকেট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশুধু গঙ্গা-তিস্তা নয়, সব নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা চাই : মির্জা ফখরুল
পরবর্তী নিবন্ধজামায়াত নেতার বাড়ি থেকে ৯৯ বস্তা সরকারি চাল জব্দ