একদিকে লবণের ন্যায্যমূল্য নেই, অন্যদিকে হালকা বৃষ্টির সঙ্গে বৈরী আবহাওয়ায় মাঠের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসব কারণে কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলের লবণচাষিরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। হতাশ হয়ে অনেক চাষি মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন, যার ফলে এবার লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে গত কয়েক বছরের মতো এবারও চাষিদের লোকসান নিয়ে ঘরে ফিরতে হতে পারে।
বিসিকের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, টেকনাফ, পেকুয়া, চকরিয়া ও সদরের বিস্তীর্ণ প্রায় ৬৮ হাজার ৫০০ একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সমপ্রতি ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টিতে সব এলাকায় লবণ উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটেছে। বৃষ্টিতে বিপুল পরিমাণ লবণ ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি লণ্ডভণ্ড হয়েছে পলিথিনসহ অন্যান্য সরঞ্জাম। এতে চাষের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৪২ হাজার চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বৈশাখ মাস আসায় আবারও বৈরী আবহাওয়ার শঙ্কায় চাষিরা আতঙ্কিত। টেকনাফের চাষি আবদু সালাম জানান, ৭ ও ৮ এপ্রিলের বৃষ্টিতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় উৎপাদিত লবণ বিক্রি করা যায়নি। মাঠের লবণের পাশাপাশি জমানো লবণও বৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছে। পলিথিন গুছিয়ে মাঠ তৈরি করতে ৩ থেকে ৫ দিন সময় লাগে, কিন্তু আবারও বৃষ্টির ভয় রয়েছে। টেকনাফের আরেক চাষি জাব্বার হোসেন বলেন, মণপ্রতি লবণ উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ২৯০ টাকা, কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায়। প্রতিবছর লোকসান দিয়েও পেটের দায়ে চাষ করতে হচ্ছে।
মহেশখালী হোয়ানকের চাষি মকছুদ আলম জানান, অগ্রহায়ণ থেকে চৈত্র পর্যন্ত একরপ্রতি সর্বোচ্চ ৪৫০ মণ লবণ উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত লোকসান দিয়ে বিক্রি করায় দাদনের টাকা তোলা নিয়ে তিনি শঙ্কিত। কুতুবদিয়ার চাষি হামিদুল হক বলেন, হাতে মাত্র ২০–২৫ দিন সময় আছে, এর মধ্যে কালবৈশাখীর হানা দিলে বাকি সময়টা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। লবণচাষি সংগ্রাম পরিষদের চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দীন জানান, শৈত্যপ্রবাহের কারণে চাষিরা ২০–২৫ দিন দেরি করে মাঠে নেমেছিলেন, এখন বৈরী পরিবেশের কারণে ১৫–২০ দিন আগেই মাঠ ছাড়তে হচ্ছে। তার মতে, লবণের দাম অন্তত প্রতি মণ ৪০০ টাকা হওয়া উচিত।
বিসিকের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে) কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলা ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে চাষ হয়েছে। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদিত হয়েছে ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ২৭২ মেট্রিক টন লবণ, যা গত মৌসুমে একই সময়ের তুলনায় ৪ লাখ ৪৯ হাজার মেট্রিক টন কম। গত মৌসুমে উৎপাদিত হয়েছিল ১৮ লাখ ২২ হাজার ১৬২ মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২৮ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন, যেখানে দেশে চাহিদা ২৭ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন।
বিসিকের কক্সবাজার লবণ উন্নয়ন প্রকল্পের মাঠ পরিদর্শক মো. ইদ্রিস আলী বলেন, ৭ ও ৮ এপ্রিলের ভারী বৃষ্টিতে শতভাগ লবণমাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে শত শত চাষির লবণ গলে গেছে। রোদ উঠলেও ঝড়বৃষ্টির শঙ্কা থাকায় চাষিরা মাঠে নামতে সাহস পাচ্ছেন না। বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, বর্তমানে মাঠ ও মিল পর্যায়ে ১০ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন লবণ মজুত রয়েছে।














