যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নত করা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির প্রভাব মোকাবিলায় এবার তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকার–টু–সরকার (জি–টু–জি) কাঠামোর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানির সম্ভাবনা যাচাইয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছে। সফরে মার্কিন এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। কার্যত মার্কিন শুল্কচাপ মোকাবিলায় সরকার দূরদেশ আমেরিকা থেকে এলপিজি আমদানির দিকে নজর দিয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে মাসে ৪৫ হাজার টন এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। পরে তা দ্বিগুণ করে ৯০ হাজার টনে উন্নীত করা হতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত এলপি গ্যাস লিমিটেডের মাধ্যমে এই গ্যাস দেশে এনে বেসরকারি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ১৮টি স্থানীয় কোম্পানি আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের পেছনে শুধু জ্বালানি নিরাপত্তা নয়, বাণিজ্য কূটনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় মার্কিন পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজার আরো উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। চুক্তিতে জ্বালানি পণ্য আমদানিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত মে মাসে দুই দেশ ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে। ওই সমঝোতার আওতায় আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি, এলপিজি এবং অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশে এলপিজি খাত গত এক দশকে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। পাইপলাইনে গ্যাস সুবিধার বাইরে থাকা শহর, মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকায় রান্নার প্রধান জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যবহার বেড়েছে। শিল্প, বাণিজ্যিক খাত এবং অটোগ্যাস খাতেও এর ব্যবহার বাড়ছে। বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন এলপিজি ব্যবহৃত হয়। এর প্রায় ৮০ শতাংশই গৃহস্থালি খাতে ব্যবহৃত হয়। তবে দেশের চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ১৪ লাখ টনের বেশি এলপিজি আমদানি হয়েছে। বাজারের চাহিদা মেটাতে প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার টনের বেশি এলপিজি বিদেশ থেকে আনতে হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকিও স্পষ্ট হয়েছে। সরবরাহ সংকট, আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারে অস্থিরতার কারণে এলপিজির দাম কয়েক দফা বেড়েছে। চলতি বছর মূল্যবৃদ্ধির পর অনেক ভোক্তা বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলার দিকে ঝুঁকেছেন, যার ফলে কিছু সময় চাহিদা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানি শুরু হলে বাংলাদেশের আমদানির উৎস বহুমুখী হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ভারতও সম্প্রতি একই ধরনের কৌশল গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদি এলপিজি আমদানির চুক্তি করেছে, যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নত করা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আমদানি বাড়ালেই হবে না; দেশের এলপিজি সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো ধাক্কা এলে পর্যাপ্ত মজুতের অভাবে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই নতুন আমদানির পাশাপাশি সংরক্ষণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ, টার্মিনাল উন্নয়ন এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানির উদ্যোগ সফল হলে একদিকে যেমন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো গভীর হবে।
সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রা করেছে। সরকার–টু–সরকার (জি–টু–জি) ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানির সম্ভাবনা যাচাই এবং দ্বিপক্ষীয় জ্বালানি সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটির আজ ওয়াশিংটন পৌঁছানোর কথা রয়েছে। প্রতিনিধিদলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আনিন্দ্য ইসলাম অমিত, পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত রয়েছেন।
পাঁচ দিনের এ সফরে প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মনোনীত এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করবে এবং বিভিন্ন এলপিজি রিফাইনারি পরিদর্শন করবে। প্রস্তাবিত জি–টু–জি এলপিজি আমদানি কার্যক্রমের সম্ভাব্যতা ও বাস্তবায়ন কৌশল নিয়েও আলোচনা হবে।
সফরকালে প্রতিমন্ত্রী আনিন্দ্য ইসলাম অমিত যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠেয় ১০ম আটলান্টিক কাউন্সিল গ্লোবাল এনার্জি ফোরামেও অংশ নেবেন। আজ এবং আগামীকাল অনুষ্ঠেয় এ ফোরামে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, জ্বালানি রূপান্তর, এলএনজি ও এলপিজি বাজারের ভবিষ্যৎ এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের এ সফর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আমদানি উৎসের বহুমুখীকরণ এবং বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানির এ উদ্যোগ কেবল একটি জ্বালানি প্রকল্প নয়, বরং বাণিজ্য ও কূটনৈতিক কৌশলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।












