যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান পরোক্ষ আলোচনা ইরান স্থগিত করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদ সংস্থা তাসনিম। সংবাদ সংস্থাটি লিখেছে, লেবাননে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েল অভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়ার প্রতিবাদে তেহরান এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
তাসনিম লিখেছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যে বার্তা আদান–প্রদান চলছিল, তা ইরানের আলোচকরা ইতোমধ্যে বন্ধ করে দিয়েছেন। রয়টার্স লিখেছে, ইরানের এই সিদ্ধান্ত দ্রুত যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনাকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে। কারণ শান্তি আলোচনা চলার মধ্যেই ইরানের একাধিক স্থাপনা ও সামরিক রাডার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করাসহ ইরানের চালানো আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের জবাবে তারা আত্মরক্ষামূলক হামলা চালিয়েছে। মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানোর কথা বলেছে ইরানও। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইরানে হামলার জন্য ব্যবহৃত মার্কিন বাহিনীর একটি বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে তারা আঘাত করেছে। সেন্টকম জানিয়েছে, কুয়েতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে ছোড়া ইরানের দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে এবং এতে কোনো মার্কিন সদস্য হতাহত হয়নি। এর আগে কুয়েতও জানিয়েছিল, তারা কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে।
এরমধ্যে এবার তেহরানের কাছ থেকে আলোচনা বন্ধ রাখার ঘোষণা এল। তাসনিমের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলারের বেশি বেড়ে গেছে।
বিধ্বস্ত যুক্তরাষ্ট্রের ২০ সামরিক ঘাঁটি : এদিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের হামলায় পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক ঘাঁটি বা স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ মিলেছে ‘বিবিসি ভেরিফাই’–এর বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট ছবি ও ভিডিওতে। এই বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, হোয়াইট হাউজ জনসমক্ষে ক্ষয়ক্ষতির যে খতিয়ান দিয়েছে, প্রকৃত হামলার ব্যাপ্তি ও ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে ইরান পশ্চিম এশিয়ার ৮টি দেশে মার্কিন ও যৌথ সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। এসব হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ ডলার মূল্যের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার এবং জ্বালানি ভরার কাজে ব্যবহৃত বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত তিন মাসে ইরান ও লেবাননজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তেহরান এই পাল্টা আঘাত হেনেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সদরদপ্তর পেন্টাগনের দাবি, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার পর থেকে তারা ইরানে ১৩,০০০–এরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনিই মার্কিন ঘাঁটিতে তার সামরিক বাহিনীর এই সফলতার বিষয়টি সামনে এনেছেন। গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো আর মার্কিন সামরিক ঘাঁটির জন্য ‘নিরাপদ স্থান’ নয়। যদিও হোয়াইট হাউজ বারবার দাবি করে আসছে যে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা প্রায় ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তেহরানের পাল্টা হামলাগুলো মার্কিন কর্মকর্তাদের আগের দেওয়া স্বীকারোক্তির চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত ও বিস্তৃত ছিল। পেন্টাগনের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ‘অপারেশনাল সিকিউরিটি’ বা সামরিক নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে বিবিসি–র এই অনুসন্ধানের ওপর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। মার্কিন প্রশাসন এই সংঘাতের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ সীমিত করার উদ্দেশ্যে প্রধান স্যাটেলাইট ছবি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘প্ল্যানেট’–কে ইরান ও পশ্চিম এশিয়ার সিংহভাগ অঞ্চলের নতুন ছবির ওপর ‘অনির্দিষ্টকালের’ জন্য কড়াকড়ি আরোপের অনুরোধ করেছিল। প্রতিষ্ঠানটি এই পদক্ষেপের যৌক্তিকতা দেখিয়ে বলেছে, তারা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল যেন শত্রুপক্ষ এই ছবিগুলো ব্যবহার করে নেটো অংশীদার ও বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে না পারে।
তবে ‘বিবিসি ভেরিফাই’ অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ছবি এবং ‘প্ল্যানেট’–এর পুরনো ছবিগুলো মিলিয়ে ইরানের হামলায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেছে। এই মার্কিন ঘাঁটিগুলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডান, বাহরাইন এবং ওমানে অবস্থিত। কিছু বিশ্লেষকের মতে, আক্রান্ত ঘাঁটির প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, যা ২৮টি পর্যন্ত হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মূল্যবান সামরিক সরঞ্জামের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘আল রুওয়াইস’ ও ‘আল সাদর’ বিমান ঘাঁটি এবং জর্ডানের ‘মুওয়াফফাক সালতি’ বিমান ঘাঁটিতে থাকা তিনটি অত্যাধুনিক অ্যান্টি–ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে।
স্যাটেলাইট ছবির বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন অনুযায়ী, সৌদি আরবের ‘প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে’ যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহকারী ও নজরদারি বিমানের ওপরও ভারি আঘাত হেনেছে ইরান। এছাড়া কুয়েতের ‘আলি আল সালেম’ বিমান ঘাঁটি এবং ‘ক্যাম্প আরিফজান’–এও ইরানি হামলা হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে কুয়েতের ঘাঁটিতে ধ্বংস হওয়া জ্বালানি বাঙ্কার, বিমানের হ্যাঙ্গার এবং সেনাদের আবাসন ব্যবস্থা চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ‘ক্যাম্প আরিফজান’–এ যুক্তরাষ্ট্রের স্যাটেলাইট যোগাযোগ যন্ত্রপাতির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ‘জেনস’ নিশ্চিত করেছে।
ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট আর্থিক পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন হলেও পেন্টাগনের মে মাসের এক হিসাবে বলা হয়েছে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’–র পেছনে মোট ২৯,০০০ কোটি (২৯০ বিলিয়ন) ডলার ব্যয় হয়েছে, যার একটি বড় অংশ সংঘাতের কারণে ধ্বংস হওয়া সরঞ্জাম মেরামত বা প্রতিস্থাপনে ব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটদের মতে, প্রকৃত খরচের তুলনায় এই অঙ্ক বেশ কম।
পেন্টাগনের দেওয়া হিসাবে আরও দেখা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত এফ–১৫ ও এফ–৩৫ ফাইটার জেট, ২৪টি এমকিউ–৯ রিপার ড্রোন এবং একটি এ–১০ অ্যাটাক বিমানসহ অন্তত ৪২টি বিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই অত্যন্ত ব্যয়বহুল সামরিক সরঞ্জামের বিপরীতে ইরান পশ্চিম এশিয়াজুড়ে সস্তা ও সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য ড্রোনের মাধ্যমে এই হামলাগুলো চালিয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এ অঞ্চলের দেশ বা ভূখণ্ডগুলো আর মার্কিন ঘাঁটির ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। আমেরিকার দিন শেষ, এ অঞ্চলে কোনও বিশৃঙ্খলা বা ঘাঁটি তৈরির নিরাপদ জায়গা তারা আর পাবে না।
তার এই মন্তব্যের কয়েক দিন পরই গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলার জবাবে পশ্চিম এশিয়ার একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)।












