বড় প্লাস্টিক সামগ্রীর অতি ক্ষুদ্রকণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। ৫ মিলিমিটারের চেয়েও ক্ষুদ্রকণা যা খালি চোখে খুব একটা দেখা যায় না। বড় প্লাস্টিক সামগ্রীর ভাঙন, ক্ষয়, কিংবা প্রসাধনীতে ব্যবহৃত সিনথেটিক ক্ষুদ্রকণার (মত উপাদানের মাধ্যমে পরিবেশের সাথে মিশে যাওয়া একটি অতি ক্ষতিকর বর্জ্য। প্লাস্টিকের যে বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে তার অতি ক্ষুদ্র ও অপ্রয়োজনীয় হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক। গ্লোবাল গবেষণা অনুযায়ী এই মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা পরিবেশ ও মানব স্বাস্থের জন্য সম্পূর্ণ ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কোন উপকারিতা নেই। এইটা সহজে পঁচে না। নদী, সমুদ্র, মাটি, বাতাসে অবিরাম ঘুরে বেড়িয়ে পুরো পরিবেশের বাস্ততন্ত্র নষ্ট করছে। জলজ প্রাণী, সামুদ্রিক মাছ, স্বাদু পানির মাছ, বন্যপ্রাণী এসব মাইক্রোপ্লাস্টিককে খাদ্য কণা মনে করে খেয়ে ফেলে। যা তাদের পরিপাকতন্ত্রে বাধা সৃষ্টি করে এবং মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ায়। মাছ ও জলজ প্রাণীর মাধ্যমে এই বিষাক্ত কণা মানুষের খাদ্য চক্রে প্রবেশ করে। এর ফলে পানীয় জল এবং খাবারের মাধ্যমে মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রতিনিয়ত জমছে। এর প্রভাবে মানব দেহের কোষের ক্ষতি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে ও পেটে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
গ্লোবাল গবেষণায় আরো দেখা যাচ্ছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক তার গায়ে বিভিন্ন ক্ষতিকর ভারী ধাতু ও বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য আঁকড়ে রাখতে পারে। এইগুলো শরীরে প্রবেশ করে হরমোন ও প্রজননতন্ত্রে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। মানব দেহের রক্ত, ফুসফুস ও বিভিন্ন তন্ত্রে এর উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। এতে ক্যান্সার, হরমোন জনিত ও অন্ত্রের ক্ষতিকর আশাংকা ক্রমে বেড়ে চলেছে।
বিভিন্ন নদীগুলো বছরে প্রায় ১০ লক্ষ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সাগরে নিয়ে যায়। এই বর্জ্য থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক ঢুকে যায় মাছ ও বিভিন্ন জলজ প্রাণীর দেহে। পরবর্তীতে খাবারের মাধ্যমে মানুষের দেহে। গ্লোবাল গবেষণা অনুযায়ী একজন মানুষ বছরে প্রায় ৫০ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করে বিভিন্ন উৎস থেকে। যার ফলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, মা হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছে, লিভার ও কিডনির ক্ষতি হচ্ছে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রধান রাসায়নিক উপাদান ও পলিমার গুলো হলো– পালিথিন, পলিপ্রোথিলিন, পলিস্টাইরিন, পলিইথাইলিন, নাইলন, পলিয়েস্টার ও পলিউরেথেন।
গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৮ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরী হয়। যার অর্ধেক এর বেশি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা হয় না। সেই বর্জ্য ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যচক্রে ঢুকছে। গবেষকদের মতে একজন শিশু প্রতিদিন গড়ে ৭৭.২১ টি অর্থাৎ বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০ টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে। গবেষকরা আরো বলছে কেবল সয়াবিন তেলের মাধ্যমে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৭.৬৫ টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা, বছরে প্রায় ৬৪৪১ টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করছেন। এছাড়া টুথপেস্ট, দুধ, চিনিতেও অধিক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা।
এই ভয়াবহতা থেকে উত্তরণ পেতে হলে পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতল ২য় বার ব্যবহার বন্ধ রাখা, প্লাস্টিকের বর্জ্য যত্রতত্র না ফেলা এবং ব্যবহৃত প্লাস্টিকের রিসাইকেল করা অতীব জরুরি নচেৎ ভবিষ্যতে আমাদের সামনে অধিকতর স্বাস্থ্য ঝুঁকি অপেক্ষা করছে।













