মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী নারী শ্রমিকদের কান্না: নির্যাতন, পতিতাবৃত্তি ও লাশের মিছিল

নিগার সুলতানা | শনিবার , ৪ জুলাই, ২০২৬ at ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ

বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার পেছনে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। আর এই রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ আসছে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত নারী শ্রমিকদের হাত ধরে, যারা মূলত গৃহকর্মী হিসেবে সেখানে কাজ করতে যান। কিন্তু এই সোনালী রেমিট্যান্সের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার ও নির্মম বাস্তবতার গল্প। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ বছরে মধ্যপ্রাচ্য (বিশেষ করে সৌদি আরব) থেকে নির্মম নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তির শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন প্রায় ৮০ হাজার নারী। শুধু তাই নয়, এই সময়ে প্রায় ৮০০ নারী শ্রমিকের নিথর মরদেহ দেশে ফেরত এসেছে।

বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক প্রেরণের হার মূলত ২০১৫ সালের পর থেকে ব্যাপক বৃদ্ধি পায়, যখন সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের গৃহকর্মী নেওয়ার চুক্তি হয়। নারীদের প্রবাসে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোও বেশ করুণ। গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে অনেক নারী এই পথ বেছে নেন। স্বামী পরিত্যক্তা, বিধবা, কিংবা স্বামীর পঙ্গুত্ব বা মাদকাসক্তির কারণে পরিবারের পুরো দায়িত্ব যখন নারীর কাঁধে পড়ে, তখন বাধ্য হয়ে তারা বিদেশে পাড়ি জমান। দালালরা অনেক সময় বিনামূল্যে বা খুব কম খরচে সৌদি আরব যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার লোভ দেখায়, যা দরিদ্র নারীদের আকৃষ্ট করে।

নারী শ্রমিকদের মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পেছনে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট কাজ করে। যাদের হাত ধরে তারা ভিন্ন দেশে পা রাখেন বিনা নিশ্চয়তায়। গ্রামের সহজসরল নারীদের টার্গেট করে স্থানীয় দালালরা। তারা বোঝায় যে, “আরবে গিয়ে শুধু একটি ছোট পরিবারের রান্নাবান্না ও দেখভাল করতে হবে এবং মাসে মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়া যাবে।” ঢাকায় অবস্থিত কিছু লাইসেন্সধারী ও লাইসেন্সবিহীন রিক্রুটিং এজেন্সি এই দালালদের মাধ্যমে নারীদের সংগ্রহ করে। চুক্তি অনুযায়ী নারীদের বিনামূল্যে পাঠানোর কথা থাকলেও, অনেক সময় তাদের কাছ থেকে গোপনে টাকা নেওয়া হয় অথবা তিন মাসের অগ্রিম বেতন কেটে রাখার শর্ত দেওয়া হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এক মাসের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা থাকলেও, অনেক এজেন্সি ভুয়া সার্টিফিকেট তৈরি করে বা নামমাত্র কয়েকদিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে ভাষাজ্ঞান ও আধুনিক গৃহস্থালি কাজের ধারণা ছাড়াই নারীদের বিদেশে পাঠিয়ে দেয়।

অন্যদিকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নারী গৃহকর্মীদের সম্পূর্ণ বিনা খরচে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে দরিদ্র নারীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালেরা। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) কর্তৃক প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এই নির্মম চিত্রটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ফরিদপুর, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ এলাকার দেশে ফিরে আসা ২৬২ জন নির্যাতিত নারী কর্মীর ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশগামী নারীদের সিংহভাগই (প্রায় ৯৫ শতাংশ) দালালের মাধ্যমে গিয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ নারীই দালালের হাতে টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ‘ফ্রিভিসা’র সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ২০ শতাংশ নারীকে ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, ২৮ শতাংশ নারীকে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং ১৫ শতাংশ নারীকে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত দালালের পেছনে খরচ করতে হয়েছে। এমনকি ২ শতাংশ নারীর কাছ থেকে ১ লাখ টাকারও বেশি হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র।

শুধু আর্থিক শোষণই নয়, নারীকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালেরা মারাত্মক সব আইনি অনিয়মের আশ্রয় নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে পাঠানোর অযোগ্য অপ্রাপ্তবয়স্ক কিংবা অতিরিক্ত বয়সী নারীদের বয়স লুকিয়ে এবং ভুয়া বা নকল সনদ তৈরি করে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে। ফলে সঠিক ভাষাজ্ঞান, কাজের দক্ষতা এবং মানসিক প্রস্তুতি না থাকায় সেখানে গিয়ে তাঁরা তীব্র নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এবং চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই শূন্য হাতে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন।

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ‘কাফালা’ (Kafala) নামক একটি দাসত্বমূলক প্রথা চালু রয়েছে। এই প্রথা অনুযায়ী, একজন বিদেশি শ্রমিকের আইনি মর্যাদা সম্পূর্ণভাবে তার নিয়োগকর্তার (কফিল) ওপর নির্ভর করে।

কফিলের অনুমতি ছাড়া একজন কর্মী চাকরি পরিবর্তন করতে পারেন না, এমনকি দেশ থেকেও ফিরতে পারেন না। এই প্রথার সুযোগ নিয়ে নারীদের ওপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন।

দিনে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা একটানা কাজ করানো, ঠিকমতো খাবার না দেওয়া এবং মাসের পর মাস বেতন আটকে রাখা সেখানে এক সাধারণ বিষয়। সামান্য ভুলের জন্য লাঠি, বেল্ট বা গরম ইস্ত্রি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার মতো নৃশংস নির্যাতন চালানো হয়।

অনেক কফিল বা তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা নারী শ্রমিকদের ওপর যৌন নির্যাতন চালায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সির সৌদি অফিসের (মক্তব) কর্মকর্তারা নারীদের আটকে রেখে অন্য পুরুষদের কাছে অর্থের বিনিময়ে ভাড়া দেয় বা জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করে। সৌদি পৌঁছানোর পরপরই অধিকাংশ নারীর মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়, যাতে তারা দেশে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে না পারেন।

বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম (যেমন: প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বিবিসি বাংলা) এবং প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও ব্র্যাকের (BRAC) মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই ভয়াবহ চিত্রটি উঠে এসেছে। গত ৭ বছরে নির্যাতনের শিকার হয়ে খালি হাতে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে কিংবা শারীরিক ক্ষত নিয়ে দেশে ফিরেছেন প্রায় ৮০ হাজার নারীকর্মী। এদের অনেকেই সৌদি আরবের সেফ হোম বা ডিটেনশন সেন্টারে আশ্রয় নিয়ে পরবর্তীতে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরেন।

একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রায় ৮০০ নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। মরদেহের সাথে আসা সনদে বেশিরভাগ মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’, ‘হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়া’ (Heart Attack) কিংবা ‘আত্মহত্যা’। তবে মানবাধিকার সংস্থা ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, অতিরিক্ত নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেকে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন, আবার অনেককে পিটিয়ে মেরে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও বেদনাদায়ক। সরকারিবেসরকারি বিভিন্ন হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মাত্র সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। এর মধ্যে ২০১৬ সাল থেকে শুরু করে একটি নির্দিষ্ট সময়কালের হিসাব অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যবিশেষ করে সৌদি আরব থেকে ৩১১ জন নারীর লাশ বাংলাদেশে ফেরত আনা হয়েছে। সবচেয়ে ভীতিপ্রদ ও রহস্যজনক বিষয় হলো এই মৃত্যুর কারণগুলো। মৃত নারীদের মধ্যে ৫৩ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘আত্মহত্যা’ উল্লেখ করা হয়েছে। তার চেয়েও অভাবনীয় তথ্য হলো, ১২০ জন নারী শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ দেখানো হয়েছে ‘স্ট্রোক’ এবং ৫৬ জনের ক্ষেত্রে ‘দুর্ঘটনা’। বিদেশগামী এই নারীদের সিংহভাগের বয়সই ২০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে, যা মানুষের জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম ও সুস্থ সময়। ফলে, এত বিপুলসংখ্যক তরুণী ও যুবতী নারীর হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই; বরং এর পেছনে গভীর মানসিক নিপীড়ন ও শারীরিক নির্যাতনের যোগসূত্র থাকার ইঙ্গিত মেলে।

অথচ এই নারীদের প্রায় সবাই চরম দারিদ্র্যের শিকার হয়ে ভাগ্য বদলাতে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। অনেকে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে, আবার অনেকে শেষ সম্বল জমিজমা বন্ধক রেখে বা বিক্রি করে দালালের হাতে টাকা তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যাওয়ার পেছনে যে বিপুল খরচ হয়েছিল, তা আয়ের মাধ্যমে তুলে আনার আগেই শত শত নারী আজ তীব্র মানসিক ও শারীরিক হয়রানি এবং বৈষম্যের শিকার হয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। পুরো পরিস্থিতিটি স্পষ্ট করে দেয় যে, প্রবাসী এই প্রান্তিক নারীরা প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক শ্রম আইন ও মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক চরম অসহায় শিকারে পরিণত হচ্ছেন।

বর্তমানে এই পরিস্থিতি নিয়ে দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। সরকার কিছু কিছু এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করলেও মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি। রিয়াদ ও জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সেফ হোমগুলোতে সবসময়ই নির্যাতিত নারীদের ভিড় থাকে। তবে সক্ষমতার তুলনায় সেখানে আশ্রিত নারীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় তাদের রাখা এবং দ্রুত দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে নানা জটিলতা পোহাতে হয়। সৌদি আরবের শ্রম আইনে গৃহকর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত দুর্বল। কফিলের বিরুদ্ধে মামলা করা অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া হওয়ায় অধিকাংশ নারী বিচার না পেয়ে কেবল দেশে ফেরার আকুতি জানান। নির্যাতিত হয়ে বা গর্ভবতী হয়ে যেসব নারী দেশে ফিরছেন, সমাজ ও পরিবার তাদের সহজে মেনে নেয় না। ফলে শারীরিক ও মানসিক ট্রমার পাশাপাশি তারা চরম সামাজিক অবমাননার শিকার হচ্ছেন।

নারী শ্রমিকদের এই কান্না এবং লাশের মিছিল কোনোভাবেই একটি স্বাধীন ও সভ্য দেশের জন্য কাম্য হতে পারে না। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ‘কাফালা’ প্রথার বিলোপ বা সংস্কারের জন্য কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গৃহকর্মীদের কর্মঘণ্টা, বেতন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং কর্মক্ষেত্রে প্রতি মাসে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। তৃতীয়ত, দেশের ভেতরের মানবপাচারকারী দালালচক্র ও দুর্নীতিবাজ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের মাবোনদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে যে রেমিট্যান্স আসে, তা কখনো দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটাতে পারে না। নারীদের বিদেশে পাঠানোর আগে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিচ্ছেদের দুই অধ্যায়: দুই প্রজন্মের দুই নারীর জীবনসংগ্রাম
পরবর্তী নিবন্ধকর্ণফুলীতে ৭ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ১